আদাব “গালিব সাহেব”–শুভ জন্মদিন।

ghalib‘লাজিম থা কে দেখো মেরা রস্তা কোই দিন অওর
তনহা গয়ে কিঁউ? অব রহো তনহা কোই দিন অওর।’

হয়তো এক সন্ধেবেলা, নিজের ছোট হাভেলির দাওয়ায় বসে কুপি জ্বেলে এই গজলের প্রথম শেরটি লিখছেন তিনি।বাইরে পুরানি দিল্লির চেনা শোরগোল আর বাজারের টিমটিমে রোশনাই, বাইরে আস্ত একটা পৃথিবী। ভেতরে একটা নিভে-আসা-দুনিয়া গুছিয়ে বসেছেন বৃদ্ধ শায়র।লিখছেন, ‘তোমার উচিত ছিল আরও কিছু দিন আমার জন্য অপেক্ষা করা/একা চলে গেলে কেন?এখন থাকো আরও কিছু দিন একা।’দুপুরেই যেতে হয়েছিল কবরখানায়। সে আর নতুন কী। কিন্তু এবারের যাওয়ার সঙ্গে আগের বারের যাওয়াগুলোর বেশ বড় একটা তফাত রয়েছে।এর আগে প্রতিবারই কবরখানা থেকে ফেরার পথে ভেঙে যাওয়া মনের কোণে একটু হলেও উম্মিদ-এর রওশনি ছিল। এবার সেটুকুও নেই। কিন্তু সেই অন্ধকারে নিজের সবটুকু ঢেলে দিয়ে ফুরিয়ে যাচ্ছেন না কবি।

মৃত্যুর ধারাবাহিক আক্রমণের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে লিখছেন, হ্যাঁ, আরও একটি গজল। যা তাঁর সারা জীবনের একমাত্র কাজ, কিন্তু কেন লিখছেন এ শের? সে কথায় পরে আসব। আপাতত জেনে নিই বৃদ্ধ এই শায়রের পরিচয়।  তিনি আর কেউ নন, খোদ অসদউল্লা খান বেগ। আমরা যাঁকে চিনি মির্জা গালিব নামে চিনি।

হাবেলিতে গালিব একা। কত দীর্ঘ একটা জীবন পার করে এলেন তিনি। তাঁর আর উমরাও বেগম-এর এত দিনকার দাম্পত্যে বেশ কয়েক বার সন্তানসুখ লাভ করেছেন দু’জনেই। কিন্তু হয়তো কয়েক ঘণ্টার জন্য। কোনও ক্ষেত্রে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে কয়েক দিনে। কিন্তু কিছুতেই ‘আব্বু’ ডাক শোনার সুযোগ ঘটেনি মির্জার। একের পর এক মৃত্যুকে জন্ম দিতে দিতে উমরাও আজ পাথরে পরিণত।হাল ছেড়ে ভাইপো আরিফকে দত্তক নিলেন মির্জা। সেরার সেরা শায়র তাঁর সমস্ত ব্যর্থতার উল্টো দিকে এনে বসালেন ছোট্ট আরিফকে। সেই আরিফ যখন ১৬ বছর বয়সে মারা যাচ্ছে, তখন উন্মাদ না হয়ে গিয়ে, ভাঙচুর বা আত্মহত্যা না করে একজন মানুষ কী করছেন? যা তিনি সারা জীবন ধরে করে এসেছেন লেখা। ‘লাজিম থা কে দেখো মেরা রাস্তা…।’ভেতরের সমস্তটা ভাঙচুর করে ফেলা ঢেউয়ের উথাল-পাথালের সামান্যই উঠে এল তাঁর কলমে। বদলে তৈরি হল বাবা-ছেলের এক দৈনন্দিন কথোপকথন। দেরি করে বাড়ি ফিরলে বাবা যেমন ছেলেকে বকুনি দেন, ঠিক তেমনই আদরের, অভিমানের বকুনি দিচ্ছেন বাবা। দেরি করে ফেরার জন্য নয়। তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার জন্য। এখানেই, আরও একবার, মৃত্যুকে, মৃত্যুশোককে হেলায় হারিয়ে দিচ্ছেন মির্জা।চরম শোকের মধ্যেও  যে মানুষ এমন অমর রচনা সৃষ্টি করতে পারে তা গালিব না জন্মালে বিশ্বাস হতো না।সারা জীবন চরম শোক,অর্থ কষ্ট, দেনার দায়ে জেল যাপন সবই হয়েছিল কিন্তু কোনকিছুই গালিবকে তার আম প্রীতির থেকে দূরে রাখতে পারেনি।এমনই রসাল ছিল তার মন। শোক সম্বল জীবন আর আম প্রীতি এই দুয়ের মিশ্রণ আরও একটি মানুষের জীবনে দেখতে পাই,তিনি রবীন্দ্র নাথ।দুজনেই শিখিয়ে গেছেন যতই জীবনে শোক আসুক মনের রসকে মরতে দেওয়া যাবে না।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *