ইডেনে বিশ্বকাপ ২০-২০র সেরা হাইভোল্টেজ ম্যাচ। ভারত : পাকিস্তান। – দীপঙ্কর গুহ

India-vs-Pakistan-T20-World-Cup-2016মাঠের আর মাঠের বাইরের খেলাও ছিল হাইভোল্টেজে চোবানো। মাঠের বাইরে খেলাটাতেও সমান উত্তেজনা-উদ্দীপনায় ফুটতে দেখলাম সকলকে। বিশেষ করে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে। সেই তিনি যিনি প্রথম ২০-২০ বিশ্বকাপে “বিচিত্র” পরিস্থিতির শিকার হয়ে খেলতে পারেন নি। তখনকার দলনেতা (টেস্ট এবং একদিনের ম্যাচে) রাহুল দ্রাবিড় নিজেকে সরিয়ে নেন। ‘না’ বলে দেন শচীনও। এই দলে কোথা থেকে নাম ঢুকে যায় সৌরভের! পরবর্তীকালে এই তিন নায়কই আই পি এল এ টি ২০-২০ ক্রিকেটে খেলেন।  সৌরভের একটা বড় আক্ষেপ ছিল প্রথম  টি ২০-২০ বিশ্বকাপে না খেলতে পারা। সেই দলে থাকলে সৌরভ যে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান দলের হতেন।

Saurav_Ganguly_360x270-stry

ক্রিকেটার হয়ে পারেন নি, অধিনায়ক হয়েও পারেন নি। এখন তিনি সিএবি-র সভাপতি। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান আর হতে পারবেন না ঠিকই। কিন্তু চ্যাম্পিয়ান হয়ে বিশ্বকে তাক্ লাগাতে পারেন।  সেই সুযোগই দু হাতে কাজে লাগলেন ‘ভারত পাক’ ম্যাচ ইডেনে টানতে। জগমোহন ডালমিয়া বোর্ড সভাপতি হন যে বার্ষিক সভায় সেখানে অনুরাগ ঠাকুর কে বোর্ড সচিব হতে সাহায্য করেন প্রিন্স অব ক্যালকাটা। নিন্দুকরা এমনটাই বলে। তারাই আবার পরে বাকা হাসিতে বলেছিলেন ‘যাহা রটে তাহা কিছু  তো বটে’।

সত্যিই হয়তো তাই. বোর্ড সচিব অনুরাগ ঠাকুর নিজের রাজ্য ক্রিকেট সংস্থা হিমাচল প্রদেশেই ‘পাক ভারত’ ম্যাচ রাখতে পেরেছিলেন। কিন্তু রাজনীতির দাবার চকে বেসামাল হন কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রীর ‘কিস্তি মাত ‘এ। সঙ্গে সঙ্গেই ঠাকুর তাকালেন মহারাজের পানে। হিমাচল থেকে ম্যাচ চলে এলো কলকাতায়। প্রিন্স পেলেন সেদিনের বন্ধুবৃত্বের প্রতিদান। বেশ মনে আছে প্রয়াত বোর্ড সভাপতি জগমোহন ডালমিয়ার শেষ যাত্রার বেশ কিছু মুহূর্ত। আলিপুর রোদের বাড়িতে নিচের হল ঘরে প্রয়াত জগুদা শায়িত। নানান পরলৌলিক কাজকর্ম চলছে। বোর্ড সচিব অনুরাগ ঠাকুর, বোর্ড কোষাধক্ষ অমিতাভ চৌধুরী এবং রবি শাস্ত্রী ঢুকলেন। ততক্ষণে সিএবি-র অন্যতম যুগ্ম সচিব, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ও হাজির।  সৌরভ ও রবির হাই  হ্যালো পর্বটাও চোখে পরে নি।

বরঞ্চ দেখলাম অনুরাগ ঠাকুর একেবারে সৌরভের গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। রবি আর অমিতাভ পিছনের ভিড়ে। সৌরভ কাঁধ দিলেন। গাড়িতে শোয়ানো হল জগুবাবুকে। ইডেন রওনা হওয়ার পালা। ডালমিয়া পুত্র, ডালমিয়া ছায়া সঙ্গী পবন  ভালোটিয়া ওনার সঙ্গে শববাহী গাড়িতে। আর সৌরভ অনুরাগ একটি গাড়িতে উঠলেন।  ইডেনেও বারবার নজরে পড়ল মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী অভিষেক সৌরভ এর সঙ্গে বোর্ড সচিব অনুরাগ ঠাকুরের সঙ্গে নানান কথা বলছিলেন। হোক না অনুরাগ বিজেপির সাংসদ বা সর্ব বিজেপি ভারতীয় যুব সংগঠনের সর্বেসর্বা।  হোক না ঠাকুর বিজেপি প্রথম সারির তথা অরুণ জেটলির অতি ঘনিষ্ঠ।  এটা তো মাঠ ময়দান! অন্য লড়াই চলে এখানে।

সৌরভ এ লড়াইতা জানেন। সফল অধিনায়ক। দেশের বিভিন্ন অংশের ক্রিকেটারদের নিয়ে ‘অন্য মানসিকতা’র ভারতীয় দল তো সাজিয়ে ছিলেন !! সি এ বিতে যুগ্ম সচিব হয়ে সেই অধিনায়কত্বের সময়কার দাপটটা  কোথাও ঘেরাটোপে আটকানো। সিএবিতেই তাঁর এবং কোষাধ্যক্ষ বিশ্বরূপ দে-র লড়াইটা  এখন বোর্ড কর্তারাও জানেন।

সৌরভ সিএবি সভাপতি হয়ে জগমোহন ডালমিয়া কিংবা বিশ্বনাথ দত্তদের চেয়েও একটা মাস্টার স্ট্রোক দিলেন। সি এ বিতে একটা চল ছিল, ম্যাচের আগের দিন রেড লাইট জ্বালিয়ে ড্রয়ার থেকে ফ্রি টিকিট বিলোনো হত। আবার কারোর কারোর বাড়িতে লাইন পড়ত। কিন্তু সৌরভ সি এ বি’র অনুমোদিত সংস্থার কোটার টিকিট ছাড়াও সেই সংস্থার সচিব কিংবা অস্ভাপতির নামে আলাদা প্যাকেটে নাম লিখে টিকিট পাঠান। সিনিয়র এক ক্লাবকর্তার মতে এটা – ‘মহারাজের মাস্টার স্ট্রোক।’ কেউ ওকে এর জন্য ধন্যবাদ জানালে তিনি হয়তো এটিএমতৃপ্তির ঢেকুড় তুলবেন। পাশাপাশি সিএবিতে তাঁর বিরোধী শিবিরে ভাঙ্গন ধরিয়ে এটা বোঝালেন, তিনি এই ম্যাচেও ‘দাদাগিরি’ করতে এসেছেন।

আন্তর্জাতিক ম্যাচে সিএবির টিকিট নিয়ে কালোবাজারি হয় বলে ময়দানে চালু হাওয়া আছে।  ভারত পাকিস্তান ম্যাচ সব পরিসংখ্যানকে পিছনে ফেলবে হয়তো। সৌরভের নিখুত পরিকল্পনায় সব ক্লাব ও কর্তা দের সমান সন্মান মিলল। আগে কোনও কোনও  কর্তারা “এলিট ক্লাসে” বসে টিকিট পেতেন,এবার তা না হওয়ায় অনেক “দাদা” বেশ ক্ষুব্ধ মহারাজের নয়া “দাদাগিরি”তে, কিন্তু অধিকাংশ ক্লাব প্রতিনিধি তাদের সভাপতির সঙ্গে হাঁটতে রাজি!আর বেচারা বাকিরা! যে কর্তা খামে ‘ফ্রি’ টিকিট রেখে নিজের প্রতিনিধি দিয়ে অমুককে ফোনে জানাতেন, “ —দা আপনার জন্য একটা খাম রেখেছেন, কিভাবে নেবেন?’ এবার সেই ‘—-দা’ ফোনের উত্তর দিতে পারেন নি। যিনি এক বড় কর্তার অফিস থেকে ‘ফ্রি’ পাস খামে করে তুলে নিতেন,তিনি তা পেলেন। কিন্তু বুঝলেন ‘সন্মানীয় টিকিট নয়, কম অর্থের টিকিট’ পেলেন। অর্থাৎ অন্য খেলাও যে চলছে। অভিযোগ অন্য রকমও আছে। কেউ হয়তো জানতেন তার নামে লেখা খামে নির্দিষ্ট সংখ্যক টিকিট আছে, কিন্তু খাম খুলে টের পেলেন, তা নেই! তাহলে কোথায় গেল সেই টিকিট?

সৌরভের একটা খেলায় জয় নিশ্চিত, ইডেনে ভারত-পাক নিয়ে আসা।ইংল্যান্ড থেকে অত্যাধুনিক গ্রাউন্ড কভার, নিজস্ব ইলেক্ট্রনিক্স ভিডিও স্কোর বোর্ড—ইডেন যেন “মহাবলী” মেজাজে। কিন্তু আম জনতা কি পেল?ক্রিকেট প্রেমী সাধারন মানুষ তো একটা টিকিটও কিনতে পেল না দামের দামে! কেন?প্রশ্ন কাকে করতে হলে উত্তর মেলে—তা জানতে পারলেন এক দঙ্গল লাইফ মেম্বার।টিকিটও পেলেন না, পিএলও করে কোর্টের দ্বারস্থ হলে কে দায় নেবেন?

সিএবিতে কান পাতলেই শুনলাম, আগে ভোটের বড়বাবুরা দামী টিকিট পেতেন।এবার তা তো হল না। উল্টে কম দামী টিকিট সকলের কাছে গেল। আর দামী টিকিট চলে গেল ‘দামী কর্পোরেট’ কিংবা নামী-দামী ক্ষমতাশালী দের হাতে। কাল বাজারে তাই ক্লাব হাউস এর টিকিট বিকোলো প্রায় কুড়ি হাজারে!( লোয়ার টিয়ারের)। আপার টিয়ারের টিকিট বিকোলো ১২-১৫-১৭ হাজারে।‘বি’ এবং ‘এল’ ব্লকের কমপ্লিমেন্টারি হাত বদলে মিলল ১০-১২ হাযারে!এবং এক তাক লাগানো তথ্য হল; অধিকাংশ ক্ষেত্রে লাভবান মুষ্টিমেয় নয়,অধিকাংশ।হতে পারে সৌরভের জিদ তার হাতিয়ার।সিএবিতে একটা ‘বড় ম্যাচ’ জিততে নেমেছেন। কোটি কোটি টাকার টিভী’র চুক্তি আপাতত সরিয়ে রেখেছেন। কিন্তু বদনামের ভাগীদার তো নেতাকেও হতে হয়।তিনি নিশ্চয় সচেতন।

                দীপঙ্কর গুহ

        সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক

মতামত জানানঃguho.dipankar@gmail.com/ …. Or, media.ekabinsha@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *