২০২০ টোকিও অলিম্পিক্স-হাতে তিন তুরুপের তাস।লিখেছেন, বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক- দীপঙ্কর গুহ

sindhu-featureসন্তোষ ট্রফি,ফুটবলের জাতীয় প্রতিযোগিতা।ইরানি ট্রফি কিংবা রঞ্জি ট্রফি ক্রিকেটে জাতীয় স্তরের সেরা প্রতিযোগিতা।এদেশে ক্রিকেট আর ফুটবলই আজ জাতীয় খেলার মর্যাদায় বসে আছে।যদিও সরকারিভাবে জাতীয় খেলা কবাডি।কিন্তু প্রচারের আলোয় সকলে ‘প্রো কবাডি’র খবর রাখে।জাতীয় দলের খবর ক’জন রাখে?এই সন্তোষ ট্রফি বা রঞ্জি ট্রফি কিংবা ইরানি ট্রফিতে হালে ক’জন জাতীয় দলের ফুটবলাররা কিংবা ক্রিকেটাররা খেলেন?

জাতীয় ক্রিকেট নির্বাচকরা মনে করতে পারছে না।সন্তোষ ট্রফিতে বাংলা দল গড়তেই হিমসিম খান আইএফএ কর্তারা।বড় ক্লাবের প্রথম সারির কেন,দ্বিতীয় সারির ফুটবলারও পান না কোচ। অথচ পর্বত প্রমান চাপ থাকে ‘দেশের সেরা’ হতে হবে।ক্রিকেটারদের কথাই তো আলাদা।জাতীয় দলের প্রথম সারির ক্রিকেটাররা,জাতীয় দলের খেলা না থাকলে ‘বিশ্রাম’ নেন।সেই ‘বিশ্রামের’ তালিকায় ঢুকে যায় ব্রান্ড এন্ডোস’মেন্ট এর কাজ।মোটা টাকার বিনিময়ে ক্লায়েন্টরা এসব তারকা’দের নিজেদের প্রোডাক্ট বেচতে ব্যবহার করেন।ক্রিকেটের কর্তারাও এসব দেখেও দেখেন না।জাতীয় পর্যায়ে খেলা তাই বাধ্যতামুলক নয়।

এখানেই বাজিমাত করে দিল সিনিয়র জাতীয় ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতা।সাত দিনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।দেশের সব নামজাদা ব্যাডমিন্টন তারকারা প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন।কি লাভ?এই সিনিয়র জাতীয় প্রতিযোগিতা খেললে জাতীয় দলে এঁদের জায়গা মিলবে-তা কিন্তু নয়।বরঞ্চ কৃতিত্বটা ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন কর্তাদের।বিশেষ করে-ডঃ হেমন্ত বিশ্বশর্মার।সর্বভারতীয় ব্যাডমিন্টন সংস্থার সভাপতি হয়েছেন বিনা লড়াইয়ে।অসম রাজ্য ব্যাডমিন্টন সংস্থার সভাপতি এখন জাতীয় ফেডারেশনেরও শীর্ষ পদে বসে।উদ্যোগটা তারই।অসমের এই জনপ্রিয় বিজেপি নেতা বদলে দিতে চান ব্যাডমিন্টনের খোল নলছে।

ভারতীয় ব্যাডমিন্টন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।বিশ্ব ব্যাডমিন্টন মঞ্চে এখন ভারতীয় প্লেয়ারদের কেউ হালকাভাবে নেয় না।নেবেই বা কিভাবে!সবে প্লেয়ারদের র‍্যাঙ্কিং লিস্ট প্রকাশ পেল।সেখানে ভারতের শ্রীকান্ত এখন উঠে এসেছে দু’নম্বরে। ১৫ দিন আগেও ছিল ৮ নম্বরে।সাতদিন আগে ছিলেন ৪ নম্বরে।এখন হিরো নাম্বার-‘টু’।

পুরুষ সিঙ্গলসে বিশ্ব তালিকায় দু’নম্বরে এক ভারতীয় ব্যাডমিন্টন প্লেয়ার!শেষ কবে এমনটা ভেবেছিল দেশের ক্রীড়ামহল?১৯৮০সালে অল ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিল প্রথম ভারতীয় হয়ে প্রকাশ পাডুকোন।তখনও প্রকাশ এমন র‍্যাঙ্কিং পাননি।১৯৮৩তে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েও প্রকাশ প্রথম তিনজনেও জায়গা করতে পারেনি।এরপর পুলেল্লা গোপিচান্দ।২০০১ সালে দ্বিতীয় ভারতীয় হয়ে অল ইংল্যান্ড খেতাব জিতেছিলেন।কিন্তু রাঙ্কিং-‘টু’ অধরা ছিল।কিদাম্বির দম আছে বটে!

২৪ বছর মাত্র বয়স।প্রথম ভারতীয় হয়ে কিদাম্বি জিতলেন এবছরই ‘চায়না ওপেন সুপার সিরিজ প্রিমিয়ার’।পুরুষদের সিঙ্গলসে হারালেন অলিম্পিকে সোনাজয়ী লিন ডান’কে।এবারই তিনি কোর্টে বেসামাল করলেন রিও অলম্পিক চ্যাম্পিয়ন-চেন লং’কে।অস্ট্রেলিয়ান ওপেন খেতাব তার দখলে।প্রথম ভারতীয় হয়ে ইন্দোনেশিয়ান ওপেন জেতেন।হালে ডেনমার্ক ও ফ্রেঞ্চ ওপেন সুপার সিরিজও জেতেন।একবছরে চার-চারটি সুপার সিরিজ জেতেন নি এর আগে কোন ভারতীয়!ক্রিকেট অলিম্পিক গেম নেই।ফুটবলে আমরা আয়োজক দেশ হয়ে সদ্য বিশ্বকাপ অনূর্ধ্ব-১৭ তে অংশ নিতে পারলাম।বিশ্বকাপে খেলা স্বাদ পুরন হোল।সাধ্যে কুললো না-প্রথম রাউন্ডের গণ্ডি টপকাতে।ফিফার বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে আজও ভারতীয় ফুটবল ৯০ থেকে ১২০’র মধ্যে থাকে-ধারাবাহিক ভালো খেললে।

প্রতিবেদনটি লেখার সময় মনেই হচ্ছিল, ক্রিকেট-ফুটবল ছাড়া অন্য কিছু পাঠক পাতে নেবেন তো?এডিটরের আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বর সাহস জোগাল।বুঝতে দেরি হোল না।আজ ফেডারেশন সভাপতি হেমন্ত বিশ্বশর্মা এই সাহসটাই সকলের মধ্যে ছড়াতে চান।খোঁজ নিয়ে জানা গেল,এবারই সিনিয়র ব্যাডমিন্টনে সবচেয়ে বেশি অঙ্কের আর্থিক পুরষ্কার থাকছে।মোট ৬০লাখ টাকা!প্রতিটি বিভাগের সিঙ্গলস চ্যাম্পিয়নরা পাবেন ২লাখ টাকা করে।৮২তম সিনিয়র আয়োজক মহারাষ্ট্র।

কিন্তু কোর্টের গ্লামার কুইনরা!তারাও আছেন এবার।সাইনা নেহওয়াল,মেয়েদের মধ্যে ব্যাডমিন্টনকে জনপ্রিয় করার তিনিই আসল ‘আইকন’।২০০৮সালে প্রথম নজর কাড়েন সাইনা।কমনওয়েলথ ইয়ুথ গেমসে দেশের হয়ে প্রথম সোনা জেতেন।ঐ বছর বেজিং অলিম্পিকে মেয়েদের সিঙ্গলসে কোয়াটার ফাইনালে পৌঁছে জান।দিল্লিতে ২০১০ সালে কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জেতেন এই হায়দ্রাবাদি কন্যা।২০০৯ সালে বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে মেয়েদের সিঙ্গলস তালিকায় সাইনা ছিলেন হিরোইন নাম্বার-‘টু’।আজ যা কিদাম্বি-হিরো নাম্বার-‘টু’।২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকে মেয়েদের সিঙ্গলসে ব্রোঞ্জ পদক জিতে আনেন।সেবারই প্রথম ভারতীয় পুরুষ ব্যাডমিন্টন প্লেয়ার হয়ে পারুপাল্লি ক্যাশপ পুরুষদের সিঙ্গলসে কোয়াটার ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিলেন।

সাইনার আর ক্যাশপের পর আমরা কোর্টে পেয়ে গেলাম পুশারলা সিন্ধু’কে।মাত্র ১৭ বছর বয়সে মেয়েদের সিঙ্গলস বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে প্রথম ২০তে ঢুকে সকলকে তাক লাগিয়ে দেন।২০১৩ গুয়ানঝাও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ জিতে নিলেন। কোপেনহেগেনেও ব্রোঞ্জ জিতলেন।২০১৪ কমনওয়েলথ গেমস, এশিয়ান গেমস ব্রোঞ্জ পদক।সাইনা সঙ্গে সিন্ধু, ভারতীয় মহিলা দল জিতল-উবের কাপ।ভারতীয় ব্যাডমিন্টন ইতিহাসে প্রথমবার।২০১৬ সালে আবার উবের কাপ জয়।ব্যাডমিন্টন কোর্টে ভারতীয় রাজ।চিন-জাপান-কোরিয়ানদের তাক লাগিয়ে দেওয়া সব সাফল্য।

২০১৬তে রিও অলিম্পিকে সকলের নজর ছিল ব্যাডমিন্টন কন্যাদের দিকে।মেয়েদের  সিঙ্গলসে সিন্ধু পেলেন ব্রোঞ্জ পদক।সাইনাও লড়ে যাচ্ছে।গ্লাসগো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি পেলেন ব্রোঞ্জ।সিন্ধু হলেন প্রথম ভারতীয় মহিলা যিনি কোরিয়া ওপেন সুপার সিরিজ জিতলেন।এখন সানিয়ার র‍্যাঙ্কিং থেকে অনেকটাই এগিয়ে সিন্ধু।

ব্যাডমিন্টন কোর্টে এমন দুই মহিলার সাফল্যে মুখ ঘুরিয়ে থাকতে পারল না বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি।মিলখা সিংহ এর ‘ভাগ মিলখা ভাগ’, মেরি কমের ‘মেরি কম’, বুধিয়া সিংহ এর ‘বর্ণ টু রান’, এম এস ধোনি-‘আনটোল্ড স্টোরি’,‘দঙ্গল’, ‘প্রান সিংহ টোমার’, আজাহার এবং শচীন-এ বিলিয়ন ড্রিমস। এবার ব্যাডমিন্টন কুইন্দের পালা।সাইনার বায়োপিক।সিন্ধুকে নিয়ে বায়োপিক বানাচ্ছেন সনু শুদ।গোপি চাঁদ’কে নিয়েও বায়োপিক বানানোর ছক চলছে।অর্থাৎ ব্যাডমিন্টন কোর্ট এখন বলিউডের বক্স অফিসে জোয়ার আনার-মেড ইজি।

নাগপুরে সিনিয়র জাতীয় প্রতিযোগিতায় হাজির থাকবেন বেঙ্গল ব্যাডমিন্টন সংস্থার সচিব এবং সর্বভারতীয় সংস্থার সহ-সভাপতি শেখর বিশ্বাস জানালেন,আইকন প্লেয়াররা এবারই এমন সিনিয়র জাতীয় প্রতিযোগিতায় খেলতে নামছে।এর পুরো কৃতিত্ব দিলেন ফেডারেশন নয়া সভাপতি হেমন্ত বিশ্বশর্মাকে।স্পষ্টভাষায় শোনালেন, পি ভি সিন্ধু ছাড়া বাকি কেউই এসব টুর্নামেন্টে খেলতে আগ্রহ-ই দেখায় না।এবার এতো বেশি প্রাইজ মানি।আশাকরি,ভবিষ্যতের প্লেয়াররা অনুপ্রানিত হবে।কিন্তু তিনি বাংলার সিনিয়র পর্যায়ের দারুন কিছু পারফর্মেন্স আশা করছেন না।জুনিয়র,সাব- জুনিয়র পর্যায়ের বাংলার সাফল্য বেশি।

বাংলার সমস্যা কলকাতার বুকে ব্যাডমিন্টনের জন্য ভালো পরিকাঠামো ইন্ডোর স্টেডিয়াম নেই।ভরসা সেই দুর্গাপুরে সিধু-কানু স্টেডিয়াম।৩০ কাঠা জমির জন্য রাজ্য সরকারের কাছে অবিরত দরবার করে চলেছেন-রাজ্য ব্যাডমিন্টন সংস্থার কর্তারা।জমি পেলে নিজেরাই ব্যাডমিন্টন স্টেডিয়াম বানানোর পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন ওরা।জমি যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিললেই তাহলে বদলে যাবে বাংলার ব্যাডমিন্টন চালচিত্র।

ব্যাডমিন্টন কোর্টে ব্যক্তিগত দক্ষতায় ভারতীয় ব্যাডমিন্টন বেশি সাফল্য পেয়ে চলেছে।এইচ এস প্রনয়,সাই প্রনিথ,সমীর ভার্মা,অজয় জয়রাম-এরা পুরুষের সিঙ্গলসে লড়াই করে চলেছে।এই প্রথম ভারতের ব্যাডমিন্টন ইতিহাসে পাঁচ পুরুষ সিঙ্গলস প্লেয়ার বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে প্রথম ২০ জনে জায়গা করে নিয়েছে।ফুটবল তো বাদই দিলাম,ক্রিকেটে আই সি সি র‍্যাঙ্কিংয়ে এমন সাফল্য কোহলি বাহিনীর নেই।ধোনি বাহিনীরও ছিল না।

ভারতীয় ব্যাডমিন্টনে এখন চ্যালেঞ্জ হলঃ ডাবলসে সাফল্য।জ্বালা গুট্টা এই বিভাগে এখনও পর্যন্ত সেরা।২০১১ লন্ডন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অশ্বিনী এবং জ্বালা মেয়েদের ডাবলসে ব্রোঞ্জ পদক পান।ভারতের এটাই প্রথম ডাবলস সাফল্য।এর আগে গুট্টা- ভালিয়াভিতিল জুটি বিশ্ব সুপার সিরিজে ফাইনালে রুপো জেতে।২০১০ দিল্লি কমনওয়েলথ গেমসে জুট্টা-পুনাপ্পা জুটি সোনা জেতে।

ডাবলসে এখন নজরঃ অশ্বিনী পুনাপ্পা,সিক্কি রেড্ডি, সাওইকসাইরাজ রানকি রেড্ডি,চিরাগ সেঠি,প্রনব জেরি চোপড়া।যদিও জাতীয় দলের কোচ গোপিচাঁদ মনে করে,অলিম্পিক মেডেল ডাবলসে জিততে অনেক খাটা-খাটুনির প্রয়োজন।

২০২০ তে টোকিও অলিম্পিক্স।পুরুষ এবং মহিলাদের সিঙ্গলসে শোনার পদক পাওয়াটাই-এখন চ্যালেঞ্জ নম্বর ওয়ান।

দীপঙ্কর গুহ

দীপঙ্কর গুহ

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *