লোলিত মোদী, ক্রিকেটের নায়ক না খলনায়ক?

Web-Lalit-Modi-Borderছেলেটাকে কোথাও রেখে শান্তি পাচ্ছিলেন না শিল্পপতি বাবা কৃষাণ কুমার মোদি।ভারতের উত্তর থেকে দক্ষিণ,পূর্ব থেকে পশ্চিম এমন কোনও স্কুল বাকি নেই যেখানে পাঠানো হয়নি ছেলেটিকে।যে স্কুলেই গেছে প্রতিদিন স্কুল থেকে ছেলের নামে অভিযোগের পাহাড় বাবাকে বিব্রত করেছে।হয় স্কুল পালায়, মারামারি করে নাহলে শিক্ষকদের সঙ্গে অভব্য আচরণ করে।পরিনতি একটার পর একটা স্কুল বদলানো।বিরক্ত,বিব্রত,ক্লান্ত বাবা অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দেবেন।আমেরিকায় পাঠিয়েও দিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই ছেলের কীর্তিকলাপের সংবাদে বাবার পিলে চমকে উঠল।মাদকসেবন, মাদক পাচার, অপহরণ, হত্যার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র আক্রমণ; এমন সব অভিযোগে দফায় দফায় গ্রেপ্তার ছেলে।এদিকে বাবা লোকসমাজে কোথায় মুখ লুকোবেন সেটাই ভেবে অস্থির।
এবার স্বাভাবিক ভাবে মনে প্রশ্নের উদয় হতে পারে কে এই হীরের টুকরো ছেলে যার গুনপনা এমন ফলাও করে লেখা হচ্ছে!লিখতেই হবে কারণ,আজকের বিশ্বক্রিকেটে সবচাইতে কলঙ্কিত ও আলোচিত এই ছেলেটি।শ্রী লোলিত কুমার মোদি।যার প্রদেয় যন্ত্রণা শুধু পরিবারের গন্ডিতেই সিমাবদ্ধ থাকেনি গণ্ডি ছাড়িয়ে আছড়ে এসে পড়েছে ক্রিকেটে।যার জ্বালায় বার বার অতিষ্ঠ হয়েছে তাবৎ ক্রিকেট দুনিয়া!কলঙ্কিত হয়ে ক্রিকেট,তার ভদ্রলোকের খেলার তকমা খুইয়েছে।

২০০৫ সালের আগে ক্রিকেট দুনিয়ায় কেউ লোলিত মোদিকে চিনতো না।কিন্তু এহেন লোলিতই বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রতাপশালী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলো।ফোর্বস ম্যাগাজিনের হিসাবে তিনি দুনিয়ার অন্যতম শক্তিশালী ক্রীড়াব্যক্তিত্ব। টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতে ভারতের ৩০তম ক্ষমতাশালি মানুষ! ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগকে(আইপিএল)দিয়ে ক্রিকেট, সিনেমা ও ক্রাইমকে এক পংতিতে এনেছিলেন!
মোদিনগরের প্রতিষ্ঠাতা রাজবাহাদুর গুজারমাল মোদির বংশে জন্ম লোলিত মোদির।মোদি এন্টারপ্রাইজ সাম্রাজ্যের মালিক বাবা কৃষাণ কুমার মোদি ছেলেকে
স্বনামধন্য পরিবারের উপযোগী করে তোলার উদ্দেশ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছিলেন।সেখানে ডিউক ইউনিভার্সিটিতে পড়া অবস্থায়, ১৯৮৫ সালে ১মার্চ প্রথম গ্রেপ্তার হন লোলিত।৪০০গ্রাম কোকেন সহ পাচারের অপরাধে মোদিকে বামাল সমেত ধরে ফেলে পুলিশ।অস্ত্র নিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানোর অভিযোগও দায়ের করা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।সেই যাত্রায় আদালত তাঁকে শর্তসাপেক্ষে ছেড়ে দিলেও মাসখানেকের মধ্যে আবার গ্রেপ্তার হন মোদি।
২এপ্রিল, ১৯৮৫ ডিউক ইউনিভার্সিটির আরও এক ছাত্রসহ মোদিকে গ্রেপ্তার করা হয় মারামারি ও অপহরণের অভিযোগে। এবার আদালত তাঁকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন।পরবর্তীকালে পত্রপত্রিকাগুলো এসব পুরোনো অভিযোগ সামনে আনলে সবই অস্বীকার করেন মোদি।অবশেষে শারীরিক অসুস্থতার কারন দেখিয়ে আদালতের অনুমতিসাপেক্ষে ১৯৮৬ সালে মোদী ভারতে ফিরে আসেন।১৯৯৯ সাল পর্যন্ত লোলিতকে,‘মোদি এন্টারপ্রাইজ’-এর নানা ব্যবসায়িক কাজে দেখা গেছে।
এ সময়ে মোটামুটি ‘নিরুপদ্রব’ জীবন কাটান মোদি।নিরুপদ্রব মানে, একেবারে শান্তশিষ্ট সুবোধ বালকটি ন্যায় নয়।তবে ১৯৯৭ সালে চুক্তিভঙ্গের দায়ে মোদিকে আদালতে তুলেছিল ইএসপিএন।বিতর্ক লোলিতকে কখনই পিছু ছাড়েনি।এক দিওয়ালির রাতে নেশার ঝোঁকে এককোটি টাকার বেশি জুয়ায় উড়িয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।কিছুদিন পর আবার আদালতে হাজির হতে হয় আরব আমিরশাহিতে মাদক পাচারের অভিযোগে। এবার তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়েছিল কিন্তু পার পেয়ে গিয়েছিল ক্ষমতাধর বাবার প্রভাবে।এর প্রত্যেকটা ঘটনাই সংবাদমাধ্যমে এসেছে।কিন্তু সংবাদমাধ্যম কোনোদিনই গুনাক্ষরেও অনুমান করতে পারেনি, এই লোকটিই একদিন ক্রিকেটের শিরোনাম খবর হবেন।
যতদূর জানা যায় যে লোলিত স্কুল ও কলেজ-জীবনে খেলাধুলার বিষয়ে অল্পস্বল্প খোঁজখবর রাখতেন।কিন্তু ক্রিকেট নিয়ে তাঁর আগ্রহের কথা কেউ উল্লেখ করে নি।এক কলেজ বন্ধুর স্মৃতিচারণায়,  পেলে আর বিয়ন বর্গ এই দুজন ওর প্রিয় খেলোয়াড় তালিকায় কোনো ক্রিকেট তারকার নাম নেই।তাজ্জব ব্যাপার এই  মোদিই ১৯৯৯ সালে হিমাচল ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হয়ে গেলেন।সদস্য হয়েই প্রতিশ্রুতি দিলেন, নতুন একটা স্টেডিয়াম গড়ে দেবেন।তবে তার আগেই ২০০০সালে এই অ্যাসোসিয়েশন থেকে তাঁকে বের করে দেন প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। ততদিনে ক্রিকেটের নেশা ধরে গেছে মোদির। নামটাকে সামান্য বদলে ‘লোলিত কুমার’ করে তিনি নাগোর জেলার প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন রাজস্থান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনে(আরসিএ)।
এরপর বন্ধুপ্রতিম বসুন্ধরা রাজে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় মোদি রাতারাতি আরসিএ সভাপতি হিসেবে বিসিসিআইয়ের সদস্য হয়ে যান।
বিসিসিআইয়ের সদস্য হওয়ার পরই তৎকালীন সভাপতি জগমোহন ডালমিয়াকে ‘ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ’  নামে সীমিত ওভারের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আয়োজনের প্রস্তাব দেন, যেখানে বিদেশিরাও খেলবেন।ডালমিয়া এই প্রস্তাব মেনে নেন নি।
এবার লোলিত শুরু করলেন নতুন খেলা মোদি নতুন খেলা।কংগ্রেস নেতা শারদ পাওয়ারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ডালমিয়াকে বোর্ড থেকে সরানোর ষড়যন্ত্র শুরু করলেন।এ কাজে সাফল্যের পুরস্কার পান মোদি।বিসিসিআই-এর সহ-সভাপতির পদ প্রাপ্তি হয়।মোদির ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ পরিকল্পনা ছাড়পত্র পেয়ে যায়। কারণ ততদিনে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ (আইসিএল) নামে একটি টুর্নামেন্ট মাথা তুলে ফেলেছে।
এসেল গ্রুপের মালিক সুভাষ চন্দ্রের আইসিএলকে জৌলুশহীন করা ও বিপুল টাকা কামাইয়ের জোড়া লক্ষ নিয়ে যাত্রা শুরু করে আইপিএল। ক্রিকেট দুনিয়ায় শুরু হয় ‘লোলিত মোদি যুগ’।
আইপিএল শুধু বিসিসিআইকে নয়, দুনিয়ার অনেক ক্রিকেটারকেই টাকার পাহাড়ে চড়িয়ে দিয়েছে।আইপিএলের টাকার দাপট দেখিয়ে মোদিরা অগ্রাহ্য করতে শুরু করেন ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রকেও।২০০৯ সালে সাধারণ নির্বাচনের কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় আইপিএলকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে যান মোদি।এই ঘটনায় স্পষ্ট ক্ষুব্ধ তদানীন্তন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম প্রতিক্রিয়া জানান।
সরকারের সঙ্গে এই দ্বন্দ্বের ফলে ২০০৯ সালে মোদী হেরে যান আরসিএ নির্বাচনে।বিসিসিআইতে তাঁর পদ শঙ্কার মধ্যে পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আইএস বিন্দ্রার আশীর্বাদে মোদি পাঞ্জাব ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি হয়ে যান।ফলে টিকে যায় তাঁর বিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি পদ।
কিন্তু শেষ রক্ষা হল না মোদির। আবারও সরকারের সঙ্গে ঝামেলা।এবার আইপিএল চলাকালীন সময়।টুইটার-এ তিনি অভিযোগ করেন, আইপিএলের দল কোচির মালিকানা বান্ধবীকে পাইয়ে দিতে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শশী থারুর। এ অভিযোগের কারনে পরে থারুরকে পদত্যাগও করতে হয়েছে।
ততদিনে মোদির সঙ্গে কংগ্রেস সরকারের বিরোধটা চরমে পৌঁছে গেছে। আগেই আইপিএলকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়েছিলেন মোদি।সে সময় চিদাম্বরমরা একযোগে মোদিকে জেলে ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু পারেন নি শরদ পাওয়ারের জন্য।কিন্তু এবারের গন্ডগোলে শরদ পাওয়ার,নিরঞ্জন শাহরা আর মোদির পাশে দাড়ালেন না।উল্টে তারাই মোদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করলেন।
ফলস্বরুপ মোদীকে বিসিসিআই সহ-সভাপতির পদ খোয়াতে হয়।সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আইপিএল চেয়ারম্যান পদটা আপনা-আপনি হারিয়ে যায়।সময় যত গেছে তত একটা পর একটা অভিযোগ আসতে শুরু করে মোদির নামে।দল কেনাবেচায় কারচুপি, বেনামে তিনটি আইপিএল দলের মালিকানার দায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাজির সিন্ডিকেট পরিচালনা, প্রচারস্বত্বে অস্বচ্ছতা, অবৈধ লেনদেন, আয়করে ফাঁকির অভিযোগের ভারে তখন ধরাশায়ী লোলিত। পালিয়ে চলে গেলেন ইংল্যান্ডে।পালিয়ে ইংল্যান্ডে গিয়ে দাবি করেছেন, তিনি ‘পালননি’।
তবে এটাও বলেছেন, আপাতত দেশে ফেরার ইচ্ছে নেই তার। কারণ ভালো করেই জানেন, হাতকড়া নিয়ে তাকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত চিদাম্বরমরা। একটার পর একটা পুরোনো মামলা জীবিত করে তোলা হয়েছে। একেই বোধহয় ‘ন্যাচারাল পানিশমেন্ট’ বলে!
তারপরও মোদি কিন্তু কথার জোর কমাননি। মাঝে মধ্যেই আইসিএল নিয়ে অনেক কিছু ফাস করে দিচ্ছেন টুইটারে। তিনি বলছেন, আবার ঘুরে দাঁড়াবেন। এই ক্রিকেট দুস্কৃতকারী ঘুরে দাড়ালে ক্রিকেট কোথায় গিয়ে দাড়াবে!!!

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *