ময়দানে “ছোট” বলের কাছে মান খোয়াচ্ছে “বড়” বল…DG Talks

ifameeting28082012বাংলায় শরণার্থীদের ভিড় রোজ বাড়ছে-এ আর নতুন তথ্য নয়। চমৎকার তথ্যটি জানলাম কদিন আগে।সরকারের একটি দফতরের নাম রিফুজি হান্ডিক্রাফট ম্যানেজিং কমিটি।এই কমিটি সম্প্রতি হুগলী জেলার তারকেস্বরের এক গ্রামে ৪১ জন মহিলাকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।কিসের ট্রেনিং?ফুটবল তৈরির।ওরা ফুটবল বানাচ্ছে।মাষে ৭৫০টাকা স্টাইপেন্ড পাচ্ছে।সংস্থার চেয়ারম্যান মানস ভট্টাচার্য বলছিলেন, “রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী চান বাংলার প্রানের খেলা যখন ফুটবল তখন ফুটবল কেন অন্য রাজ্য থেকে এসে এই রাজ্যে ব্যবসা বাড়াবে! সেই ১৯৭০ সাল থেকে এই রাজ্যে আর ফুটবল তৈরি হয় না”। বছরে ১লাখ ফুটবল এই রাজ্যে আমদানি হয় পাঞ্জাব থেকে।অথচ ফুটবল টুর্নামেন্টে যে গানটা শোনা বাধ্যতামূলক তা হলঃ “সব খেলার সেরা বাঙ্গালীর তুমি ফুটবল”।মান্না দে’র গায়কিতে ফুটবল মাদকতা।মুখ্যমন্ত্রী যেমন এমন এক ব্যবসার দিকে নজর দিচ্ছেন,সকলকে উৎসাহিত করছেন-বাংলার ফুটবল কর্তাদের কোনও হেলদোল আছে বলে মনে হয় না। গদাই লস্করে চলতে থাকা ফুটবলের মান তলানি ফুটো করে ছড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়।

ফুটবল ব্যবসায় প্রান আনতে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত এই কমিটি পরকল্পনা নিয়েছে হাওড়াতেও ট্রেনিংক্যাম্প করবে।প্রাথমিকভাবে রাজ্য হাজার জন পটু কর্মিকে তৈরি করবে।তাদের ফুটবল বানানোর জন্য যাবতীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হবে।আপাতত তাদের বানানো ৩৫০টি ফুটবলকে পরখ করা হচ্ছে।আস্তে আস্তে বাজার ধরে নয়া প্রযুক্তি নিয়ে বাংলায় আবার ফিরিয়ে আনাই মুখ্যমন্ত্রীর লক্ষ্য। ভাবা যায়, বাংলার প্রানের ফুটবল এবং সেই গোলাকার বস্তুটির লোভনীয় ব্যবসা ৭০ সালের পর লাটে উঠে  গেছে!

105896_heroa

বাংলার ফুটবলটাও যেন সেই পথে হাঁটছে।ময়দানের কয়েকটি ক্লাব তাঁবুতে বসে বাংলা তথা কলকাতা ফুটবলের অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি হয়।গতবার একাধিকবার রেড রোড ও মেয় রোডের মাঝখানে থাকা এক ক্লাব তাঁবুতে ভিড় করেছিলেন বেশ কয়েকজন ক্লাবকর্তা।আলোচ্য বিষয় কি ছিল? প্রিমিয়ার ডিভিশনের অবনমন আটকে বিশেষ একটি দলকে অবনমন থেকে বাঁচানো।প্রিমিয়ার ডিভিশনে ওঠাটা রাখতে হবে,কারন, ‘ক্ষমতাশালী’ এক পরিবারের ক্লাব ভালো খেলে  প্রিমিয়ারে উঠতে চলেছে।এই ক্লাবের গাঁ ঘেঁষে যাওয়া রাস্তার ওপারে আরেক তাঁবু।সেখানে সান্ধ্যবাসরে ফুটবল ‘আড্ডা’ বসে বাংলা ফুটবলের এক বড় কর্তার পরিকল্পনা ‘বিলি’ করতে! অথচ এইসব আড্ডা- অ্যাকশান প্ল্যান বসে না ‘আইএফএ’ অফিসে!

‘আইএফএ’ ক্ষমতাশালী কর্তারা একটেবিলে বসতে চাইলে তা চলে যায় পার্ক স্ট্রীটের এক ক্লাবে।এতো সবে বাংলার ফুটবল গিয়েছে?পরিসংখান বলছে-না, ‘আইএফএ’র বার্ষিক অডিট রিপোর্ট বলছেঃ না। ভাবতে কিছুটা লজ্জাই লাগে,‘সিএবি’র পদাধিকারীরা কোণ ক্লাবের প্রতিনিধি-বলতে পারব।‘আইএফএ’র কে-কারা কোণ ক্লাবের, সেই ক্লাব কোণ ডিভিশনের তা কলকাতার অনেক ফুটবল কর্তাই মনে রাখতে পারেন না।‘আইএফএ’তে এমনসব ক্ষমতাশালী ফুটবল কর্তা আছেন যারা নিজেদের ফেসবুক উপডেট যত দক্ষতার সঙ্গে করেন, ‘আইএফএ’ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তততাই গড়িমসি করেন।

images

‘আইএফএ’র কাজকর্ম পার্ক স্ট্রীট- মল্লিক বাজারের এক কর্তার অফিসে যতটা হয়- সদর দফতরে কম হয়। ভবানিপুরের এসি কেবিনে যতটা এগিয়ে যায়-‘আইএফএ’র গলির ভেতরের অফিসে বসে তা হয় না।ভাবলে অবাক হতে হয়,বিনা পরিকল্পনায়-আলোচনায় ঠিক হয়ে যায় প্রিমিয়ারের প্লেয়ার রেজিস্ট্রেশন পয়লা জুন থেকে, ২৪ ঘণ্টার বিচিত্র নোটিশে কেন তা হোল্ডে রাখা হোল?শোনা কথা যদি সত্যি হয়,তাহলে গল্পটা বড়ই বিচিত্র।প্রতিটি ক্লাব অনূর্ধ্ব ২৩ ফুটবলার ক’জন রাখতে পারবে।ম্যাচে তাদের খেলানোর বিধিনিষেধ কি?বিদেশী ফুটবলারদের নিয়ম কি হবে?এমন সব প্রশ্নের উত্তর ক্লাব কর্তারা জানতেন না।তারা নাকি অপেক্ষায় ছিলেন ‘আইএফএ’র সভাপতি সুব্রত দত্ত কিংবা সচিব উৎপল গাঙ্গুলি সব রূপরেখা বানিয়ে ফেলেছেন।সই শুরুর আগে জানাবেন।ফোনে ফোনে বার্তা রটিল- কর্তাদেরও টনক নড়িল। সুপার লিগের সুপারব ভাবনা চিন্তা, ‘ভো কাট্টা’। গতবারের ছকে এবারের প্রিমিয়র লিগ।বড় ম্যাচ নাকি বারাসাত স্টেডিয়ামে সম্ভব নয়,তা হতে চলেছে উত্তরবঙ্গে শিলিগুড়ির কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামে,বিচিত্র!!বাংলার ফুটবলপ্রেমী মানুষদের আবেগটাই আটকে রাখতে ব্যথ’কর্তারা।হালে ‘আইএফএ’ কর্তাদের সঙ্গে ইস্ট- মোহন- মেডান কর্তারা আলোচনায় বসেছিলেন।সব কর্তারাই বাংলা ফুটবলের দুই বড় কর্তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আইএফএ’ কবে তাদের বকেয়া পাওনা লাখ লাখ টাকা মেটাবে। উত্তরটা যে দুই বড় কর্তা স্পষ্ট করে দিতে পারবেন না সেটা ক্লাবের কর্তারাও জানেন।

sourav

এই হোল ফারাক এই রাজ্যের ফুটবল- ক্রিকিটের।নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী ‘সিএবি’র সভাপতি ঠিক করে দিয়েছিলেন বলে সমালোচনা হয়েছিল।কিন্তু তিনি যে যোগ্য দুজনকে বেছেছিলেন তা নিয়ে আর কারোর সন্দেহ নেই।‘সিএবি’র সভাপতি হয়ে সৌরভ খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের মন জয় করে নিয়েছেন। হতেপারে সময়টা ঠিক মতন বসানো যায় নি কিন্তু প্রথম ডিভিসন সুপার লিগ তো চালু হয়ে গেল! তিনদিনের ম্যাছ-১৩৫ ওভারের খেলা।ফাইনাল চারদিনে। গোলাপি বলে খেলা।দিন-রাতের টেস্ট ম্যাচের ওয়ার্মআপ।স্টার স্পোর্টস এই প্রথমবার কলকাতা ক্লাব ক্রিকেটের ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার করবে।এই আট দলের টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন পাবে ৫ লাখ টাকা।এবার ক্লাব ক্রিকেটে সব ক্লাব ইনসেন্টিভ পেয়েছে।খেতাব জয়ের লড়াইয়ে থাকা এক ক্লাব কর্তা তো বলেই ফেললেন, এখনই সিএবি থেকে ৫ লাখ টাকা তহবিলে চলে এসেছে।অথচ আইএফএ পতিশ্রুতি মতন পাওনা ১৬-১৭ লাখ টাকা কবে দেবে কে জানে! দল গড়ার আগে টাকা পেলে কাজে লাগত!শুনলেন ফুটবল কর্তারা??

picture12

সৌরভ কিন্তু মেঠো পলিটিক্স খুব একটা জানেন না কিন্তু ওর টীমে এমন কিছু পোড় খাওয়া মানুষ আছে, আগেও ছিল।এরা ডালমিয়ার আস-পাশে ছিল, বিশ্বনাথ দত্তর আস-পাশে থাকত কিন্তু এভাবে ব্র্যান্ড সৌরভকে নিংড়ে অর্থ আনা দেখে হতবাক।চোরা-গোপ্তা রাজনীতির লড়াই সিএবিতে আছে।সৌরভকেও সামলাতে হচ্ছে। কখনও সৌরভচিত ‘ইগো’ সমস্যায় ফেলছে।আবার, শিক্ষানবিশ সৌরভ তাড়াতাড়ি শুধরে নিচ্ছেন।কসমস আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার সময় বিপক্ষের বোলাররা লেগসাইড( কোমরের উচ্চতায় আসা বল) টার্গেট করত। একবার ওকে প্রশ্ন করেছিলাম, এতো পরিশ্রম করো, এই বলগুলো সামলাতে আলাদা অনুশীলন করা যায় না? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাতের ব্যাটটার ব্লেডের দিকে চোখ রেখে স্টান্স নিয়ে জাবাব দিয়েছিল, অনুশীলনই তো চলছে। অনুশীলন!কোথায়? নিজস্ব ডংয়ের জবাব মিলেছিল, ওই যে বোলাররা, ওরাই তো অনুশীলন করিয়ে দিচ্ছে।অপেক্ষা করো দেখবে অরাও বুঝে যাবে।আমাকে ওই জায়গায় আর বল দেবে না। ভবিষ্যৎ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। ঘটনার সঙ্গে প্রশাসক সৌরভের ভীষণ মিল দেখতে পাচ্ছি।যারা তাকে উত্যক্ত করছেন, সৌরভের প্রাথমিক প্রশাসনিক অজ্ঞতার জন্য-তারা ভুল করছেন। সৌরভ আরও মজবুত হচ্ছেন।

468498-eden-gardens

আমি জানি আইএফে’র সচিব উৎপল গাঙ্গুলি সৌরভ- অভিষেক ডালমিয়াকে খুব পছন্দ করেন। কর্পোরেট জগতের মানুষ উৎপল বাবু ফুটবল প্রসাসনে কি বেমানান? নাকি তারও উচিৎ ছিল ক্রিকেট আঙ্গিনায় থাকা? যদি ফুটবল আপনার প্যাশন হয়ে থাকে তাহলে প্লিজ কর্পোরেট কালচারটা দ্রুত ফুতবলে আনুন। ময়দানে ক্লাব-ভোট- গদির গর্তে তলিয়ে যাবেন না।আপনি এবং সুব্রত দত্ত নিয়মিত আইএফএ তে আসুন। ময়দানে তাঁবু বা দামী ক্লাবে বসে আইএফএ’টা আর নাই বা চালালেন।

অন্যথায় বাংলা ফুটবল বাঁচানোর জন্য নবান্ন-ই ভরসা হোক।বাইচুং ভুটিয়া সময় দিতে পারবেন কিনা জানি না। দিব্যেন্দু বিস্বাস পারবেন নিশ্চয়। এমন কাউকে এবার বাংলার ফুটবল প্রসাসনে বসানো হোক কিংবা নিজেদের ইগো বিসর্জন দিয়ে বাবু কর্তারা তাকিয়ে দেখুন, ময়দানের কোল ঘেঁষে সিএবি এগিয়ে চলেছে নানান পরিকল্পনা নিয়ে, আর সব খেলার সেরা বাংলারির এই ফুটবল হালে পানি পাচ্ছে না। সেদিনের সৌরভ- অভিষেকরা পারে আর সুব্রত-উতপলরা পারবে না?!!!

safe_image (5)

DG Talks

দীপঙ্কর গুহ

সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক

মতামত জানান>guha.dipankar@gmail.com

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *