“মহারাজ কো গুসসা কিউ আতা হ্যায়” লিখেছেন, বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক দীপঙ্কর গুহ।

476985-sourav-ganguly-ravi-shastriখেলাধুলার টেবিলঃ বোর্ড কর্তা এবং প্রাক্তন ক্রিকেটারদের কোচ হতে রাজি হলেন না বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়ন বিশ্বনাথ আনন্দ।–এমন ব্রেকিং নিউজ শোনার সময় চলে এসেছে।দাবা বুদ্ধির লড়াই মেশানো এক খেলা।তাস-পাসা সর্বনাশা -এমন খেলার মধ্যে দাবা নেই।কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডে কর্তারা এমন সব সর্বনাশা খেলায় মেতেছেন যে, তাস-পাসার খেলোয়াড়ও লজ্জা পাচ্ছে।বোর্ড কর্তাদের সঙ্গে এমন খেলায় খুল্লাম খুল্লা ক্ষমতার লড়াইয়ে মেতেছেন প্রাক্তন একঝাঁক ক্রিকেটার।ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়েছেন আরও অনেকে।না তারা ক্রিকেটটা খেলেছেন, না খেলা বা খেলার প্রশাসনিক দিকটা বুঝেছেন।বেসামাল বিসিসিআই।

‘থার্ড আই অর্থাৎ ‘ত্রিনয়ন’ দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করার মতন দক্ষ প্রশাসকের ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডে        আজ বড়ই অভাব।দশকের পর দশক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডে দণ্ডে-মুন্ডে কর্তা হয়েছেন।এখনও সেই পরম্পরা বহাল।কিন্তু তারই মধ্যে জগমোহন ডালমিয়া,ইন্দারজিত সিং বিন্দ্রা,রাজসিং দুঙ্গারপুর,শশাঙ্ক মনোহররা এসেছেন।অরাজনৈতিক চরিত্র আরও ছিল।কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দক্ষতা দেখাতে পারেনি।

লোধা পর্বে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি অনুরাগ ঠাকুর,সচিব থেকে ঝটপট সভাপতি হলেন।এমন সব তথ্য আর আলগা মন্তব্য করলেন,যে সাত মাষ পর নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হল মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের কাছে।ক্ষমা মঞ্জুর।এতেই তুষ্ট।

বোর্ডের আঁটঘাঁট জানেন এমন এক দুঁদে প্রাক্তন কর্মীই বলে বসলেন,ডালমিয়া থাকলে এসব এতদুর গড়াতে দিতেনই না।বাদ দিলাম সেসব।মহামান্য কোর্ট যখন অনুরাগকে ক্ষমাই করে দিল,তাহলে তিনি হাত গুটিয়ে বসে কেন!পালটা আপিল এখনও করলেন না!!এখন তো তিনিই বোর্ড সভাপতি হয়ে কাজ চালাতে পারেন-সি কে খান্নাকে কেন অ্যাকটিং প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে!

Sourav-Ganguly-and-BCCI-interim-chief-Jagmohan-Dalmiya21

সত্যিই তো?!অনুরাগের ওপর যে কারনে সুপ্রিম কোর্ট রেগে গিয়েছিল- তাতো মিটেই গেছে।বোর্ড সভাপতির কার্য্যকাল সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আছে।তাহলে আইনি পরামর্শ নিয়ে কেন বোর্ডের মাথায় বসে হাল ধরছেন না!নাকি ধরতে চাইছেন না?

অনুরাগ সর্ব ভারতীয় পর্যায়ে বিজেপি’র যুব সংগঠনের সভাপতি।দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে,রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর নাকি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় সামান্য কিছু রদবদল হতে পারে।তাতে অনুরাগ ঠাকুর নাকি মন্ত্রিত্ব পেতে পারেন।তাই সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে টক্কর(ক্রিকেটের জন্য যা লাগিয়েছিলেন)টা মিটিয়ে ফেললেন।এবং অপেক্ষার দিন গুনতে শুরু করলেন।সৌরভ গাঙ্গুলির জন্মদিনে অনুরাগ শুভেচ্ছা জানিয়ে ট্যুইট করেছিলেন ‘প্রিন্স অফ ক্যালকাটাকে’।সৌরভ পালটা ট্যুইট করে লিখেছিলেন,’তোমাকে বোর্ডে দেখতে চাই ক্রিকেটকর্তা রুপে’।সৌরভ-অনুরাগের বন্ধুত্ব অনেক দিনের,তা গাঢ় হয়,যখন শ্রীনির ছক ভেঙে জগমোহন ডালমিয়া সর্বসম্মতিক্রমে বোর্ড সভাপতি হন।কিন্তু অনুরাগকে সচিব হতে লড়তে হয়েছে।সৌরভের মাস্টার উইনিং স্ট্রোকে একভোটে জিতে অনুরাগ বোর্ড সচিব হন।

অনুরাগ আইসিসি চেয়ারম্যান শশাঙ্ক মনোহরের সঙ্গে অর্থ নিয়ে টক্কর নিয়েছিলেন।কে তখন শশাঙ্কের মোকাবিলা করতে ঠাকুরকে জোরদার ঠেকনা দিয়েছিল।বোর্ড কর্তাদের সঙ্গে আড্ডা দিলেই এখনও দক্ষিণের দাপটের আন্দাজ মেলে।হ্যা-সেই শ্রীনিবাস।এতো কিছুর মাঝে ম্যাচ গড়াপেটার শাস্তিতে বলি হওয়া আইপিএল’র সেই চেন্নাই সুপার কিং আর রাজস্থান রয়্যালস ‘বনবাস’ কাটিয়ে আবার মুলস্রোতে।এবার আবার শ্রীনি’র শাসন।

কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট শেষ শুনানিতে যেভাবে শ্রীনিবাস-নিরঞ্জন শা’দের ভৎসনা করেছে,তাতে অনেকেই আবার শ্রীনি’র স্বপ্নভঙ্গ বলছেন।কিন্তু লক্ষ্যনীয় বিষয় হল,এতোকিছুর মধ্যেও দাক্ষিণাত্যের ‘বাহুবলি’বোর্ডের ভোটারদের হোটেলের বড় ছাদের তলায় ঢুকিয়ে তো ফেলেছেন!আগে থেকে সাবধান বানীকে শোনাতে পারছেন?

অনুরাগের যেমন সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ,একই মেয়াদ তো ক্রিকেট অ্যাডভাইসারি কমিটিরও(সিএসি)।কিন্তু পরিস্থিতি এমনই,রবি শাস্ত্রীকে কোচ করার পরই কোর্টের বানিয়ে দেওয়া কমিটি অফ   অ্যাডমিনিস্টেরস(সিওএ)অ্যাকটিং প্রেসিডেন্ট সি কে খান্নাকে নিয়ে ৪ সদস্যের কমিটি বানিয়ে রবি শাস্ত্রীর সাপোর্ট স্টাফ সাজিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে নিল।অর্থাৎ সৌরভ-শচীন-লক্ষণদের খেল শেষ।জুলাইতেই।

সভাপতি জগমোহন ডালমিয়া,বোর্ড সচিব অনুরাগ ঠাকুররা কি পারতেন না- বোর্ডের পূর্বপরম্পরা মেনে কোচ ঠিক করে নিতে?পারতেন কিন্তু করতে চাননি সেদিন।বোর্ডের নানান অঙ্ক বলছে,সৌরভ গাঙ্গুলিকে বাড়তি গুরুত্ব দিতে চেয়েছিলেন ডালমিয়া-ঠাকুর।ডালমিয়ার স্নেহ আর অনুরাগের কৃতজ্ঞতাবোধ সৌরভকে দুটো কমিটিতে জায়গা করে দেয়।এক,আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিলে দুই,কোচ নির্বাচন ত্রিমূর্তি কমিটিতে।

এক বোর্ড কর্তাকে প্রশ্ন করে উত্তর মিলেছে,রাহুল দ্রাবিড় অনূর্ধ্ব ১৯ জাতীয় দলের কোচ,কুম্বলে কর্ণাটক রাজ্য সংস্থা এবং এন সি এ নিয়ে ব্যস্ত ছিল,তাই সৌরভ-শচীন-লক্ষণকেই ভাবা হয়।কেন তিন?-উত্তর মেলে,দুজন একমত হলেই সিদ্ধান্ত পাকা হবে তাই।তাহলে প্রথমবার কোচ নির্বাচনে কুম্বলের ক্ষেত্রে কি ২-১ ছিল।এবার?

সৌরভ যুগ্মসচিব হয়ে জোর দেন ভীষণ ২০২০তে।সেখানে ব্যাটিং পরামর্শদাতা হয়ে আছেন লক্ষণ।সিএবি বছরে ৩০দিনে ভিভিএস’কে স্পেশাল ট্রিটমেন্টটাই দেয়।বছরে ৯০ লাখ।এতো অর্থ লক্ষণ যোগ্যতা মাফিকই পাচ্ছেন হয়তো।কিন্তু সৌরভ-শচীন-লক্ষণের ত্রিমূর্তি আলোচনায় দাদা কি বরাবরই লক্ষণের প্রিয় রয়ে গেছেন?তা যদি হতো তাহলে এবার রবি কেন?কেন কোহলির এতো সাহস হয় সে দেশের অন্যতম ম্যাচ উইনার বলে;আর একসঙ্গে থাকা যাচ্ছে না।

kumble-kohli-m

ডালমিয়া বেঁচে থাকলে কি হতো?চ্যাম্পিয়ন ট্রফির ফাইনালে হারের পর কম্বলের আগে কোহলির ডাক পড়ত।কলকাতায় একছুটে আসতে হতো।ঠিক যেভাবে অনিল কুম্বলেকে একসময় অরুন লালের প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েসন নিয়ে মাততে দেখে ডালমিয়া ডেকে ছিলেন।তার স্টাইলে বুঝিয়েছিলেন।কুম্বলে দল থেকে বাদ পড়ার শাস্তি মাথায় নিয়ে খেলায় মন দেয়।

এই প্রতিবেদক শেষবার সৌরভ-শাস্ত্রীকে একসঙ্গে দেখার সুযোগ পেয়েছিল।ডালমিয়ার শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে।আলিপুরের বাড়ির ভেতর প্রয়াত ডালমিয়া শায়িত।নানান ক্রিয়াকর্মে ব্যস্ত ডালমিয়া পুত্র অভিষেকসহ আত্মীয়রা।অনুরাগ-অনিরুদ্ধ চৌধুরী ঢুকলেন ফুলের স্তবক নিয়ে,শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।সঙ্গে রবি শাস্ত্রীও।সৌরভও তখন হাজির।সকলের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়ের ছবি আজও চোখে ভাসছে।কিন্তু রবি-সৌরভের মধ্যে একবারের জন্যেও হাই-হ্যালো হলো না।দুজনের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বলে দিচ্ছিল যে কেউ কারোর চেয়ে কম যান না।এরপর রবি আগে আলাদা গাড়ীতে উঠে এয়ারপোর্ট চলে যান।সৌরভ বোর্ড সচিব অনুরাগের সঙ্গে এক গাড়ীতে উঠে ইডেন রওয়ানা হন,ডালমিয়ার শেষ যাত্রার সঙ্গী হতে।

তারপর কুম্বলের কোচ হওয়া পর্বে রবি’র সৌরভের প্রতি উষ্মা প্রকাশ-অনেক প্রশ্নের উত্তর পেতে এই প্রিতিবেদক কে সাহায্য করেছে।এবারও করেছে।বোর্ড সুত্র বলছে, রবি শাস্ত্রী সাপোর্ট স্টাফ ভরত অরুন বলতে সৌরভ নাকি বলেন অন্য নাম বল।রবি নাকি গিলেপসিকেই চান(রাগত হয়ে)।সৌরভ তখন জাহিরের নাম বলেন।সঞ্জয় বাঙ্গারের নামে প্রশংসা করেছিলেন বিরাট কোহলি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সময়, কুম্বলে তখনও কোচের দায়িত্বে।বাঙ্গারের নাম উঠতে এবার ওঠে দ্রাবিড়ের নাম।

আসলে সৌরভ জানেন তার আমলে সাফল্যের কারিগর কারা ছিলেন।নতুন প্রজন্ম তাদের দেখেই এগোচ্ছে।দিল্লির কোহলিকে ঠাপে রাখতেই তাই কোচের পদে আবেদন জানান বিরেন্দ্র সেহওয়াগ।কোহলি খেলাটা বুঝে শেষ পর্যায়ে রবির নাম বলেননি।আগেই কাজ সেরে রেখেছিলেন,শচীনকে রবির কথা বলে।

কিন্তু কুম্বলে যে মেজাজ খুইয়ে শেষ ৩-৪ মাষ অধিনায়কের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে যাচ্ছিলেন,সেটা সৌরভ সামাল দিতে পারেন নি।চ্যাম্পিয়নস ট্রফির খেলা, না খেলা নিয়ে বোর্ডকর্তাদের আগে নিজের মত জাহির করে ফেলেন কুম্বলে।বোর্ডের কাছে ২০১৯ বিশ্বকাপের প্রেজেন্টটেশনে ক্রিকেটারদের আর্থিক মডেল নিয়ে লিখে বোর্ডকর্তাদের বিরাগভাজন হন।রবি ধারাভাষ্যকার হয়েও টিম ইন্ডিয়ার সকলের সঙ্গে বড়দার মতো মিশে থাকতেন।একা কোহলি নয়,দলের ক্রিকেটারদের একাংশ কুম্বলের হেড স্যার মেজাজে চলাটা মানতে পারছিলেন না।টিম ইন্ডিয়ার সত্যি কোচ দরকার নেই, দরকার ম্যানেজার।১৯৮৩ বিশ্বকাপ দেখা যাক।অধিনায়ক কপিল দেব আর ম্যানেজার প্রাক্তন ক্রিকেটার মান সিং।কোচ চাই- বিদেশি কোচ চাই- এই চাহিদার জন্ম কিন্তু নেতা আজাহারের সময় থেকে।সেই সময় ফিটনেস টেস্টের রিপোর্ট ঘাঁটলে মিলবে আজ্জু-দা বেষ্ট।এমনকি শচীনও নাকি ফিটনেস টেস্টে আটকে যেতেন।অধিনায়ক সৌরভ প্রথম রাস্তা দেখান, জন রাইটকে পছন্দ করে।তখনও রাহুল দ্রাবিড় টম মুডির নাম করলেও- বোর্ড সভাপতি রাজসিং দুঙ্গারপুর মেনে নেন শচীন-সৌরভের যুক্তি।এমন একজনকে চাই,যিনি বিশ্বসেরা হওয়ার খিদে নিয়ে এখনও ঘুরছেন।ভালো ক্রিকেটার-যার দেশ বিশ্বসেরা হয়নি।অর্থাৎ বোর্ড সভাপতি-বোর্ড সিচিবদের পছন্দমতন বোর্ডের রাজনীতির নানান অঙ্ক সরিয়ে-ডালমিয়া ও রাজ সৌরভদের জন রাইট’কে দেন।জন রাইটকে ডালমিয়া সুচারুভাবে কাজে লাগাতেন।নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।সময় থাকলে ডেকে এনে সামনা-সামনি বসে কথা বলতেন।

অধিনায়ক সৌরভ চেয়েছিলেন বলে গ্রেগ চ্যাপেল এসেছিল।একরাশ ক্রিকেটার চ্যাপেলের দাদাগিরি না মানতে পেরে নালিশ করায়-বাই বাই হন চ্যাপেল।গ্যারি-ধোনির ফর্মুলাও ছিল তাই।ডানকান ফ্লেচার কিন্তু আবার সেই বোর্ড সভাপতি- বোর্ড সিচিবের পছন্দে।ফলে দলের মধ্যে চাপ পড়ল।রবি এলো, দলও জাগল।কুম্বলের নয়া মন্ত্র হজম করা গেল না।রবি’র আবার উদয়।এবার রবি’র কঠিন পরীক্ষা,২০১৯ বিশ্বকাপ পর্যন্ত।নির্বাচকদের ফর্মেশন কি হবে-তা লোধা কমিটির সুপারিশ মানতে হলে একরকম।না মানলে,অন্যরকম।তবে ভারতীয় ক্রিকেট প্রশাসকদের মধ্যে রেষারেষি ছিল।এখন প্রাক্তন ক্রিকেটারদের মধ্যে শুরু হয়ে গেল।সিওএ কমিটির ভারতীয় ক্রিকেট পরিচালনার কায়দা কানুন দেখে সবচেয়ে দুঃখ পাচ্ছেন একজনই।প্রয়াত জগমোহন ডালমিয়া।অন্য খেলার মানুষজন দেখছেন,কি প্রতিহিংসাপরায়ন এই ‘ভারতীয় ক্রিকেটের রঙ্গভূমি’।

দীপকর গুহ

দীপকর গুহ

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *