ফুটবলের যুবরাজ, মারাডোনার আজ জন্মদিন।

1986সময়টা ১৯৮৬ সালের ২২শে জুন। মেক্সিকোর আজটেকা স্টেডিয়ামে চলছে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড এর খেলা, ম্যাচের ৫৬-৫৭ মিনিটে গোলপোস্ট থেকে ৬০ ইয়ার্ড দূরে থেকে একজন খেলোয়াড় বল পেয়েই দারুন গতিতে এক, দুই , তিন,চার,পাঁচ জন বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোলকিপারকে বোকা বানিয়ে বল পাঠিয়ে দিলেন জালে! মাত্র ১০ সেকেন্ডের এক আশ্চর্যময় ফুটবল যাদুকরের কারিশমা দেখে পুরো বিশ্ব যেন কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল! আর তখনি বিদগ্ধ ধারাভাষ্যকারদের মুখ থেকে বেরিয়েছিল বিখ্যাত সব কমেন্ট্রী!

তিনি আর কেউ নন,আর্জেন্টাইন মহাতারকা ফুটবলার-ডিয়েগো মারাডোনা।পুরো নাম ডিয়েগো আর্মান্দো মারাডোনা। ডিয়েগো আর্মান্দো মারাডোনা।৫.৮ ফিট উচ্চতার এই মানুষটি দৈহিক দিক থেকে তিনি ছিলেন শক্তিশালী।সীমিত জায়গায় বল নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা অবাক করে দেওয়ার মতো ছিল।খাটো শরীর নিয়ে তিনি একজন ডিফেন্ডারের বিরুদ্ধে লম্বা সময় ধরে বল নিজের নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারতেন, যতক্ষণ না তিনি দ্রুত শট নেওয়ার মত জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন বা কোনো সতীর্থকে  বল পাস করতে পারছেন।ডান উইঙ্গ ধরে পূর্ণ গতিতে ড্রিবলিং। প্রতিপক্ষের গোল লাইনে পৌছে সতীর্থদের বল পাস আর গোল।কতবার বিপক্ষ ধরাশায়ী হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।মারাডোনার র‍্যাবোনা, পায়ের পিছনের অংশ ব্যবহার করে এক ধরণের রিভার্স-ক্রস পাস শটে হরবখত ধোঁকা খেত প্রতিপক্ষ। সর্বপরি মারাডোনার বিপজ্জনক ফ্রি-কিক।

পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারে তিনি আর্জেন্টিনো জুনিয়র্স, বোকাজুনিয়র্স, বার্সেলোনা, নাপোলি, সেভিয়া এবং নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে খেলেছেন।জাতীয় দলের হয়ে তিনি চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন।তন্মধ্যে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন এবং ১৯৯০ তে রানার্সআপ ।একই ম্যাচে ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলের কথা কারোই অজানা নয়।১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের ৫ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করা তাঁর অসাধারণ ওই গোলটি ‘গোল অফ দ্যা সেঞ্চুরি’নামে খ্যাত।

১০ বছর বয়সে এস্ত্রেয়ার হয়ে খেলার সময় এক স্কাউট তাকে খুজে বের করেন এবং ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স ক্লাবের যুবদলে যোগদান করেন।এ সময়ে ক্লাবটি টানা ১৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থেকে রেকর্ড করে।মারাডোনা ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ছিলেন এবং ১৬৭ খেলায় ১১৫টি গোল করেন।১৯৮১ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি আর্জেন্টিনার আরেক বিখ্যাত ক্লাব বোকা জুনিয়র্সে যোগ দেন এবং পরের মৌসুমে প্রথম বার লীগ চ্যাম্পিয়নশীপ খেতাব অর্জন করে।

১৯৮২ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন এবং প্রথম বিশ্বকাপটি ভাল যায়নি।দ্বিতীয় পর্বেই বাদ পড়ে যায় আর্জেন্টিনা।১৯৮২ ফিফা বিশ্বকাপের পরই রেকর্ড ৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বার্সেলোনায় যোগ দেন মারাডোনা।কিন্তু বার্সার হয়ে তাঁর ক্যারিয়ার সুখকর ছিল না।১৯৮৩ সালে বার্সার হয়ে কোপা দেল রে এবং স্প্যানিশ সুপার কাপই ছিল বার্সার হয়ে তাঁর অর্জন। বার্সার ক্লাব পরিচালকদের সাথে ঘনঘন বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে তাকে ক্লাব ছাড়তে হয়।

নাপোলিই ছিল ম্যারাডোনার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট।বার্সা ছেড়ে যোগ দেওয়ার পর এ ক্লাবটিকে তিনি বিশ্বদরবারে পরিচিত করে তোলেন।তিনি খুব দ্রুত ক্লাবের সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং সেই সময়টিই ছিল নাপোলির ইতিহাসের সফলতম যুগ। মারাদোনার অধীনে নাপোলি ১৯৮৬–৮৭ ও ১৯৮৯–৯০ মৌসুমে সিরি এ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে এবং ১৯৮৯–৮৮ ও ১৯৮৮–৮৯ মৌসুমে তারা রানার-আপ হয়। এছাড়া মারাডোনার সময়ে নাপোলি একবার কোপা ইতালিয়া জেতে (১৯৮৭) এবং একবার রানার-আপ (১৯৮৯) হয় এবং ১৯৯০ সালে ইতালীয় সুপার কাপ জিতে। ১৯৮৭–৮৮ মৌসুমের সিরি এ-তে মারাদোনা সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন।ফুটবল ইতিহাসে ম্যারাডোনাই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি ২ বার ট্রান্সফার ফির বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন।

sunnews_gettyimages-79648413jpg-js262177459

বল আর ব্যাক্তিগত সমস্যা কোনদিন তাঁর পিছু ছাড়েনি।কোকেন আসক্তি,অনুশীলনে অনুপস্থিত থাকার কারণে ক্লাবের পক্ষ থেকে তাকে ৭০০০০ ডলার জরিমানা করা হয়।নাপোলির জনগন তাকে এতই ভালবেসেছিল যে নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে এত অর্থ জোগাড় করে দেয়। ম্যারাডোনা নেপোলি ছাড়ার পর তাঁর প্রতি সন্মান রেখে ১০ নম্বর জার্সিটি ক্লাব স্মারক হিসাবে তুলে রাখে।

নিজের ফর্মের তুঙ্গে থাকা কালে সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় তারকাবিহীন আর্জেন্টিনা দলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছিলেন।১৯৯০ ছিল তাঁর তৃতীয় বিশ্বকাপ।ইঞ্জুরি সংক্রান্ত জর্জরিত মানাডোনা ১৯৮৬ নৈপুন্য দেখাতে পারেন নি।তবুও আর্জেন্টিনা ফাইনালে পৌঁছায় এবং প্রতিপক্ষ পশ্চিম জার্মানী বিতর্কিত পেনাল্টি থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়।

১৯৯৪ সাল মারাডোনার শেষ বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্টে মাত্র ২টা ম্যাচ খেলতে পেরেছিলেন।ড্রাগ টেস্টে এফিড্রিন ডোপিং-এর কারণে তাকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করা হয়। নিজের আত্মজীবনীতে মারাদোনা ঐ টেস্ট সম্পর্কে বলেন যে তার ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক তাকে এনার্জি ড্রিংক রিপ ফুয়েল দেওয়ার কারণে তিনি ড্রাগ টেস্টে ধরা পড়েছেন। তার দাবি ছিল, পানীয়টির যুক্তরাষ্ট্রীয় সংস্করণ আর্জেন্টিনীয় সংস্করণের মত নয়, যার মধ্যে ঐ রাসায়নিক দ্রব্যটি ছিল এবং তার প্রশিক্ষক অনিচ্ছাকৃতভাবে তা ব্যবহার করে। ফিফা তাকে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করে এবং আর্জেন্টিনাও দ্বিতীয় পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। মারাডোনা আলাদাভাবে এও দাবী করেন যে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহনের পূর্বে ওজন কমানোর জন্য ঐ রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারে ফিফার সাথে তার একটি চুক্তি হয়েছিল।১৯৯৪ বিশ্বকাপের পর মারাডোনার ১৭ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটে।

তেক্সতিল মান্দিইউ ক্লাবের হয়ে ১৯৯৪ সালে মারাডোনা কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করেন।পরের বছর থেকে রেসিং ক্লাবে যোগদান করেন কিন্তু কোণ ক্লাবেই তেমন উল্লেখযোগ্য সফলতা পাননি।২০০৮ সালে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব পান।ওইসময় বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ধুঁকতে থাকা আর্জেন্টিনাকে মূল পর্বে নিয়ে যান ডিয়েগো।২০১০ বিশ্বকাপ আসরে আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানীর কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়।

ভ্যানিজুয়েলার রাস্ট্রীয় অতিথি হিসেবে গিয়ে মারাডোনা ক্ষেদের সঙ্গে বলেছিলেন-“এখনকার প্রজন্ম ফুটবলের চাইতে অর্থটাকে বেশি ভালবাসে।গ্লামারের চড়া আলোয়  ঢাকা পরে যাচ্ছে ফুটবলের শিল্প।আমি যখন ফুটবল খেলেছি তখন ভালবেসে ফুটবলটাকে খেলেছি তাই আমি হাত দিয়ে গোল করতে পেরেছিলাম এবং সেটা রেফারির চোখে বৈধ ঘোষনা করা হয়েছিল।আমি ঐ গোলের ব্যাপারে তখন কিছু প্রকাশ করিনি কেননা আমি জানতাম আমি যেটা করেছি সেটা প্রবল দেশপ্রেম থেকে করেছিলাম।ওটা ছিল বৃটিশদের বিরুদ্ধে গোটা ফকল্যান্ড বাসির আন্দোলন”।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *