এমন সাফল্যের জোয়ারে আমাদের ফুটবলের লাভ? লিখেছেন, বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক দীপঙ্কর গুহ

171028181359-england-final-exlarge-169একটি টিকিটে দুটি ম্যাচ।প্রথম ম্যাচ বিকেল ৫ টায়।দ্বিতীয় ম্যাচ রাত ৮ টায়। প্রথম ম্যাচ নির্ধারিত সময়ে শেষ। পরের ম্যাচ শুরু হতে মাঝে ১ ঘণ্টার বিরতি।নবরুপে সেজে ওঠা বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন দর্শক ঠাসা।ঘোষণায় জানা গেল,৬৬হাজার ৭৮৪ জন দর্শক হাজির মাঠে।খেলাটা ফুটবল,চারটে দল লড়াই করল।ভারতীয় দল কিন্তু নেই চার দলে।অথচ কি অপরিসীম ধৈর্য-কলকাতার ফুটবল প্রেমীদের।সামান্যতম বিরক্তি নেই,হাতাশাও নেই।

আসলে নয়া সাজে সাধের ফুটবল স্টেডিয়াম যে বাংলা তো বটেই আজ দেশের গর্ব।যুবভারতীর এমন আলোকোজ্জ্বল চেহারা, সবুজ মখমলের মাঠ-বিশ্বের দরবারে ‘ঘুমন্ত দৈত্য’ ফুটবল দেশ-ভারতকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিল।শুধু অনুর্ধ-১৭ বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনালের জন্য নয়-গোটা টুর্নামেন্টকে যেভাবে রাজ্য সরকার সামলালো-তা হাততালি দিলে কম হবে।

নিন্দুকেরা বলতেই পারে,বিশ্ববাংলার ব্যানারে বিশ্বকাপ।মুখ্যমন্ত্রীর ছবি দিয়ে বিশ্বকাপের প্রচার-এ কেমন ধারা! আরে!! এসব তো নতুন নয়।টি টোয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতে ধোনির ভারতীয় দল মুম্বাইয়ে পা রেখেছিল।বোর্ড সভাপতি তখন শারদ পাওয়ার। সাংসদ, রাজনৈতিক স্টার।রাস্তার দু’পাশে,বাড়ির ছাদের মাথায়,সব হোডিংয়ে শারদ পাওয়ারের ছবি আর কাট-আউটে ঢাকা পড়েছিল ধোনিবাহিনীর আসল কারিগরদের ছবি।মনে হয়েছিল,মাঠে লড়াইটা জিতে কাপ নিয়ে ফিরছেন শারদ পাওয়ার।ওয়াংখেড় স্টেডিয়ামের মঞ্চে ধোনিদের জায়গা হয়েছিল পেছনের সারিতে।প্রথম সারিতে ছিলেন পাওয়ারের সঙ্গে রাজনীতি’র “পাওয়ার স্টাররা”।

সেখানে এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তো কিছুই করেননি।হোরডিং-ব্যানার-বাস ব্রান্ডিং-থিম সং,এসব যে কোন রাজনৈতিক দলের ‘ইমেজ’ বানানোর সহজ রাস্তা।‘আচ্ছে দিন আনেওয়ালা’ শ্লোগানের কুশীলবরা তো ‘দিনকালের’ প্রকৃত খোঁজই নেন না।‘স্বচ্চভারত’ অভিযানকে এ বাংলা ‘অন্য নামে’ নয়া বাংলা তো বানিয়েছে।বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে যাওয়া এবং নিয়ন্ত্রন করা প্রায় ১লাখ মানুষ, তাদের ব্যবহৃত যানবাহন কিন্তু বিরক্তিকর অবস্থায় কাউকে ফেলেনি।কলকাতার শরীরে সামান্য কালি লাগেনি।অবশ্যই এটা প্রশাসনিক সাফল্য।অবশ্যই মুখ্যমন্ত্রীর সাফল্য।অবশ্যই তার নির্দেশে চলা সকলের সাফল্য।

মাঠের ভেতর দর্শকাসনে চোখ মেলে দেখলেই মনে হয়েছে-যুবভারতীতে ‘ক্রিকেট’ হচ্ছে নাকি!প্রতি সারি সিটের মাঝে কোন না কোনও সুবেসিনি নারীর মুখ।রাতের খেলা।রাতের কলকাতা।তাও ইডেনের মতো শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে নয়-শহরের শেষ প্রান্তে, যুবভারতীতে।রাত দশটায় শেষ হওয়া ফুটবলপ্রেমীরা নারী-পুরুষে মিলেমিশে বাতানুকুল পর্যাপ্ত বাসে ছড়িয়ে যাচ্ছেন শহরের বিভিন্ন প্রান্তে।ষ্টেশনে,বিশেষ ট্রেনে চেপে ফিরে গেছেন শহরতলীর কিংবা জেলায় জেলায় নিজের বাসায়।

অর্থাৎ-সম্ভব।সব সম্ভব।আমরা চাইলে সব সম্ভব।কলকাতা থুড়ি,বাংলার প্রিয় দল ব্রাজিল ফাইনালে উঠতে পারেনি।তো,কি হোল?তৃতীয়-চতুর্থ স্থানের লড়াইয়ে হলুদ-নীল দল তো ফাইনালের দিনও খেলতে নামছে।ব্রা-আ-জি-ল,সেই সুর।সেই তরঙ্গ।যুবভারতী সন্ধায় দেখল ব্রাজিলের জয়।প্রাপ্তি ভাণ্ডারে তৃপ্তির প্রসাদ।যুবভারতীর আধা ঢাকা স্টেডিয়ামের মাথায় বসে থাকা আলোর রোশনাইয়ের সামনে তখন কয়েক লাখের ‘রাত পোকার’ ভীড়।আমাদের ‘শ্যামা পোকা’।

61304731

কিন্তু ফাইনালের আগে একটি ঘণ্টায় যে ফিফার নিয়ম মেনে স্রেফ পপকর্ণ-প্যাক করা পাপড়ি চাট, পোলাও-এর ভুঁড়ি ভোজ।বিনোদনের পসরা সাজিয়ে বসার উপায় নেই।সবুজ মখমলের পরিচর্চা চলছে।

ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে আটের দিকে চলেছে।লাল-হলুদের স্পেন আর সাদা-আকাশীতে ইংল্যান্ডের ফুটবলাররা দু’প্রান্তে গা-গরমে ব্যস্ত।ফিফা কর্তাদের কড়া নজরদারিতে শুরু হল ফাইনাল লাইন আপ।অনুর্ধ-১৭ বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনাল শুরুর বাঁশিতে রেফারি ফুঁ দেওয়ার আগে-এ কি দৃশ্য!

প্রায় সাড়ে ৬৬ হাজার মানুষের হাতে ধরা জোনাকি!স্টেডিয়ামে সকলে মোবাইল ফোনের আলো জ্বেলে দুলিয়ে চলেছে।সে কি মনোরম দৃশ্য!আবেগে দুলছে যেন স্টেডিয়াম।মাঠের মাঝে থাকা ফুটবলার, সাপোর্ট স্টাফ,ফিফা কর্তারা,বিদেশী নানা মানুষজন হতবাক-বিস্ময়ে বিভোর।‘এ আমার বাংলা’।‘এই আমার তিলোত্তমা কলকাতা’।‘সেই অতিথি দেব ভবঃ’-ভাবনা।বাহ- এ কি দেখলাম!মন-প্রান জুড়ায়ে যায়…।

নব্বই মিনিটের লড়াই এক লহমায় শেষ হয়ে গেল।ইংল্যান্ড এক অবিশ্বাস্য ফুটবল উপহার দিল।বিশ্বকাপ ফাইনাল বলে কথা,দু’গোলে পিছিয়ে পড়ল এক দল।ইংল্যান্ড।কিন্তু ৭,৯,৪,১৪- এ নম্বরগুলো নিজেদের জাত চেনাতে ব্যস্ত।‘৭’ নম্বরের ‘বাঁ পায়ের যাদু’-মেসি’র ম্যাজিক দেখাতে লাগল।‘৯’ নম্বরের ফ্রি-কিক,ফাইনাল পাশ-‘বেন্ট লাইক বেকহ্যাম’কে মনে পড়ালো।০-২ থেকে ১-২ নিয়ে বিরতিতে ফেরা ইংল্যান্ডকে অন্যরকম মনে হল ব্যবধান কমাতেই।পরের অর্ধে স্পেনের ফুটবলকে যেন পিষে ফেলার ব্রত নিয়েছিল ইংল্যান্ড।স্প্যানিশ লিগের চেয়েও যে পেশাদার ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ-প্রমানের দায় যেন।

ভেঙে পড়ল স্পেনের যাবতীয় রক্ষণ দেওয়াল।২-২,৩-২,৪-২,৫-২!!ইংল্যান্ড এগিয়ে চলেছে, রোখাই দুষ্কর।ব্রিটিশদের দেখলে কিংবা নাম শুনলে গায়ে জ্বালা দেওয়া ভারিতীয় ফুটবলপ্রেমী থুড়ি কলকাতার ফুটবলপ্রেমী ততক্ষণে ‘সব খেলার সেরা খেলায়’ মজে বুঁদ।এভাবেও জেতা যায়!দু’গোলে বিশ্বকাপ ফাইনালে পিছিয়ে থেকে পাঁচ গোল দিয়ে বিশ্বসেরা হওয়া!

পাশে বসা ৬০’র কোঠায় বয়সী মানুষটি বলেই ফেললেনঃ‘ব্রিটিশরাই পারে।এ বাংলা দেখল।আমরা ওদের ভালগুলো নিতেই পারলাম না’।সত্যিই অনেকেই পারেনি।অনুর্ধ-২০ বিশ্বকাপ ফুটবল কয়েকমাস আগে দক্ষিণ কোরিয়ার মাটিতে জিতেছে ইংল্যান্ডই।সেদিন ফাইনাল দেখছিল ৩০ হাজার ৩৪৬ দর্শক।আর এশিয়ার অন্য প্রান্তের কলকাতায় ফাইনাল মাঠে থেকে দেখলেন সাড়ে ৬৬ হাজার!!

এরপর ‘বাঙালির ফুটবল’ নিয়ে আমরা মাতব।ইস্ট-মোহন কিংবা এ টি কে নিয়ে চায়ে’র টেবিলে গলা ফাটাবো।কিন্তু অনেকেই দেখলাম কি-ফাইনাল ম্যাচের আগে রেফারিরা কতক্ষণ ওয়ার্ম আপ করালেন?সময় অতিক্রান্ত-তবুও ইংল্যান্ডের( পিছিয়ে তখন সেই দল)ন্যায্য কর্নার না দিয়ে,বিরতির বাঁশি বাজালেন রেফারি।স্পেনের কোচকে লাল চোখও দেখালেন ম্যাচের কর্তৃত্ব নিজের দখলে রাখতে।ফুটবলারদের মধ্যে দু’বার হাতাহাতি সামলালেন,মাঝখানে থেকে।রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্ধ্যোপাধ্যায় ফিফার বিশ্বকাপ মঞ্চে বসে।পাশে ফেডারেশন সভাপতি প্রফুল প্যাটেল(ভিন্ন রাজনৈতিক দল)।অন্যপাশে কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী অলিম্পিক সোনা জয়ী প্রাক্তন ক্রীড়াবিদ রাজ্যবর্ধন রাঠর(বিজেপি’র নেতা)। বিশ্ববাংলার বিশ্বকাপ মঞ্চে রাজনীতির কতো রঙের মিলমিশ।সুনীল ছেত্রি জাতীয় দলের নেতা হয়ে বিশ্বকাপ বয়ে মাঠে এনেই আপ্লুত।

প্রায় ১৩৪ কোটি ভারতীয় এমন ফুটবল প্রেমে ভাসতে পারে-অথচ সাফল্যে ভাসতে পারে না?!!

দীপঙ্কর গুহ

দীপঙ্কর গুহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *