ত্রিপুরা, তবে কি বাম থেকে রামে উত্তরন?,দেবাশীষ পাইন

NBT-imageগেরুয়া জলস্রোতে ভেশে গেলো ত্রিপুরাতে ২৫ বছরের বাম সাম্রাজ্য। এবারের নির্বাচনী লড়াইটা সীমাবদ্ধ ছিল বাম ও বিজেপি’র মধ্যে। কেন বলছি, কারন বিজেপি একাই ৩৫টি আসন ও জোট  সঙ্গী আইপিএফটি ৮ টি আসন। মোট ৪৩টি আসন। বামেরা ৬০টি আসনে লড়ে ১৬টি আসন ধরে রাখতে পেরেছে কিন্তু বাকি বাম শরিক, কংগ্রেস,আইএনপিটি, তৃনমুল সহ সবদল সেফ্রন ঝড়ে কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

ফলাফলের ধরনটা অনেকটা পশ্চিমবঙ্গ ধাঁচের। ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনে  বাম কংগ্রেস জোটের সঙ্গে তৃনমুলের প্রাপ্ত ভোটের ফারাক মাত্র ৩৩ লাখের কিন্তু আসন সংখ্যার নিরিখে ফারাকটা অনেক।ত্রিপুরাতে এবারের নির্বাচনে বামেদের প্রাপ্ত ভোট ৯৯৯০৯৩ আর বিজেপির ৯৯২৫৭৫ ভোট।মাত্র ৬৫১৮ ভোটের ফারাক। শতাংশের হিসাবে সিপিএম ৪৪.৯% আর বিজেপ ৫০.৫%।ফারাক মাত্র ০.৩%।আবার জোটের নিরিখে প্রাপ্ত ভোট, বামফ্রন্ট পেয়েছে ১০ লক্ষ ৪২হাজার ৬১০টি ভোট আর বিজেপি ও আইপিএফটি জোট পেয়েছে ১১ লক্ষ ৭২হাজার ৬৯৬টি ভোট। ব্যবধান ১ লক্ষ ৩০হাজার ৮৬টি ভোট।  ফলাফলের দিকে তাকিয়ে  বিচার করলে এককথায় বলা যায় যে লড়াইটা সেয়ানে সেয়ানে হয়েছে।

এবার একটু দেখা যাক, নির্বাচনে বামেদের এমনধারা ফলাফলের সম্মুখীন হতে হল কেন? নির্বাচন আর  ক্ষমতায় বসা এই দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা অঙ্ক। এটাকে সিস্টেম বললে ঠিক বলা হবে। আর এই সিস্টেমের খেলায় বিজেপি বামেদের টেক্কা দিয়েছে।  বিজেপি ত্রিপুরার ৩০% আদিবাসী ভোটকে পুরোপুরি নিজেদের দিকে টানতে পেরেছে।বিজেপি জেতার জন্য সংখ্যালঘু ভোটকে নিজেদের পক্ষে এনে সকলকে অবাক করে দিয়েছে। আর কংগ্রেসর পুরো ভোট বিজেপির বাক্সে চলে গিয়েছে

সিস্টেম ছাড়াও আরও একটা বিষয় মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কোথাও কি  ত্রিপুরার মানুষের মনের ভিতর উগ্র হিন্দুত্ববাদ কাজ করতে শুরু করেছে? কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব ! ত্রিপুরা তো মুসলমান প্রধান রাজ্য নয়।তাহলে ধর্মের লড়াই ত্রিপুরায় কি করে সম্ভব। বরং বিজেপির জয়ের প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে পারে।এই প্রথমবার সীমান্ত রাজ্য ত্রিপুরায় কোনও উগ্র ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আরোহণ করল।অতএব, নির্বাচন উত্তর ত্রিপুরায় লেলিনের মূর্তি ভাঙা থেকে শুরু করে যে সন্ত্রাস আমরা প্রতিদিন দেখছি সেটা ২৫ বছরের লাল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিসন্ত্রাস।

এর পরেও কিছু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ৫ বছর আগেও যে বিজেপি দলটা ত্রিপুরায় কার্যত অস্তিত্বহীন ছিল তারা কি এমন করল যে এমন বিপুল ভোটে জয়ী হতে পারল।

প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া তো ছিলই তার সঙ্গে বিজেপির ‘চলো পাল্টাই’ স্লোগানটা ত্রিপুরার সাধারন মানুষ ব্যাপকভাবে গ্রহন করেছে। ত্রিপুরার সাধারন মানুষ ভালোবেসে বিজেপিকে দুহাত ভরে ভোট দিয়েছে এই ধারায় ভাবলে ভুল হবে বরং মানুষ ২৫ বছরের বাম শাসন পাল্টাতে চেয়েছে বলেই বিজেপিকে ভোট দিয়েছে।   

 বেকারত্ব এবারের নির্বাচনে বামেদের বিরুদ্ধে একটা বড় অস্ত্র হয়ে বিজেপির পক্ষে কাজ করেছে। শিক্ষিত তরুন প্রজন্মের ভোট এবার বিজেপির পক্ষে গিয়েছে। প্রায় পাঁচ লক্ষ শিক্ষিত বেকার সমস্যার বিষয়টা বিজেপি নেতারা নির্বাচনী প্রচারে এসে ভাল করে উসকে  দিয়েছিল যা বিজেপির পক্ষে  একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ত্রিপুরায় এক- তৃতীয়াংশ আদিবাসী আসন এতদিন বামেদের বড় জনভিত্তি ছিল। সেখানেই বিজেপি এবার থাবা বসিয়ে বামেদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। বিজেপি জোটসঙ্গী আইপিটিএফ নয়টি আসনে লড়ে আটটি আসনে জয়লাভ করেছে। পৃথক তিপ্রাল্যান্ডের দাবীকে সামনে রেখে আইপিটিএফ জোট করেছে বিজেপির সঙ্গে যা কোনদিনও সফল চেহারা পাবে না। এমন জোট  বিজেপি দার্জিলিঙে করেছিল গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সঙ্গে। ফলাফল চোখের সামনে আছে। এবং এই ইস্যুতেই যে ভবিষ্যতে সংঘাত বাঁধবে সেটা নিশ্চিত।

২০১৬সাল থেকে বিজেপি ত্রিপুরাতে  নিজেদের সংগঠন বৃদ্ধির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এবং এই কাজে তৃনমুলস্তরে সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি হয় আরএসএস। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের তাবড় নেতারা ত্রিপুরায় ঘাঁটি গেঁড়ে থাকতে শুরু করে দেয়। একটা সময়ে বামপন্থীরা যেভাবে বুথস্তরে মাটি কামড়ে পড়ে থেকে ভোট করাত, এবার বিজেপি সেটাই করেছে।নির্বাচনের অনেক আগে থেকে ভোটার লিস্ট ধরে বুথভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছিল। ২৫ বছর শাসনের পর বাম সংগঠনে যে ঘুণ ধরেছে তা অনেক আগেই বিজেপি আন্দাজ করে নিয়েছিল। ২০১৪ সালের পর থেকে বিজেপির উত্তরপূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির নজর ছিল। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা। ত্রিপুরায় নির্বাচনী ফলাফল ভাল হলে তার প্রভাব যে বাংলায় পড়বে এবং মমতাকে চাপে থাকতে বাধ্য হবে তা বিজেপি ভালকরেই জানে।

দীর্ঘদিন কংগ্রেস ত্রিপুরাতে প্রধান বিরোধী শক্তির ভুমিকা পালন করে আসছিল। কিছুদিন আগে কংগ্রেসের একঝাঁক বিধায়ক ও বিশাল সংখ্যক কংগ্রেস কর্মী কংগ্রেস ছেড়ে তৃনমূলে যোগদান করে। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস সিপিএম বিধানসভায় জোটসঙ্গী হয়ে নির্বাচন লড়ার সময় এই বিধায়করা প্রতিবাদে মুখর হয়। এদের বক্তব্য ছিল এই জোটের কুফল ত্রিপুরায় বিরোধী রাজনিতিতে প্রভাব ফেলবে।কারন ত্রিপুরায় বামেরাই কংগ্রেসের প্রধান প্রতিপক্ষ। এটাকেই মুল কারন করে তারা দলত্যাগ করে। এই দলত্যাগের মুল কারিগর ছিল মুকুল রায়। মমতার যখন যেমন তখন তেমন রাজনিতি এবং মুকুলের সঙ্গে মমতার সংঘাত এই বিধায়কদের বিজেপির দিকে ঠেলে দেয়। এখানেও মুকুলের ভুমিকা আছে। নিজে বিজেপি যোগদানের আগে এদের পাঠিয়ে দেয়। এই কংগ্রেস ত্যাগী বিধায়কদের দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিজ আসন এবং সংলগ্ন এলাকাগুলিতে সংগঠন মজবুত ছিল। বিজেপিতে যোগদানের পর ছবিটা সম্পূর্ণ বদলে জায়। এই সংগঠনটা পুরোপুরি বিজেপির দিকে চলে আসে। বিজেপি সেটার লাভ উঠিয়েছে।

এবং, সর্বোপরি মানিক সরকারের ইমেজ। যতই ভারতের সবচাইতে গরিব মুখ্যমন্ত্রী বলে প্রচার করা হোক না কেন রোজ ভ্যালির ১৭ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি মানিক সরকারের সাদা পাজামা পাঞ্জাবীতে কালির দাগ লাগিয়েছে। দুর্নীতির উত্তাপ বামেরা টের পাচ্ছে।

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *