দুষমনি, হ্যাংলামি আর নিজেকে বাঁচাও নীতি :- (দেবাশিষ পাইন)

poster“আসুন আমরা সকলে মিলে আমাদের সাধের বাংলাটাকে যুগ যুগ ধরে চলা অপশাসনের হাত থেকে বাঁচাই। বদলাই….”। তখনও মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী হন নি। এই সব কথা গুলো নির্বাচনের আগের ৬৪ পাতার ইস্তাহারে বলা ছিল। আপনাদের কি একেবারেই মনে পড়ছে না? স্মৃতি কি প্রতারণা করছে(কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর নামে কিন্তু কিছু বলছি না)?ইস্তাহারে বলা ছিল বামফ্রন্টের স্বৈরাচারী দুঃশাসনে সমস্ত মানুষ অতিষ্ঠ। অন্ধকারে ডুবে গেছে ছাত্র ও যুব সমাজের ভবিষ্যৎ(পলাশীর প্রান্তরে ডুবেছিল আর এবার বিলাসীতার মন্তরে ডুবছে।চারদিকে মোচ্ছব,উৎসব দেখে উনবিংশ শতকের বাবু সংস্কৃতির কথা মনে পড়ে)। আর্থিক,সামাজিক, রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক সব দিক থেকে এই সরকার দিকভ্রান্ত। বাংলা আজ অন্ধকারে নিমজ্জিত।

আজকের বাংলা খুন,ধর্ষণ,ডাকাতি,রাহাজানি সন্ত্রাসে দেশের প্রথম স্থানে। বাবা জানে না মেয়ে সন্ধায় বাড়ি ফিরবে কিনা। ঋণের দায়ে দীর্ণ বাম সরকার। মিথ্যা শিল্প ও কৃষি উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে। সব ভাঁওতা।’সেদিনের বাংলায় চেয়েছিলাম শিক্ষা,স্বাস্থ্য,পরিসেবা,শিল্পের বুলি’।এখন পেয়েছি মাফিয়া,বন্দুক,সিন্ডিকেট আর গুলি।
দিদি ও মোদী দুজনেই স্বপ্নের সওদাগর। আমরা নলেজ মিশন গঠন করব, বাংলার মেধাকে বাংলা গড়ার কাজে ব্যবহার করব। রাজ্যেই হবে বিশ্ব মানের শিক্ষা ও গবেষণাগার এবং তার প্রয়োগের ব্যবস্থা। বাংগালি ঘরমুখী হবে, ড্রেন হওয়া ব্রেনের সদব্যবহার হবে, শিকড়ের টানেই। পুলিশ প্রশাসন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও ভয়হীন হবে। সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি।যদিও সামান্য টুইস্ট ছিল ইস্তাহারে এই বলে, ঘুরে দাঁড়ানো কাজটা সহজ না,যথেষ্টকঠিন কিন্তু আমরা মোকাবিলা করব।আক্ষরিক অর্থে “মোক্ষ”কতদুর হল বোঝা গেলনা,তবে “বিলা”যে পুরোপুরি হয়েছে,সেটায় আর সন্দেহর অবকাশ নেই।

সেদিনের এই কথাগুলি আজ ভাবলে ছলনা ছাড়া অন্য কিছু ভাবার অবকাশ দেয় না।কিন্তু  ওই মুহূর্তে বাম শাসনে বীতশ্রদ্ধ মানুষের কাছে মমতা ছাড়া বিশ্বাসযোগ্য মুখ ছিল না। আজ বুঝতে পারা যায়… মিথ্যা কথন ও ছলনায় মোদী মমতার জুড়ি মেলা ভার।

বাংলায় একটা ধারা আছে। সাধারণত ঘন ঘন সরকার বদলানোর রেওয়াজ নেই।ধারা আছে,ধারা “পাত”নেই। নতুন সরকারকে সময় দেওয়া হয়, ত্রুটি বিচ্যুতি নিয়ে বিরোধীরা সমালোচনা করলেও সাধারন মানুষেই বলে… আরে সময় দাও না, সবে তো এলো। সময় দিলে মমতা কাজ করবে এমন সুবিধাজনক অবস্থান এই সরকারের ছিল। বামের এটা বুঝে টুকটাক প্রতিবাদ ছাড়া কোমর সোজা করে দাঁড়াবার পথ পাচ্ছিলনা। আজ বিরোধীরা যাই বলুক, মমতা একেবারেই কাজ করেনি এটা বলা ঠিক হবে না। শুরুটা সত্যি ভালো ছিল… ক্ষমতায় আসার পর বদলার রাজনীতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলেন। এটা মানুষের সাধুবাদ পেয়েছে। পাহাড়ে, জঙ্গলে শান্তি ফেরান। জল ধরো জল ভরো প্রকল্প কিছুটা হলেও খরা বন্যার কবল থেকে মুক্তি দিয়েছে। কন্যাশ্রী প্রকল্প যুগান্তকারী। কমিসনারেট নির্মাণ, জেলায় প্রশাসনিক সচিবালয় নির্মাণ।নতুন মিউনিসিপ্যালিটির মাধ্যমে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ। দুটাকা কেজি দরে চাল। (যদিও ১০০ দিনের কাজে ডাহা ফেল) এ নিয়ে সাফল্যের প্রচার পুরো মিথ্যে।দশচক্রে ভগবান ভূত।

এতো কিছু করা সত্তেও মাত্র পাঁচ বছরের শেষে এসে সরকারের এই হাল হল কেন? ভরা চৈত্র সেলের(সেলেব ও বলা যায়) বাজারে মুখ্যমন্ত্রীর কপালে ভাঁজ কেন? সবটাই কি সিপিএম,বিজেপি, কংগ্রেস এদের চক্রান্ত? খুব ভালো করে বিচার করা গেলে কারনটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। দিদির সহ্য ক্ষমতা নিতান্তই শূন্য। ভাষণে জ্ঞান বিতরন করেন কিন্তু জীবন কর্মে প্রতিফলন বিহীন… “যে সয় সেই রয়”। আত্মপ্রচার ছাড়া আর কিছুই বোঝেন বা বুঝতে চান না।সব অর্ধেক অর্ধেক কাজ আর নিজের ঢাক নিজেই পেটানো। ৯০ শতাংশ কাজ হয়ে গেছে।কিন্তু দিদির ভাই এরা যে “সৎ”অংশে ফেল!সেদিকটা কি একবার ভুলেউ কেউ মনে করিয়ে দিচ্ছে না!

সব কিছু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে একদল ফেরেব্বাজের পাল্লায় পড়লেন। কিছু বাতিল আমলা, বাতিল পুলিশ কর্তা, কিছু তৃতীয় শ্রেণীর অভিনেতা অভিনেত্রী, কিছু ডেত এক্সপায়ার করে যাওয়া লেখক, কবি যারা আগের সরকারের বাতিলের খাতায় ছিল এরাই মুখ্যমন্ত্রীর বলয়ের কেন্দ্রবিন্দু হোল।কোনো এক কালের প্রতিবাদী কণ্ঠে শোনা “হ্যাঁ হ্যাঁ বলা সঙ”। এনাদের তুষ্ট করতেই সাধারণ মানুষের টাকায় মেলা,জলসা আরও কত কি। সবই জনগন দেখছে। শুধু মুখ্যমন্ত্রীর দল থাকবে আর কোনও দল বাংলায় থাকা চলবে না। দল ভাঙানোর খেলার নয়া আমদানি করলেন যা আদপেই এই রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছিল না। বিগত পাঁচ বছর ধরে রাজ্য জুড়ে বয়ে চলেছে হ্যাংলামির স্রোত।এরাই তৃনমূল দলে বপন করেছিল চিট ফান্ড এর বীজ। মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে এদেরকেই ঘোরা ফেরা করতে দেখা যেত। দুর্দিনের নেতারা আজ সব বাতিলের খাতায়।

আমাদের দিদিট ভাইয়দের ধারনা তিনি অগ্নিকন্যা। তাই ওনার আগুন নিয়ে খেলতে বাধা নেই। তাই আগুন নিয়ে খেলছেন। রাজ্যে মোট মতদাতাদের এক তৃতীয়াংশ সংখ্যালঘু, এবং সংখ্যালঘু মানেই মুসলিম এটা উনি মনে করেন, আরও অন্য সংখ্যালঘুরাও ওই এক তৃতীয়াংশের মধ্যে আছে এটা মানতেই চান না।তাই চোখ কান বুজে মুসলিম তোষণ। তোষণ করে কি উন্নতি হয়েছে মুসলিম সমাজের সেকথা ওরাই বলবে ভোটের বাক্সে। কিন্তু এই আচরণের ফলে বাঙালি সমাজে স্পষ্ট বিভাজনের প্রতিফলনও পড়তে পারে ভোটের বাক্সে।বিভাজনের চোরা পথে ঢুকে পড়ছে আরএসএস,ভিএইচপি,এবিভিপি ও বিজেপি।আগামি ভোটে অঘটন ঘটলে তার দায় নিতে হবে একমাত্র মমতা দেবীকেই।

বাঙালি একসময় ভাবতে শুরু করেছিল মমতাই হতে পারে পূর্ব ভারতের একমাত্র নেত্রী। সে সম্ভাবনা যথেষ্ট ছিল কিন্তু হেলায় হারালেন। এখন পরিস্থিতি এমন যে মোদীর ছবি,সিবিআই  আর বিজেপির নাম শুনলে আত্মা রাম খাঁচা ছাড়া হওয়ার যোগার।তিনি কাউকেই বিশ্বাস করতে পাড়ছেন না।সকলেই বিরোধী। একা সিপিএম,বিজেপি বা কংগ্রেস বিরোধী এমনটা নয়,বাম, ডান, হিন্দু, মুসলিম, মাতুয়া, আদিবাসী, পাহাড় কাউকেই চোখ বুজে ভরসা করতে পাড়ছেন না। এই পরিস্থিতির জন্য উনি কাউকেই দায়ী করতে পারবেন না।কারন যা করেছেন সব নিজেই করেছেন… জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ সব। আমি আমি আমি… অন্যে দায় ভার নেবে কেন।সবই মমতা ব্যানার্জির অনুপ্রেরণায়… রাস্তার বাতি স্তম্ভ থেকে পেচ্ছাপখানা।তুমি পৌর প্রতিনিধি,বিধায়ক,সাংসদ,প্রধান,জেলা পরিষদ, তাতে কি হয়েছে…! তোমার খাতের টাকায় উন্নয়ন,তাতে কি হয়েছে! সব ক্রেডিট আমার।আমার প্রতীক,আমার দল, আমার ছবি তোমায় বানিয়েছে। তুমি জয়ী ওটাই তোমার পাওনা। এই ফ্যাসিবাদী মনোভাব নিয়ে বেশী দূর চলা যায় না।এতো দিন সকলে মুখবুজে সহ্য করেছে নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে দলের ভেতরের পচা গলা গন্ধ বেরোচ্ছে।

২০১৪ নারদ নিউজের স্ট্রিং অপারেশন ২০১৬ তে এসে প্রকাশ করল,কেন? দলের ভেতরের কেউ সময়ের অপেক্ষায় ছিল কি?প্রকাশ্যে দলের সিনিয়র নেতাদের অপমান কখনও অপসারণ করেছ সেই বদলা কেউ নিতেই পারে।একদা বামেদের যম সবাইকে শত্রু  বানিয়েছেন,রাজভবন থেকে রাইটার্স, নির্বাচন কমিশন থেকে মানবাধিকার কমিশন এমন কি গণতন্ত্রের তিন স্তম্ভের এক স্তম্ভ আদালতকেও অবমাননা করতে ছাড়েন নি। আজ দিদিমণি একা, ঘরে বাইরে শত্রু পরিবৃত হয়ে বসে আছেন।

অনেকে হয়ত ভাবতে পারেন ফেলে আসা ৩৪ এর সঙ্গে চলতি পাঁচ বছরের তুলনা করছি। এটা কি ঠিক হচ্ছে?কিন্তু চলতি পাঁচ যদি ৩৪ এর সমতুল্য হয়? কি করনীয়?

যারা ভোট দেবেন… জাগ্রত জনতারাই বিবেচনা করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *