“বিষয় কাটমানি”– অনুপম ঘোষ

freepressjournal_2019-07_c73ad296-abdb-4a92-bc8b-ab2280d6e3b2_Rupeeরাজ্য রাজনীতিতে বিগত কয়েকদিন যাবৎ এই একটি শব্দ নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।কাটমানি কে খেলো,কেন খেলো,কারা ফেরত দেবে,যে ফেরত দিতে বললো সে কত মহান তা প্রমান করার একটা মরিয়া চেষ্টা ইত্যাদি অনেকরকম কথাবার্তাই চারিদিকে হচ্ছে।বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ায় এই নিয়ে রোজ খবর হচ্ছে ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াও এই নিয়ে বিভিন্ন শো করছে।

গত কয়েকবছরের তৃনমূলের শাসনকালে বহু বিতর্ক সামনে এসেছে। একটা শেষ হতে না হতেই আরেকটা চলে এসেছে।এরই মধ্যে একটা এই “কাটমানি”।আমাদের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর একটা গুন হলো,তিনি বিরোধীদের খাদ্যের (ইস্যু) কোনদিন অভাব হতে দেননি।একটার পর একটা অবিরত দিয়ে গেছেন।সব বলতে গেলে এই লেখা শেষ করা কঠিন।তাই শুধুমাত্র আজকের বিষয়টা নিয়েই আলোচনা করা শ্রেয়।

এখন দেখতে হবে হঠাৎ করে এই বিষয়টা নিয়ে সবাই কেন মেতে উঠল। কারন এই বিষয়টার উত্থাপক স্বয়ং আমাদের রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী। বিগত কয়েকদিনে, বিশেষ করে গত লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের পরেই, মাননীয়ার একটা প্রবনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগে যেমন একটা ” ডোন্ট কেয়ার” মার্কা ভাব ছিল,সেটা সামান্য হলেও কমেছে। তিনি তাঁর চিরশত্রু সিপিএমকে আহ্বান করছেন বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাশে থাকার জন্য।সিপিএম নেতাদের সাথে মিটিং করছেন। তাঁদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া মেনে নিচ্ছেন। সিপিএম এখন তাঁর কাছে আর শত্রু নয়।

যে বাংলার কংগ্রেস দলকে ক্রমাগত ভেঙ্গে তাঁর উত্থান, ঠেলায় পড়ে সেই দলের সাহায্যও তিনি চাইছেন। পারত পক্ষে বিধানসভায় যাদের নাম কখনো মুখে আনতেন না,সেই আব্দুল মান্নান ও সুজন বাবুর নাম নিতে হচ্ছে। একেই বোধহয় বলে “ঠ্যালার নাম বাবাজী”। বিজেপির গুঁতোয় এখন অনেক কিছুই করতে হচ্ছে ওঁনাকে। তা সেই ১৮-র গুঁতোরই ফলাফল হলো গিয়ে আজকের এই “কাটমানি” বিতর্ক। অনেকে ভাবছে ক্ষমতায় বসার ৮ বছর পর হঠাৎ মাননীয়ার বিবেক জাগ্রত হয়েছে। তা কিন্তু একদমই নয়। যারা ভাবছেন তারা ভুল ভাবছেন।আসলে পুরোটাই নাটক। ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে,বাংলার মানুষের প্রবল প্রত্যাশা মাথায় করে নিয়ে মাননীয়া এই রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় আসীন হন। মানুষ সে সময় ভেবেছিল, এবার পশ্চিমবঙ্গে একটা সদর্থক পরিবর্তন ঘটলো। রাজ্যের আমূল পরিবর্তন এবার হবে।কিন্তু সাধারণ মানুষ কি দেখলো?? এতো চোর তাড়িয়ে ডাকাত এনেছে তাঁরা। বাংলায় তোলাবাজী বা কাটমানি নেওয়াটা প্রথম দিন থেকেই তৃনমুল শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। পাড়ায় পাড়ায় তৃনমূলের বড়-মেজ-ছোট নেতাদের দাপাদাপি, তোলাবাজী প্রথম দিন থেকেই লাগামহীন।

ফুটপাতে হকার বসিয়ে তাঁদের থেকে হপ্তা তোলা,রিক্সা-অটো-টোটো স্ট্যান্ডের লাইন বিক্রি করে লোক ঢুকিয়ে সেখান থেকে মোটা টাকা আদায়,এলাকায় সিন্ডিকেটের রমরমা ইত্যাদি কর্মকাণ্ড প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়েছে।নিজের জমিতে বাড়ি বানাতে গেলে বিল্ডিং সামগ্রী সেই দাদাদের থেকেই নিতে হবে,তাও পরিমাপে কম ও গুনমান খারাপ।আপনি নিতে বাধ্য।নাহলে একটা ইঁটও গাঁথতে পারবেন না।পরবর্তীতে এই ব্যবস্থাকে আরো মর্ডানাইজ করে “স্কোয়ার ফিট”-এ টাকা নেওয়ার প্রথা চালু হলো।এরপর তো রয়েছে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের উৎপাত।কিছু পুরসভায় নিয়ম ছিল,বাড়ি তৈরী শুরু হওয়া থেকে সিসি(সম্পূর্ণতার শংসাপত্র) পর্যন্ত তিনবার, ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের সই প্রয়োজন।প্রত্যেক সইতেই টাকা দিতে হবে।নাহলেই সমস্যা সৃষ্টি করবে সেই কাউন্সিলর। এছাড়াও ঠিকাদার বা প্রমোটারদের থেকে টাকা নেওয়া তো আছেই।
বিভিন্ন সরকারী অফিসে, তৃনমূলের নেতা-মন্ত্রী,এমনকি মুখ্যমন্ত্রীর পরিবারের কারো কারো নাম ভাঙ্গিয়ে টেন্ডার প্যাক্ট করানো,কাজ পাইয়ে দিয়ে,সেই কাজের পুরো রাশির একটা অংশ কাটমানি নেওয়া ইত্যাদী আরো বিভিন্ন ব্যবস্থার প্রচলন এই জামানাতেই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।

এতো গেলো শহরাঞ্চলের কথা।গ্রামেও একই অবস্থা। জেলা পরিষদ থেকে গ্রাম পঞ্চায়েত, পুরোটাই আকন্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা হোক বা প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা,সরকারী সব প্রকল্পের টাকার সিংহভাগ নেতারা নিজেদের পকেটস্থ করছে।বাড়ি বানান,শৌচালয় বানান, রাস্তা বানান,একশো দিনের কাজ করুন,পুকুর কাটুন,মাছ চাষ করুন,সব ক্ষেত্রেই তৃনমুল নেতাদের টাকা দিতেই হবে।সারা বাংলার পঞ্চায়েতগুলোয় ভোট না করতে দিয়ে দখল নেওয়া কেবলমাত্র তো তারই জন্য।পুরোটাই কাঁচা টাকার খেলা।এমনকি বিভিন্ন সরকারী দপ্তরে চাকরী দেওয়ার নাম করে লক্ষ লক্ষ টাকা তোলা হয়েছে।অথচ চাকরী হয়েছে তৃনমুল নেতার পরিবারের একাধিক সদস্যের।এসবই প্রমানিত।কোনো কাল্পনিকএছাড়াও আছে অবৈধ বালি খাদান-কয়লা খাদানের টাকা,গরু পাচারের মোটা টাকা ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং আপনি যদি মনে করেন এই পুরো টাকাটাই স্থানীয় নেতারা ভাগ-বাঁটোয়ারা করে খান,তাহলে আপনি ভুল ভাবছেন।এর একটা বড় অংশ, কয়েকটি স্তর হয়ে পৌঁছে যায় কালীঘাটের একটি বিশেষ বাড়িতে।এখন আবার শোনা যাচ্ছে উনি সবটাই সরাসরি করে নেওয়ার প্রথা চালু করেছেন।

যাই হোক,এই আমলে কাটমানি বা তোলাবাজী নিয়ে লিখতে বসলে লেখা শেষ করা মুশকিল।আজকে বাংলার এই বৃহৎ শিল্প নিয়ে খুব সামান্যই আলোকপাত করার চেষ্টা করলাম।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী কি হঠাৎ একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই কি জানতে পারলেন,যে তাঁর দলের নেতা-মন্ত্রীরা বেশীরভাগই কাটমানি নেওয়া বা তোলাবাজীতে যুক্ত?? তা তো নয়?? নাহলে সারদা হয়েছে,১ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকায় ছবি বিক্রি হয়েছে,নারদায় হাত পেতে তাঁর দলের নেতারা টাকা নিয়েছেন, সেটা সারা পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছে,কোটি কোটি টাকা খরচ করে দল চলছে,নির্বাচন লড়ছেন,হেলিকপ্টার চড়ছেন।সেই টাকাগুলো তাহলে আসছে কোথা থেকে??

নারদার ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় তিনি বললেন,যে নেতাদের টাকা নিতে দেখা গেছে, তিনি আগে জানলে তাঁদের টিকিট দিতেন না।ডাহা মিথ্যা। সেই নেতাদেরই আবার গত লোকসভা নির্বাচনে টিকিট দিয়েছেন।এই মিথ্যাচার কেন?? নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই খোঁজার চেষ্টা করেছি।আমার মনে হয়, ক্ষমতায় থাকবার জন্য উনি সবকিছুই করতে পারেন। যদি দু’কান কাটা হয়ে গ্রামের মাঝখান দিয়েও যেতে হয় তাও সই।

যদি একটু খেয়াল করে দেখি,ওঁনার এই সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেকেকেই উনি প্রয়োজন মতো ব্যবহার করেছেন,আবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ছুঁড়ে ফেলে দিতে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ করেননি। যদি আবার সেই ব্যক্তির জন্য মাননীয়ার স্বার্থ বাধাপ্রাপ্ত হয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই। ছত্রধর মাহাতো,কিষানজী,কুনাল ঘোষ,সুদীপ্ত সেন,গৌতম কুন্ডু প্রভৃতি অনেক নামই নেওয়া যায়। দুঃসময়ের সাথী পঙ্কজ ব্যানার্জীর সাথে উনি কি ব্যবহার করেছেন তা অনেকেই জানেন। এটা ওঁনার স্বভাবের মধ্যেই পরে। গত লোকসভা নির্বাচনে প্রায় ১২২টা বিধানসভা কেন্দ্রে পিছিয়ে পরে, এখন নিজের ইমেজ শুধরাতে ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে নেমেছেন। বিনিময়ে দলীয় সহকর্মীদের বলিদান দিচ্ছেন।”কাটমানি ফেরত দাও” – এই আওয়াজ তুলছেন।

ভাবছেন সাধারন মানুষ ভাববে যে,দিদি সৎ,কিন্তু তাঁর নিচে কাজ করা বাকীগুলোই যত নষ্টের মূলে।সবকটা চোর। দিদি একা হাতে আর কতদিক সামলাবে?? ব্যস্,যেই না আওয়াজ তোলা,সাথে সাথে কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ, চব্বিশ পরগনা থেকে পুরুলিয়া,সাধারন মানুষ তৃনমুল নেতাদের থেকে টাকা ফেরত চাওয়া শুরু করলো। চলছে উত্তম-মধ্যমও। অনেকে টাকা ফেরতও দিচ্ছে। দিদির গায়ে কিন্তু আঁচ লাগছে না। মার খাক না কর্মীগুলো। মাননীয়ার ইমেজ তো স্বচ্ছ হচ্ছে। অনেকে বলছে যে এটা প্রশান্ত কিশোরের তৈরী কৌশল। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত ধারনা,এটা মাননীয়ার নিজেরই বুদ্ধি। উনি এই খেলায় পুরোনো খেলোয়াড়। তবে এইবারের খেলাটা বোধহয় একটু কাঁচা খেলে ফেললেন। তিনি ভুলে যাচ্ছেন,নগরে আগুন লাগলে দেবালয়ও বাদ থাকে না। আর সেই দিনও বেশি দূরে নয়।হয়তো অচিরেই বাংলার মানুষ দেখবে,প্রতারিত- বঞ্চিত মানুষগুলো,কাটমানির টাকা ফেরত চাইতে, কালীঘাটের ব্যানার্জী পরিবারের সেই বাড়িগুলোর সামনে পৌঁছে যাচ্ছে। যে পরিবার ওই অঞ্চলের অধিকাংশ সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়ে,গরীব মানুষের কষ্টার্জিত টাকা মেরে, আজ প্রাসাদোপম বাড়ি হাঁকিয়ে,ব্যাপক সিকিউরিটি পরিবেষ্টিত হয়ে সেখানে বসবাস করছে। মনে হয় সেইদিন আর বেশী দূরে নেই।

৯৪৩২৯৬৫৪৬৪

৯৪৩২৯৬৫৪৬৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *