বাম + কংগ্রেস জোট ভাঙার কারণ অনুসন্ধানে- অনিন্দ্য রায়চৌধুরী

67992393২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস + বাম জোট করে বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। কংগ্রেস ৪৪টি আসনে জয়লাভ করে বিরোধী দলের স্বীকৃতি পায়। আব্দুল মান্নান বিরোধী দলনেতা হন কংগ্রেসের কিন্তু উত্তেজনা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ বামফ্রন্ট জোট থেকে সরে দাঁড়ায়। পরবর্তী সময়ে আবার জোট সম্ভাবনা প্রান পেতে শুরু করে যখন সীতারাম ইয়েচুরি সিপিআইএম দলে কেন্দ্রীয় সম্পাদক রুপে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে।

ফলে রাজ্য রাজনীতিতে প্রধান বিরোধী দলের সাথে জোট গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবে বিজেপি ও তৃনমূল বিরোধী নেতা থেকে শুরু করে জনসাধারণের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সঞ্চার ঘটে। কিন্তু প্রথমে জোট পরে আসন সমঝোতার মধ্যে কোনটা? পরে আসন সমঝোতাতেই সিলমোহর পড়ে। কংগ্রেসের অবস্থান নমনীয় থাকলেও  সিপিএম এর উত্তরোত্তর দাদাগিরির ফলে জোট জন্মের আগেই প্রক্রিয়া স্তিমিত হয়ে অবশেষে ভেস্তে যায়। এক্ষেত্রে নানারকম অনীহা প্রকাশ্যে আসতে থাকে। রাজ্য- কেন্দ্র থেকে শুরু করে জোট গঠনকারী কংগ্রেস সিপিএম নেতাদের মধ্যে।

গত লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস মালদা জেলার দুটি, জঙ্গিপুর ও বহরমপুর সহ মোট চারটি আসনে জয়লাভ করে। সিপিএম পায় রায়গঞ্জ এবং মুর্শিদাবাদ নিয়ে দুটি। শুরু থেকে বামফ্রন্ট বলতে লাগে, যে দল যে আসনে জয়লাভ করেছে সেই দলই সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় গত লোকসভায় খুব সামান্য ভাবে বামফ্রন্ট দুইটি আসন দখল করে। বর্তমানে কেন্দ্র দুটির বাস্তব চরিত্র লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে কংগ্রেসের পক্ষে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতে শুরু করেছে।

বাংলার জনপ্রিয় কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী তার নিজের জেলা মুর্শিদাবাদে আজও মিথ।অধীর বাবুর নামে একটা বিশেষ রসায়নের আবেগে সবসময় ভাসতে থাকে সমগ্র মুর্শিদাবাদ জেলা। প্রদেশ সভাপতি থাকাকালে সম্পূর্ণ সময় দিতে পারতেন না কিন্তু প্রয়োজনে অধীর বাবুকে পাওয়া যাইনি এমন অভিযোগ নিন্দুকেও করে না। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির আসন পরিবর্তন হলে আবার আবার কংগ্রেস মুর্শিদাবাদের প্রাণ পেতে শুরু করে। দলে দলে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও কর্মীরা অধীর বাবুর নেতৃত্বে কংগ্রেসে যোগদান করতে শুরু করে। ফলে দেখা যায় সমগ্র মুর্শিদাবাদ জেলা কংগ্রেস ময় হয়ে ওঠে।

মুর্শিদাবাদের হাওয়া ক্রমে মালদা, উত্তর দিনাজপুর কংগ্রেসের পালে প্রবাহিত হতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে লোকসভার ভোটের দামামা বেজে ওঠে। রায়গঞ্জ ও মুর্শিদাবাদ লোকসভা আসন দুটিতে কংগ্রেস যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও কংগ্রেস হাই কমান্ডের নির্দেশ মত রায়গঞ্জ মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্র দুটি ব্রামফ্রন্টকে ছেড়ে দেওয়া হয়। যদিও এই দুটি সিটে কংগ্রেসের জয় প্রায় অনিবার্য। উল্টোদিকে বামফ্রন্ট জঙ্গিপুর, বহরমপুর, মালদা উত্তর, মালদা দক্ষিণ প্রার্থী না দেওয়ার কথা ঘোষণা করে এবং এ পর্যায়ে সমস্যা মোটামুটি মিটে যায়। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় পরবর্তী সিট বন্টনকে কেন্দ্র করে।

বামফ্রন্ট + কংগ্রেসে তখন জোট নিয়ে আলোচনা চলছে তবুও কংগ্রেসকে কোন কিছু না জানিয়ে একতরফা ভাবে বামফ্রন্ট ২৫টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে দেয়। এর মধ্যে কয়েকটি এমনও আসন আছে যেখানে কংগ্রেসের জয় বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রায় নিশ্চিত, যেমন- বীরভূম, পুরুলিয়া, বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্র। এই সকল সম্ভাবনাময় আসনে বামফ্রন্ট নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করায় কংগ্রেস জোট গঠনের উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে। শুধু তাই নয় উত্তরবঙ্গে ৬টি আসনে বাম প্রার্থী ঘোষিত হয় ফলে উত্তরবঙ্গ কংগ্রেস শূন্য করে দেওয়ার অভিসন্ধি, কংগ্রেসের মধ্যে জোটপন্থীদের আহত করে।

বিষয় এখানেই থেমে নেই, আসন সমঝোতা নিয়ে যখন চর্চা চলছে তার মধ্যেই উঠে আসে আলিমুদ্দিন থেকে নানান ফরমান। যে আসনে বামফ্রন্ট প্রার্থী দেবে সেখানে কংগ্রেসের কোন দায় দায়িত্ব থাকবে না। কংগ্রেস এবং বাম যৌথভাবে নির্বাচনী ইস্তাহার, মিটিং,মিছিল ইত্যাদি করবে না। তাহলে যে সকল স্থানে যথেষ্ট কংগ্রেস কর্মী আছে তারা কি করবে? বসে যাবে? এই ধরনের হটকারি সিদ্ধান্ত কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। আরও আছে, কংগ্রেস তার আসনগুলিতে কাদের প্রার্থি করছে সেখানেও বামেরা তাদের মতামত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল।

একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলের পক্ষে এইরূপ শর্ত মানা সত্যিই অবান্তর এবং অপমানজনক। বাংলার কংগ্রেস নেতারা মিটিং করে এবং তারা জোট চায় না বলে কার্যত বেঁকে বসে। সব নেতারা তাদের বক্তব্য লিখিত আকারে দিল্লি পাঠায় এবং জাতীয় কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী জোট গঠন প্রক্রিয়া থেকে সরে আসেন। রায়গঞ্জ এবং মুর্শিদাবাদ আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষনা করে দেয় ফলে জোট প্রক্রিয়া ভেস্তে যায়।

বামফ্রন্টের এরূপ আচরণ সত্যিই হতাশাব্যঞ্জক। কারণ একাধিক শরিক দল নিয়ে গঠিত জোট কিভাবে হওয়া উচিত তারা অবশ্যই জানে। এখন জোট ভাঙার দায়টি কার্যত বামফ্রন্টের উপর গিয়ে পড়েছে। শেষমেষ বামফ্রন্ট দ্বিতীয় প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে তারা চারটি আসন কংগ্রেসের জন্য ছেড়ে রেখেছে। সৌজন্যমূলক আসন সমঝোতা।

কংগ্রেস ইতিমধ্যে ৩৬টি লোকসভার আসন ও ২টি বিধানসভার বাই ইলেকশনের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে দিয়েছে। প্রার্থীরাও জোরকদমে প্রচারের কাজে লেগে পড়েছে। বাকিটা ভোট পরবর্তী অধ্যায় ব্যক্ত করবে।

অনিন্দ্য রায় চৌধুরী

অনিন্দ্য রায় চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *