২রা ও ৩রা জুন ১৯৪৭ সাল, অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ধুলিস্যাত।

cab21-20381১৯৪৭ সালের ২রা ও ৩রা জুন।এই দুটি দিন অখণ্ড ভারতের ইতিহাসে বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিন।ভারত বিভাজনের করাল খাড়া নেমে এসেছিল এইদিনে।১৯৪৫ সাল নাগাদ ব্রিটিশ সরকার বুঝে গিয়েছিল যে এবার তাদের ভারত ছাড়তে হবে, তাই ব্রিটিশ সরকার পূর্ব পরিকল্পনা করে রেখেছিল যে ১৯৪৮ সালের ৩০সে জুনের মধ্যে ক্ষমতার হস্তান্তর করে দেবে।সেকারনে, ভারতের হাওয়া বুঝতে আগাম ক্যাবিনেট মিশনকে পাঠায় ব্রিটিশ সরকার।আপাতভাবে মিশনের উদ্দেশ্য স্বাধীনতার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে আসা বলে মনে হলেও আসল উদ্দেশ্য ছিল অন্য।কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ নেতাদের সঙ্গে স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনার আড়ালে নেতাদের নাড়ি টিপে দেখা।

ব্রিটিশ, খণ্ডিত ভারতের নীলনকশা অনেক আগেই করে রেখেছিল।ব্রিটিশ সরকার জানত খণ্ডিত ভারত হলেই ব্রিটিশের লাভ।কারন ব্রিটেন মনে করেছিল, যদি অখণ্ড ভারতবর্ষ স্বাধীনতা পায় তাহলে ভারতের উপর তাদের অর্থনৈতিক প্রভাব থাকবে না।খণ্ডিত ভারতবর্ষই ব্রিটেনের স্বার্থ রক্ষা করবে, এটাই ছিল তাদের ধারনা।

ক্যাবিনেট মিশন চলে যাওয়ার কয়েক মাস পরেই জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়।প্রথমে মুসলিম লীগ অন্তর্বর্তী সরকারে যোগ দেয়নি।অনেক টালবাহানার পর ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে মুসলিম লীগ অন্তর্বর্তী সরকারে যোগ দেয়।ততক্ষণে কলকাতা এবং নোয়াখালী সহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়।এই দাঙ্গার আবহে ১৯৪৭ সালের ২২শে মার্চ নতুন ভাইসরয় এবং গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতবর্ষে এসে পৌঁছান।এবং পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে থাকে।লর্ড মাউন্টব্যাটেন নতুন ভাইসরয় ও গভর্নর জেনারেল হওয়ার পর ইংরেজরা অন্য খেলা শুরু করে।

তখনকার ভারতীয় কংগ্রেস পার্টির প্রেসিডেন্ট মৌলানা আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়।বৈঠকে লর্ড মাউন্টব্যাটেন মৌলানা আজাদকে বলতেন, ব্রিটিশরা ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বদ্ধপরিকর।কিন্তু তার আগে ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা বন্ধ করতে হবে।মৌলানা আজাদ মাউন্টব্যাটেনকে জানিয়েছিলেন, কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যেকার মত-পার্থক্য আর আগের মতো নেই,অনেক কমে এসেছে।

বাংলা ও আসাম একসঙ্গে থাকবে কি থাকবে না এই নিয়ে কংগ্রেস ও লিগের মধ্যে পুনরায় মতভেদ শুরু হয়।কোনভাবেই যখন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাচ্ছিলো না তখন মৌলানা আজাদ তৃতীয় মধ্যস্থতাকারী হিসাবে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের নাম প্রস্তাব করে।জওহরলাল নেহেরু এবং সরদার প্যাটেল এই পরামর্শের ঘোর বিরোধিতা করে।এদিকে দাঙ্গা কলকাতা থেকে নোয়াখালী হয়ে বিহারেও ছড়িয়ে পড়ে।হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা,নেতাদের মধ্যে তীব্র মতোপার্থক্য ইত্যাদি কারনে প্রশাসনে থাকা ব্রিটিশরা গা ঢিলে দিতে শুরু করে দিয়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দায়িত্ব পেয়েছিলেন কংগ্রেস নেতা সর্দার প্যাটেল এবং অর্থ দপ্তরে মুসলিম লীগ নেতা লিয়াকত আলী খান।কিছুদিনের মধ্যেই কংগ্রেস নেতারা বুঝতে পারলেন, মুসলিম লীগকে অর্থ দপ্তর ছেড়ে দেওয়া মারাত্তক ভুল হয়েছে।কারণ লিয়াকত আলী খানের অনুমোদন ছাড়া সর্দার প্যাটেল একজন চাপরাশিকেও নিয়োগ করতে পারছিলেন না।প্যটেল বুঝতে পারছিলেন তিনি কি বিরাট ভুল করেছেন।কারন তার সুপারিশেই লিয়াকত খানকে অর্থ দফতর দেওয়া হয়েছিল।

এই পরিস্থিতির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন।পরিষদের সদস্যদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্যের সুযোগে তিনি ধীরে ধীরে পূর্ণ ক্ষমতা নিজের কাছে নিয়ে নেন।দুদলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতেন আর তাদের উস্কানি দিয়ে বলতেন, একমাত্র ভারত বিভক্ত হলে এর সমাধান হতে পারে। লর্ড মাউন্টব্যাটেন উভয়পক্ষকে তোল্লাই দিতেন।এবং এভাবেই কংগ্রেসের সিনিয়র নেতাদের মনে পাকিস্তান সৃষ্টির বীজ বপন করতেন।আর সর্দার প্যাটেল মাউন্টব্যাটেনের যুক্তিকে সবার আগে গ্রহণ করেছিলেন।যেন, দেশ বিভাজন অনিবার্য এটা ধরে নিয়ে আগে থেকেই মানসিকভাবে তৈরি ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার থেকে প্যাটেল মনে দৃঢ় ধারনা পুষে নিয়েছিলেন, মুসলিম লীগের সাথে একত্রে কাজ করা যাবে না।জনসমক্ষে প্যাটেল বলতেন, মুসলিম লীগের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি ভারতবর্ষ ভাগ করতেও রাজী আছেন।

সর্দার প্যাটেলকে কব্জা করার পর লর্ড মাউন্টব্যাটেন জওহরলাল নেহেরুকে তাঁবে আনার কাজে লেগে পড়েন।প্রথমে নেহেরু দেশ ভাগের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন কিন্তু লর্ড মাউন্টব্যাটেন ক্রমাগত নেহেরুকে ভারতভাগের পক্ষে মন বিষাক্ত করতে থাকে।এবং সফল হন।নেহেরুর রাজি হওয়ার পেছনে আরও একটা বড় প্রভাব কাজ করেছিল,অসম্ভব বুদ্ধিমতি ও আকর্ষণীয় লেডি মাউন্টব্যাটেন।লেডি তার স্বামীর চিন্তা-ভাবনাকে তার বুদ্ধি ও আকর্ষণীয় ক্ষমতা দিয়ে বিপক্ষে থাকা মানুষজনকে প্রভাবিত করে স্বামীর স্বপক্ষে আনতেন।

নেহেরুকে ভারত ভাগের পক্ষে আরেকজন প্রভাবিত করেছিল,কৃষ্ণ মেনন।মেনন লন্ডনে বসবাস করতেন।মাউন্টব্যাটেন বিঝেছিলেন মেননকে নেহেরুর পেছনে লাগিয়ে দিলে কাজ হবে।মেনন ছিল নেহেরুর পরম ভক্ত আর নেহেরুও কৃষ্ণ মেননকে খুবই পছন্দ করতেন।অন্তর্বর্তী সরকারে নেহেরুই কৃষ্ণ মেননকে লন্ডনের হাই কমিশনার নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন।ক্রমে দেশ ভাগের পক্ষে নেহেরু এবং প্যাটেল মোটামুটি একবিন্দুতে এসে পৌঁছে ছিলেন।

মৌলানা আজাদ, গান্ধীজী সহ আরও অনেক কংগ্রেস নেতারা মনে করতেন ভারত বিভাজন হলে শুধু হিন্দু-মুসলমানদের ক্ষতি হবে না, হবে সমগ্র ভারতের।এরা সকলেই প্যাটেল ও নেহেরুকে বোঝানোর আপ্রান চেষ্টা করেছিলেন।কিন্তু তাতে লাভ হয়নি।প্যাটেলের অনড় মনোভাব দেখে মৌলানা আজাদ দুঃখ করে বলেছিলেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারত ভাগ করার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন, কিন্তু এখন সরদার প্যাটেল সে পতাকা বহন করছেন।নেহেরু এবং প্যাটেলের অবস্থানের কারণে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাঁর পাকিস্তান সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়ে আরো জোরালো অবস্থান গ্রহন করেন।

কংগ্রেস দলে যারা দেশ বিভাজনের বিপক্ষে ছিল তাদের শেষ ভরসার স্থল ছিল মহাত্মা গান্ধী।তারা গান্ধীর কাছে দরবার করতে গেলে গান্ধী ক্ষেদের সঙ্গে তাদের বললেন,দেখে শুনে মনে হচ্ছে,সর্দার ও নেহেরু আত্নসমর্পন করেছে। কংগ্রেস যদি ভারত ভাগের প্রস্তাব মেনে নেয় তাহলে সেটা আমার মৃতদেহের উপর দিয়ে হতে হবে। আমি যতদিন জীবিত আছি ততদিন ভারতবর্ষ ভাগ মানব না।

কয়েকদিন পরে মহাত্মা গান্ধী লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সাথে দেখা করলেন। এরপর সর্দার প্যাটেল গান্ধীর সাথে দেখা করে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক করলেন। সে আলোচনার বিষয়বস্তু জানা যায়নি। কিন্তু এরপর যখন বাকি নেতারা গান্ধীর সাথে দেখা করলেন, তখন সকলে বিস্ময়ে হতবাক হলেন।কারন মহাত্মা গান্ধী তার আগের অবস্থান থেকে বদলে গেছেন। তিনি ভারত ভাগ সরাসরি সমর্থন করলেন না, আবার আগের মতো জোরালো বিরোধিতাও করলেন না।

গান্ধীজি মাউন্টব্যাটেনকে প্রস্তাব দিলেন জিন্নাহকে সরকার গঠন এবং তাঁর পছন্দমতো ব্যক্তিদের নিয়ে মন্ত্রীসভা গঠনের অধিকার দেওয়া হোক।মাউন্টব্যাটেন গান্ধীজীর প্রস্তাবে রাজীও হন।কিন্তু জওহরলাল ও প্যাটেল গান্ধীর প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন।তারা দুজনে গান্ধীকে তার প্রস্তাব প্রত্যাহারে বাধ্য করেন।তখন গান্ধী বলেন, ভারতবর্ষ বিভক্তি অনিবার্য।লর্ড মাউন্টব্যাটেন কংগ্রেসের বাকি নেতাদের  বলেছিলেন, গান্ধীর প্রস্তাব যদি কংগ্রেস মেনে নিতো তাহলে ভারত বিভাজন এড়ানো যেত।ভাবুন,একদিকে মাউন্টব্যাটেন দেশ বিভাগের জন্য যা যা করার দরকার তা সবটাই করছেন আর ভাবখানা এমন দেখাচ্ছেন যে আপনাদের জন্যই তো দেশ বিভাগ আটকানো গেলনা।এই হচ্ছে ব্রিটিশ নীতি, বিভাজন করো- রাজ করো।

এই পর্যন্ত ঘোঁট পাকিয়ে লর্ড মাউন্টব্যাটেন লন্ডন চলে যান ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে।আসলে ব্রিটিশ সরকার ভারত ভাগের নীলনকশা আগেই প্রস্তুত করে রেখেছিল।মাউন্টব্যাটেন কফিনে শেষ পেরেকটা মেরে লন্ডন গেল সবুজ ঝাণ্ডা দেখাতে।অল ক্লিয়ার।

১৯৪৭ সালের ৩০শে মে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতবর্ষে ফিরে আসেন। ২রা জুন তিনি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতাদের সাথে বৈঠক করেন। তার পরের দিন ৩রা জুন মাউন্টব্যাটেন ব্রিটিশ সরকারের পরিকল্পনা সম্বলিত শ্বেতপত্র’ প্রকাশ করেন। সেখানে ভারত ভাগের রূপরেখা তুলে ধরা হয়। ব্রিটিশ সরকারের এই ঘোষণার সাথে সাথে অখণ্ড ভারতবর্ষের স্বপ্ন ধুলিস্যাত হয়ে যায়।

 

সুত্রঃ ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ বই, লেখক মৌলানা আবূল কালাম আজাদ।
 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *