১৯১৪, ২৮সে জুলাই- ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধ’

প্রথম-বিশ্বযুদ্ধ-3আমরা জানি, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো স্থায়ী শত্র“ বা মিত্র নেই। আন্তর্জাতিক রাজনীতি’র মূলনীতিই হলো– ক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতা এবং ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার’! মানে, কোনো রাষ্ট্রই চায় না অন্য আরেকটি রাষ্ট্র এতটা শক্তিশালী হোক,যা আগামী দিনে সে দেশের জন্য হুমকির কারণ হবে।

গত উনিশ শতকের গুরুত্বপূর্ণ আটটি ঘটনার একটি হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। এ যুদ্ধ শুরু হওয়ার একটি দীর্ঘ প্রেক্ষাপট রয়েছে। উনবিংশ শতাব্দিতে ব্রিটেন, ফ্রান্স, হল্যান্ড, স্পেন ও পর্তুগাল তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি ও শিল্পের জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ করতে দক্ষিণ এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকাতে তাদের সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটায়। এই সময় ইউরোপে ব্যাপক শিল্পায়ন হয়। শিল্পায়নের ফলে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বিস্তার ঘটে।

সে সময় উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতির অংশ হিসেবে জার্মানি নৌ-শক্তি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়। এতে ব্রিটেন শঙ্কিত হয়ে পড়ে। এরফলে ব্রিটেন জার্মানির সাথে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিন্ন করে ফ্রান্সের সাথে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। ১৯০৭ সালে রাশিয়া-ফ্রান্স-ব্রিটেন মিলে ‘ট্রিপল আঁতাত’ গড়ে উঠে। এ জোটের বিপরীতে প্রিন্স বিসমার্কের নেতৃত্বে জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইতালি সাথে ত্রিশক্তির মৈত্রী গড়ে তোলে। এই ত্রিশক্তি ছিল ‘ট্রিপল আঁতাতে’র পাল্টা প্রতিক্রিয়া। এই দুই জোটের পরস্পর বিরোধী কর্মকাণ্ডই প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে।

১৯১৪ সালের ২৮ জুন বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো শহরে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্কডিউক ফ্রানৎস ফার্ডিনান্ড এক সার্বিয়ান আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের বিচারে অস্ট্রিয়া কিছু শর্ত বেঁধে দেয়। কিন্তু সার্বিয়া সব শর্ত মানতে অস্বীকার করলে ১৯১৪ সালে ২৮সে জুলাই অস্ট্রিয়া সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

এ সময় জার্মান সম্রাট উইলহেইম অস্ট্রিয়াকে সম্পূর্ণ সমর্থন দেয়। অস্ট্রিয়া সার্বিয়া আক্রমণের পরপরই জার্মানি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও বুলগেরিয়ার বিরুদ্ধে ফ্রান্স ও রাশিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

আগের একটি চুক্তি অনুযায়ী অটোমান সাম্রাজ্য জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে জার্মানি নিরপেক্ষ বেলজিয়াম আক্রমণ করলে পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঘোষণা করে। যুদ্ধ শুরু হয় পুরো ইউরোপ জুড়ে।চার বছর স্থায়ী ভয়ানক প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে প্রায় দেড় কোটি মানুষের প্রান যায়। দু কোটিরও অধিক মানুষ আহত হয়। এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষ খরছ হয় ১৮৬ বিলিয়ান মার্কিন ডলার আর পরোক্ষ খরছ হয় ১৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

যুদ্ধের পূর্বে জার্মানির ধারণা ছিল যে, সার্বিয়ার বিরুদ্ধে সহজেই জয়লাভ করা যাবে। তাই তারা অস্ট্রিয়াকে সার্বিয়ায় হামলা করার অনুমুতি দিয়ে দেয়, যা ছিল বিরাট ভুল। যুদ্ধের প্রথমদিকে রাশিয়া এবং ফ্রান্সকে ভালভাবেই মোকাবিলা করছিল জার্মানি। কিন্তু যুদ্ধে ব্রিটেনের যোগদান ছিল জার্মানির জন্য বিরাট হুমকি। অন্যদিকে ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বলশেভিক (কম্যুনিস্ট) বিপ্লব হয়।ফলে, রাশিয়া এ যুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। ইতিমধ্যেই তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে এবং শীতকালে রাশিয়ার অভ্যন্তরে আক্রমণ করে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয় জার্মান সেনাবাহিনী। এ সময় ফ্রান্স ও ব্রিটেনকে রসদ যোগান দেয়ার অভিযোগে জার্মান সাবমেরিন সাতটি মার্কিন জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয়। এরপর সম্মিলিত আক্রমণের ফলে জার্মানির পরাজয় নিশ্চিত হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ধারণা করা হয়েছিল যে, বিশ্ববাসীকে আর যুদ্ধের অভিশাপ বইতে হবে না। কিন্তু লীগ অব নেশনস এর দুর্বল ভুমিকা, ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানিকে কোনঠাসা করে ফেলা এবং জার্মানি ও ইতালিতে যথাক্রমে হিটলার ও মুসোলীনির নেতৃত্বে ফ্যাসিজমের উত্থান আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *