স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বীর যোদ্ধা ‘বাঘা যতীনে’র আজ জন্মদিন।

15190290967_eb395d826e_b

ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী নেতা যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ১৮৭৯ সালের ৭ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ার কয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাঘা যতীন নামেই বেশী পরিচিত। তিনি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর দলের প্রধান নেতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিখ্যাত জার্মান প্লট তারই মস্তিষ্কপ্রসুত। শৈশব থেকেই শারীরিক শক্তির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। ছুরি দিয়ে বাঘকে হত্যা করায় নাম রটে যায় বাঘা যতীন।

১৮৯৫ সালে এন্ট্রান্স পাস করে তিনি কলকাতা সেন্ট্রাল কলেজে (বর্তমানের ক্ষুদিরাম বোস সেন্ট্রাল কলেজ) ভর্তি হন। কলেজের পাশেই স্বামী বিবেকানন্দ বাস করতেন। তার সংস্পর্শে এসে তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য আধ্যাত্মিক বিকাশের কথা ভাবতে শুরু করেন। এ সময়ে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। বিবেকানন্দের আহ্বানে বন্ধুদের নিয়ে যতীন রোগীদের সেবায় নিয়োজিত হন। বিবেকানন্দের পরামর্শে শরীরচর্চার জন্য অম্বু গুহের কুস্তির আখড়ায় যোগ দেন।

কলেজে পড়াকালে যতীন এ্যাটকিনসন সাহেবের স্টেনো টাইপিংয়ের ক্লাসে ভর্তি হন এবং ব্যারিস্টার কেনেডির সেক্রেটারি হিসেবে কাজে যোগ দেন।পরবর্তীকালে কেনেডির সুপারিশে বাংলা সরকারের অর্থসচিব হেনরি হুইলার তাকে নিজের স্টেনোগ্রাফার হিসেবে নিয়োগ দেন।

১৯০০ সাল থেকে ‘অনুশীলন সমিতি’র প্রতিষ্ঠাতাদের সঙ্গে জেলায় জেলায় ঘুরে পত্তন করেন গুপ্ত সমিতির শাখা। ১৯০৩ সালে বাঘা যতীন অরবিন্দ ঘোষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িত হন। সরকারি নথিপত্রে যতীন পরিচিত হন অরবিন্দের ডানহাত হিসেবে।

১৯০৫ সালে ব্রিটিশ যুবরাজের ভারত সফরকালে কলকাতায় বিরাট শোভাযাত্রা উপলক্ষে যতীন স্থির করেন, এ দেশে ইংরেজদের আচরণ প্রত্যক্ষ করাবেন যুবরাজকে। একটি ঘোড়ার গাড়ির ছাদে একদল সৈনিক বসে মজা করছিল। তাদের বুট পরা পা দুলছিল গাড়ীর যাত্রী ও নারীদের নাকের সামনে। যুবরাজ কাছে আসতে যতীন তাদের নেমে যেতে অনুরোধ করেন। যতীন গাড়ির ছাদে ওঠামাত্রা তারা আক্রমণ করে। কিন্তু থাপ্পড় মারতে মারতে যতীন তাদের ধরাশায়ী করেন। তা দেখে যুবরাজ তার গাড়ি থামাতে বলেন। পরে দেশে ফিরে ভারত সচিব মর্লির সঙ্গে ১৯০৬ সালের ১০ মে এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন।

১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে বিপ্লবী বারীণ ঘোষের সঙ্গে একটি বোমা কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। পরে কলকাতার মানিকতলায় বারীণ বড় করে কারখানা খোলেন।যতীন চাইতেন দেশব্যাপী সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণআন্দোলন।

১৯০৮ সালে বারীণের প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হলে অরবিন্দের ঘনিষ্ঠ দুই প্রধান বিপ্লবী অন্নদা কবিরাজ ও মুন্সেফ অবিনাশ চক্রবর্তীকে নিয়ে যতীন সংগঠনের হাল ধরেন। অস্ত্র ব্যবসায়ী নূর খাঁর কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র কিনে যতীন নিয়মিত বাদা অঞ্চলে গিয়ে নির্বাচিত কর্মীদের তালিম দিতেন। আলিপুর বোমা মামলার অভিযুক্ত বিপ্লবীদের ব্যয়ভার বহন, অস্ত্র সংগ্রহ ইত্যাদির জন্য অর্থের প্রয়োজন মেটাতে কিছু স্বদেশী ডাকাতির আয়োজন করেন। ১৯০৮ সালের ২ জুন থেকে ধাপে ধাপে এ অভিযান হয়ে ওঠে ইংরেজ সরকারের বিভীষিকা। সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অভিযোগে ১৯১০ সালের ২৭ জানুয়ারি যতীনকে গ্রেফতার করা হয়।

কারামুক্ত হওয়ার পর জার্মান যুবরাজ কলকাতা সফরে এলে যতীন তার সঙ্গে দেখা করেন এবং সশস্ত্র অভ্যুত্থানের জন্য অর্থ ও অস্ত্র সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পান।১৯১৪ সালের নভেম্বর মাসে সানফ্রান্সিসকো থেকে আসেন ‘গদর’ নেতা সত্যেন সেন। তার সঙ্গে ছিলেন বিষ্ণুগণেশ পিংলে, কর্তারসিং সরাংগা ও অন্যান্য ‘গদর’ কর্মী। সত্যেন জার্মান থেকে অস্ত্র আসার খবর দেন। আরও জানান, কাইজারের সনদ নিয়ে একটি বিপ্লবী মিশন রওনা হচ্ছে কাবুলের পথে। এ বিষয়ে যতীনের চিঠি নিয়ে পিংলে ও কর্তারসিং গেলেন রাসবিহারীর সঙ্গে দেখা করতে। এ সময়ে সত্যেন সেনকে নিয়ে যতীন কলকাতার বিভিন্ন রেজিমেন্টের অফিসারদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সব মিলিয়ে ইতিহাসে একে বলা হয় ‘ভারত-জার্মান ষড়যন্ত্র’।

‘গদর’ কর্মীদের জার্মান অস্ত্র আসার তর সইছিল না। যতীনের সঙ্গে পরামর্শ করে রাসবিহারী অভ্যুত্থানের জন্য ২১ ফেব্রুয়ারিকে দিন ধার্য করেন। পরিকল্পনামতো মহীশুর, লাহোর, ফিরোজপুর, রাওয়ালপিণ্ডি, জব্বলপুর, বেনারস সব জায়গায় তেরঙ্গা ঝাণ্ডা উড়িয়ে দেওয়া হবে- নীল হবে মুসলমান কর্মীদের প্রতীক, হলদে শিখ এবং লাল হিন্দু। কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দখল করে সমস্ত রেলপথ উড়িয়ে দেওয়া হবে, যাতে করে সরকারপক্ষ প্রত্যুত্তরের জন্য সৈন্যবাহিনী না আনাতে পারে। ২৬ আগস্ট কলকাতার রডা কোম্পানি থেকে বিপ্লবীরা শক্তিশালী মাউজার পিস্তল সংগ্রহ করে। ইতোমধ্যে অর্থ সংগ্রহে তাদের অভিনব ডাকাতির সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। ১৯১৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি এক গোপন বৈঠকে কর্মসূচি নির্ধারণকালে সরকারি গোয়েন্দা উপস্থিত হলে যতীনের নির্দেশে চিত্তপ্রিয় তাকে গুলি করেন। কিন্তু মরার আগে ওই গোয়েন্দা যতীনকে হত্যাকারী বলে শনাক্ত করে। এর পর যতীনের মাথার ওপর দাম ঘোষণা করা হয়।

তখনকার এক পুলিশ ইন্সপেক্টর সুরেশ মুখার্জী ছিলেন বিপ্লবীদের চরম শত্রু। বার বার সুরেশের ব্যবহারে বিরক্ত যতীন একদিন বলেন, ‘যতক্ষণ না সুরেশকে সরানো হচ্ছে, ততক্ষণ আমি জল স্পর্শ করব না।’ ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরবেলা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বড়লাট যাওয়ার কথা। তার নিরাপত্তা দিতে সুরেশ সদলবলে টহলে দিতে গেলে যতীনের সহকারীদের হাতে খুন হন। এর পর যতীন বালেশ্বরে (বালাসোর) আশ্রয় নেন। ওখানকার উপকূলেই জার্মান অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বড় জাহাজটি আসার কথা।

সেখানে ৪-৫ জন কর্মী নিয়ে আস্তানা গাড়েন। স্থানীয় মনীন্দ্র চক্রবর্তীর আশ্রয়ে ৬ মাস থাকেন। ইতোমধ্যে রাসবিহারীর প্রচেষ্টা উত্তরাঞ্চলে ভেস্তে যায় কৃপাল সিং নামে বিশ্বাসঘাতকের জন্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চেকোস্লোভাকিয়া থেকে আসা বিপ্লবীরা ইন্দো-জার্মান সহযোগিতার সংবাদ ফাঁস করে দেয়। মার্কিন গোয়েন্দা ও ব্রিটিশ সুরক্ষা বিভাগ যৌথ উদ্যোগ নেয় বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে মুল থেকে উচ্ছেদ করতে। পেনাংয়ের একটি সংবাদপত্রের কাটিং থেকে যতীন খবর পেলেন, অস্ত্রশস্ত্রসহ জাহাজ ধরা পড়ে গেছে। এদিকে একের পর এক বিপ্লবীদের কেন্দ্রগুলোতে হানা দিতে থাকে পুলিশ। বালেশ্বরের সন্ধান পেতে আর দেরি নেই বুঝে কেউ কেউ গা-ঢাকা দিতে চান। কিন্তু যতীন জানান, ‘আর পালানো নয়। যুদ্ধ করে আমরা মরব। তাতেই দেশ জাগবে।’ ৪ জন অনুচরসহ মুখোমুখি হলেন বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র পুলিশের। আহতাবস্থায় হাসপাতালে মারা যান ১৯১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *