সিন্ধুর জল বন্ধ নয়…আক্রমন সঠিক পদক্ষেপ। দেবাশীষ পাইন।

kashmir-army-1_0_0_0_0_0লেখাটা পড়ার সময় অনেকের ধারনা হতে পারে প্রতিবেদক যুদ্ধের স্বপক্ষে।বলতে দ্বিধা নেই পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধের স্বপক্ষে না হলেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে।ভারত সম্পর্কে ইসলামাবাদের মনোভাবকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে।মনের ইচ্ছের কথাগুলি লেখার মধ্যেই সংবাদ এলো ভারতীয় সেনাবাহিনী সাড়ে চার ঘণ্টার সার্জিকাল অপারেশন চালিয়েছে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে।সীমান্ত রেখা অতিক্রম করে দু কিলোমিটারের বেশি অভ্যন্তরে ঢুকে ৮টি জঙ্গি ডেরাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে চিরতরে শুইয়ে দিয়েছে প্রায় ৫০ জন জঙ্গিকে।একজন জাতীয়তাবাদীর কাছে এর থেকে বড় সুসংবাদ আর কিছুই থাকতে পারে না।আজ সরকার ও সেনা যে ভুমিকা পালন করল এই ভূমিকাটা আরও আগে পালন করলে পাকিস্তান এতো বেড়ে খেলতে পারত না।‘লাথো কা ভুত বাতো শে নেহি মানতা’-কেন বলছি,নিচের লেখাটা পড়লেই বুঝবেন।

Uri-attack-752x422

কাশ্মীর উরি সেক্টরে ভারতীয় সেনা ছাউনির ওপর জঙ্গি হানার পর ভারত  ও পাকিস্তানের মধ্যে যে উত্তপ্ত পরিবেষ তৈরি হয়েছে তা এই উপমহাদেশের জনগণকে আড়াআড়ি দুভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে।দেশের বৃহৎ জনসংখার অভিমত হল আর একপলও কালক্ষেপ না করে ভারতের উচিৎ পাকিস্তানকে সমুচিন জবাব দেওয়া।অপর দল এতটা উগ্র মত পোষণ করছে না কারন তারা শঙ্কিত।জানে,যুদ্ধ বাধলে কি ভয়ানক দেশের ক্ষতি হতে পারে এই ভেবে।এমনিতেই দেশে মন্দা বাজার ও দ্রব্য মুল্য বৃদ্ধির কারনে সাধারন মানুষের নাভিস্বাস উঠছে তার ওপর যুদ্ধ বাধলে দেশের মানুষকে খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়াতে হবে।

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনী প্রচারে দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইউপিএ(১) এবং ইউপিএ(২) পরিচালিত সরকার কর্তৃক ভারত বিরোধী সন্ত্রাসবাদে মদত দাতা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থানের বদলে নরম নীতির সমালোচনা করে তুলোধোনা করেছিলেন।এবার পাঠানকোট ও উরির ঘটনার পর বর্তমান সরকার বেকায়দায় পড়েছেন।তাই জনমানসে বীর মার্কা ছবি তুলে ধরতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়ছেন কিন্তু ভালো করেই জানেন যুদ্ধ বাধালে দেশ কি ভয়ঙ্কর পরিনতির শিকার হবে।সেকারনে প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু জলবন্টন চুক্তি বাতিল করে পাকিস্তানকে টাইট দেবেন।মোদী বিবৃতি দিয়ে বলেছেন রক্ত আর জল একসঙ্গে বইতে দেওয়া যেতে পারে না।রক্ত বন্ধ না হলে জল বন্ধ করে দেব !আমি একজন সাধারন নাগরিক হিসাবে এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নই।গরম বিবৃতি পর্যন্ত ঠিক আছে,এরপর ভারতের উচিৎ পরিকল্পিত ভাবে চুক্তি বাতিলের পথে না হেঁটে সরে আসুক এবং প্রতিবাদের সুর বেশ খানিকটা চরিয়ে যথাস্থানে পৌঁছে দিক।এতে প্রত্যাশিত,অপ্রত্যাশিত দু রকমের ফলাফলই হতে পারে।পাকিস্তান চাইছে ভারত আক্রমন করুক আর করলেই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা করতে সুবিধা হবে,ভারত যুদ্ধবাজ ও আগ্রাসী দেশ।

Samba_2701147g

ভারত বিগত ২৫ বছর ধরে পাকিস্তান মদতপুষ্ট জঙ্গিবাদের শিকার।এমনটা তো নয়,যে ভারতে উরি পাঠানকোটের আগে কোন জঙ্গি নাশকতার ঘটনা ঘটেনি!অবশ্যই ঘটেছে।বিগত ২৫ বছরে ভারতবর্ষে সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ বদলেছে।কিন্তু দুর্ভাগ্য,আজ পর্যন্ত কোন সরকার ও তার প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার রাস্তা বাতলে দিতে পারেন নি!তাই বার বার ছোট বড় নানান মাপের সন্ত্রাসবাদী আক্রমন সংগঠিত হয়েছে,আর আমরা মোকাবিলা করতে অক্ষম থেকেছি।যখনি দেশে কোন সন্ত্রাসবাদী ঘটনা ঘটে ঠিক সেই মুহূর্তে দেশ জুড়ে বিতর্কের ঝড় বয়।কিন্তু দেখা গেছে কখনই আমরা নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌছতে পারি না।ততক্ষণে নতুন কোন সন্ত্রাসবাদী ঘটনা ঘটে আগের ঘটনাকে চাপা দিয়ে দেয়।

আজকে আমরা উরির ঘটনায় ভারতের কি ভাবে প্রতিক্রিয়া জানান উচিৎ সেই আলোচনায় মশগুল কিন্তু নিজের মনে উঁকি মারলেই বুঝবেন পাঠানকোটের ঘটনা অনেকটাই ঝাপসা হয়ে গেছে।পাঠানকোট ঘটনা ঘটার পর আমরা ঐ আলোচনাতেই মশগুল ছিলাম ভুলে গিয়েছিলাম গুরুদাসপুরের ঘটনা!২৫ বছরে এমন সন্ত্রাসবাদী ঘটনা ঘটে যাওয়ার তালিকা বেশ লম্বা।কিছু কিছু ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করার কাজে বা আগাম সন্ত্রাসবাদ প্রতিহত করার ক্ষেত্রে আমরা সফল হয়েছি কিন্তু পাকিস্তানে বসে থেকে যারা ভারতে সন্ত্রাসবাদ পরিচালনা করছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা কিছুই ব্যবস্তা নিতে পারিনি।ভারতে সন্ত্রাসবাদী ঘটনায় পাকিস্তানী প্রত্যক্ষ মদতের দিস্তা দিস্তা প্রমান পত্র পাকিস্তানকে পাঠিয়েছি,এমনকি পাঠানকোট ঘটনার পর পাকিস্তানী গোয়েন্দাবাহিনীকে ভারতে এসে তদন্ত করার সুযোগও দেওয়া হয়েছিল।ভারত আশা করেছিল ইসলামাবাদ সদর্থক ভুমিকা পালন করবে কিন্তু কিছুই হয় নি—যা হয়েছে তা শুধুই নাটক।আজ আমরা সকলেই জানি যারা মুম্বাই হামলার নায়ক তারা সকলেই পাকিস্তানে নিরাপদে বসবাস করছে।এটাকে কি আমরা চলতে দিতে পারি? না মেনে নিতে পারি??পাকিস্তানী সন্ত্রাসবাদীরা দিনের পর দিন আমাদের দেশে আতঙ্কবাদ চালিয়ে যাবে আর আমাদের সরকার প্রতিবার নতুন নতুন আলোচনার বিকল্প খুঁজবে!এই চলতে থাকলে সন্ত্রাসবাদের গল্প কোনদিনও শেষ হবে না।

 

আমি একজন ভারতীয় নাগরিক হিসাবে মনে করি আলোচনা চলুক পাশাপাশি সময় নষ্ট না কোরে কি ভাবে কড়া পদক্ষেপে নেওয়া যায় সেদিকটাও গুরুত্ব দিয়ে ভাবা চলুক।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিতে ভারতের সমস্যাটা কোথায়?আমার মনে হয় সমস্যাটা স্কুল বয়দের মতন।স্কুলের বাচ্ছারা যেমন তাদের স্কুলের পোশাকে কালি লাগাতে চায় না একই মানসিকতায় ভারত আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় নিজের ভাবমূর্তি খারাপ করতে চায় না।এটা হীনমন্যতা ছাড়া আর কিছুই নয়!দেশের ভেতর ও বাইরের সুরক্ষা বজায় রাখতে গিয়ে বহু ক্ষেত্রে অনেক দেশকে নীতির বাইরে গিয়ে পদক্ষেপ নিতে হয়।আপাতদৃষ্টিতে কাজগুলোকে নিতিহীন মনে হতে পারে কিন্তু দেশের স্বার্থে যথার্থ সিদ্ধান্ত বলে গন্য করব।এমন উদাহরন দুনিয়াজুড়ে ভুরি ভুরি আছে।দক্ষিণ চিন সাগর সমস্যায়,চিন চোখ বুজে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়কে অস্বীকার করে নিজ স্বার্থ সম্পাদন করেছে।বহুক্ষেত্রে নজীর বিহিন ভাবে পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলো আন্তর্জাতিক চুক্তি, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও প্রতিশ্রুতির খেলাপ করেছে।২০০৩ সালে যখন আমেরিকা ইরাক আক্রমন করল তখন আমেরিকা ইরাককে দেওয়া অতীতের কোন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিল?ইরাকে সেনা ও অস্ত্র অনুপ্রবেশ করিয়ে যখন আমেরিকা দুরমুশ করছিল তখন কোন দেশ ইরাকের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল!এই কুকর্মের জন্য ব্রিটেন ও আমেরিকার আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় কোন ভাবমূর্তি খারাপ হয়েছে?অতএব যাদের সামনে কালিলাগা জামা পরে দাঁড়াতে আমরা কুণ্ঠা বোধ করি তাদের জামাতেই তো পাপের কালি লেগে আছে!

ceasefire-650_101314075423_032915103201পাকিস্তান ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।ভারত যদি জোর কোরে পাকিস্তানের স্থল ও আকাশসীমা অতিক্রম করে তাহলে ইসলামাবাদের তরফ থেকে ভারতকে যোগ্য জবাব দেওয়া হবে।কোথা থেকে পাকিস্তান এতো সাহস পায়!দিনের পর দিন পাকিস্তান মদতপুষ্ট জঙ্গিরা হয় ভারতের সীমান্ত এলাকায় নাহলে দেশের অভ্যন্তরে সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে আর আমরা শান্তি ও সহিষ্ণুতার জামা পড়ে আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সুবিচারের আশায় দরবার করে চলেছি।আমাদের এহেন ভুমিকায় অক্ষমতা প্রমান হয়েছে আর ইসলামাবাদের মনোবল বেড়েছে।ভারত সম্পর্কে পাকিস্তানের ধারনা ও মনোবল অবিলম্বে ভাঙ্গা দরকার আর ভাঙ্গতে গেলে কঠিন পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।সেই কঠিন পদক্ষেপ গ্রহনের একমাত্র রাস্তা যুদ্ধ এমনটা বলছি না।কঠোর জবাব দেওয়ার আরও অনেক রাস্তা আছে, আমাদের সেই রাস্তাই ভাবতে হবে।অন্তত উরি আক্রমনের পর অবশ্যই ভাবা দরকার তাহলেই পাকিস্তান নিজের রাস্তা বদলাবে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যুদ্ধের পর সিমলা চুক্তির ২৩ মারা হয়ে গিয়েছিল। আমরা সকলেই জানি ইন্দিরা গান্ধী জম্বু কাশ্মির সমস্যা সমাধানে দু দেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক সিমানা, লাইন অফ কন্ট্রোলকেই চূড়ান্ত রুপ দিতে চেয়েছিলেন।প্রথমে জুলফিকর আলি ভুট্ট এই সমাধান প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন।পরে অবস্য ভুট্ট ইন্দিরা গান্ধিকে অনুরোধ করেন।বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তির পক্ষে ওনার দেশে জনমত তৈরি করতে সময় লাগবে, সেই সময় টুকু ভুট্টকে দেওয়া হোক।ইন্দিরা গান্ধী  ভুট্টকে সেই সময় টুকু দেন।এই সময় দেওয়াটাই ইন্দিরা গান্ধির ঐতিহাসিক ভুল হয়েছিল।সেই কারনে কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে চূড়ান্ত মীমাংসা ঠিক কি হবে,সেটা ঠিক না করেই সবটা হয়েছিল।ভুট্ট অবশ্যই দেশে ফিরে গিয়েছিল এবং ফিরে যাওয়ার আগেই পরিকল্পনা করা ছিল, যে মুহূর্তে ভুট্ট দেশে ফিরে চুক্তির কথা বলবে তখনি দেশ জুড়ে ভুট্টর বিরোধিতা করা হবে।

সিমলা চুক্তির মধ্যে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ নিয়মের কথা উল্লেখ করা ছিল। যদি কখনও দুদেশের ভেতর মতপার্থক্যের পরিবেষ তৈরি হয় তাহলে শান্তিপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মদ্ধেদিয়ে নিস্পত্তি করতে হবে।আজ কি অবস্তা!পাকিস্তান সিমলা চুক্তির কথা বেমালুন ভুলে গিয়ে খালি ১৯৪৭-৪৮ সালের রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান চায়।পাকিস্তান এমনই একটা দেশ যারা শুধু নিজের স্বার্থের ব্যাপারটুকুই মনে রাখে।একই বিষয়ে বাকিদের ক্ষেত্রে স্মৃতিভ্রংশ হয়,যেমন আর পাঁচটা মিথ্যাবাদীদের হয়।এরা বিশ্বাস করে লাগাতার মিথ্যা কথা বলে যাও একদিন ওটাই সত্যির প্রতিষ্ঠা পাবে।এটা পরিষ্কার বোঝা গেছে পাকিস্তান কোন ক্ষেত্রেই প্রতিশ্রুতির মর্যাদা পালন করে না,তাহলে আমরাই বা কোন দায়ে পড়ে পালন করতে যাব।পাকিস্তানের একটা বদ্ধমুল ধারনা হয়ে আছে ভারত নরম সরম দেশ।ঘটনা ঘটলে কিছুদিন গুন গুন করবে,সভা সমিতি করে বড় বড় ভাষণ ঝাড়বে, আলোচনা চালাবে কিন্তু কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার হিম্মত নেই।

ঈশ্বরের দোহাই, দয়া করে একবার মুতোড় জবাব দিয়ে দিন।কারোর বদ্ধমুল ধারনার গোরায় আঘাত করলে কি হয় পাকিস্তানকে আঘাত করার পর নিজেরাই অনুভব করতে পারবেন।সারমেয়র অণ্ডকোষে থিনার কেমিক্যাল ঢেলে দিলে যে ভাবে সারমেয়টি পাগলের মতো এদিক সেদিক দৌড়োয়, পাকিস্তানকেও ঐ অবস্তায় দেখবেন।পরিশেষে,“ভারতীয় জওয়ান—তুঝে লাখ লাখ সালাম”      

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *