সত্যজিৎ পরিকল্পিত হত্যার শিকার– দেবাশীষ পাইন

image৯/২/১৯ শনিবার রাত সাড়ে আটটা বাজে,নিজের বাড়ী থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে সরস্বতী পুজোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গিয়ে খুন হতে হোল মতুয়া সম্প্রদায়ের দাপুটে তৃণমূল নেতা,নদীয়া জেলার কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভার বিধায়ক সত্যজিৎ বিশ্বাসকে। সকাল থেকে দফায় দফায় অন্তত সাত থেকে আটবার লোডশেডিং হয় মাজদিয়া ফুলবাড়ী এলাকায়। ওঁত পেতে ছিল দুস্কৃতিরা। লোডশেডিং হতেই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে পালিয়ে যায় দুষ্কৃতিরা। হত্যাকাণ্ড ঘটার পর থেকেই রাজনৈতিক চাপানউতোর চলছে। চলছে একে অপরের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ও হুমকি। দুষ্কৃতিদের মধ্যে দুজন সুজিত মণ্ডল ও কার্ত্তিক মণ্ডলকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পেরেছে কিন্তু অভিজিৎ পন্ডারি এখনও পলাতক।

রাত মাত্র আটটার সময় যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী রত্না ঘোষ, জেলা তৃনমূলের সভাপতি গৌরি শঙ্কর দত্ত, বিধায়ক সত্যজিৎ বিশ্বাস ছাড়াও তৃনমূলের তাবড় জেলা নেতারা সেই অনুষ্ঠানে যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা কেন করেনি স্থানীয় পুলিশ এটাই অবাক করছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাতশো আটশো লোকের মধ্যে দুষ্কৃতিরা এলো আর গুলি করে হাত মুছতে মুছতে চলে গেলো, বিষয়টা সন্দেহকে ঘনিভুত করার জন্য যথেষ্ট।

পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকেই নদীয়া জেলার রাজনীতির পারদ ওপরের দিকে অবস্থান করছিল। জেলায় তৃনমূল থেকে অন্য দলে নাম লেখানোর হিড়িক চলছিল। এমনিতেও নদিয়া জেলায় রাজনৈতিক হিংসা নতুন কিছু বিষয় নয়। নথিভুক্ত তালিকা অনুযায়ী নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হত্যাকান্ডে সত্যজিৎ দ্বিতীয়, প্রথম জন অসমঞ্জ দে।

নদীয়া জেলার হাঁসখালি ও কৃষ্ণগঞ্জ এই দুটি সীমান্তবর্তি ব্লক বরাবরই মফিয়া ও চোরাকারবারিদের কল্যানে অপরাধপ্রবন অঞ্চল। বেশীদিন কেউই একছত্র রাজ করতে পারেনি। খুন হতে হয়েছে। সাম্প্রতিক উদাহরন দুলাল বিশ্বাস। ইদানীংকালে সত্যজিৎ বিশ্বাসের বেড়ে ওঠা একছত্র প্রভাব মাটি মফিয়া ও সিমান্তে চোরাচালানকারীদের মধ্যে তিক্ততার সম্পর্ক তৈরি করে দিয়েছিল। ডাকাবুকো স্বভাবের সত্যজিতের জমাট প্রতিরোধের সামনে সামাজবিরোধীরা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল।

সামান্য চাষি পরিবারের সন্তান সত্যজিৎ ক্ষমতার অলিন্দে যত শক্তিশালী হয়েছে ততই তার ক্ষীদে বেড়েছিল। পুলিশের গুপ্তচর বিভাগের কাছে এমন সংবাদ ছিলনা সেটা আমি মানতে নারাজ। কারন অন্ধকারের দুনিয়ায় পুলিশ, দুস্কৃতি ও প্রভাবশালীর সহাবস্থান সর্বজনবিদিত। স্বার্থে আঘাত লাগলে কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলার বান্দা নয়। সব জেনেও না জানার ভান করে পথের কাঁটাকে সরিয়ে দেওয়ার খেলায় সকলে চোরে চোরে মাসতুতো ভাই।

কয়েকদিন আগে নদীয়া জেলার প্রশাসনিক বৈঠকে ধান কেনাবেচা সংক্রান্ত বিষয়ে ফড়েদের মাতব্বরির বিরুদ্ধে ব্যাপক সরব হয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। কাদের বিরুদ্ধে সত্যজিত এবং এরা প্রয়োজনে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তা পুলিশের অজানা নয়। সময় থাকতে সত্যিজিতকে সতর্ক করে দেওয়া উচিত ছিল না কি? কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ঘটনার দুদিন আগে থেকে বিধায়কের দেহরক্ষী ছুটিতে চলে যায়। তার ছুটি মঞ্জুর প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ছুটি মঞ্জুরের জন্য দেহরক্ষী কোন দরখাস্তই করেই, সবটাই মুখে মুখে। এখন কর্তব্যে গাফিলতির দায়ে থানার ওসি এবং দেহরক্ষীকে সাসপেন্ড করে লাভ?

ঘটনাস্থল থেকে একশো গজ দূরে একটি ওয়ান সটার আগ্নেয়াস্ত্র পুলিশ উদ্ধার করেছে। আগ্নেয়াস্ত্রটি বালিস্টিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। বুলেট ইনজুরি আর বালাস্টিক রিপোর্ট মেলালেই বোঝা যাবে যে ঠিক কয় রাউন্ড ফায়ার হয়েছে। যদি রিপোর্টে একাধিক ফায়ারের উল্লেখ থাকে তাহলে সন্দেহ আরও বাড়বে কারন ওয়ান সটার আগ্নেয়াস্ত্রে একবারই ফায়ার করা যায়। ফায়ার হওয়ার পর ক্যাপ রিলিজ করে নতুন কার্টিজ ভরে পুনরায় ফায়ার করতে সময় লাগে। এবার প্রশ্ন হচ্ছে, হত্যাকান্ড এতো কম সময়ে দ্রুততার সঙ্গে হয়েছে যে একটি আগ্নেয়াস্ত্রে একাধিক ফায়ার করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে একাধিক আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু পুলিশ একটি মাত্ররই সন্ধান পেয়েছে। এখানে তদন্ত গুলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারা করতে পারে? যারা চার্জ সিট তৈরি করবে।

খুনের ধরন দেখলেই বোঝা যায় যে এই খুন পরিকল্পিত। অনেকদিন ধরে স্যাডো করে তার পর হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়েছে। প্রতিটা মানুষেরই গার্ডেড আর আনগার্ডেড মোমেন্ট থাকে আর এক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেওয়া হয়েছে। দেহরক্ষী নেই, সকাল থেকে দফায় দফায় লোডশেডিং, মন্ত্রী নেতার উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই ইত্যাদি ইত্যাদি।

কে এই অভিজিৎ পন্ডারি? অভিজিৎ বগুড়া কলেজের তৃনমূল ছাত্র পরিষদ নেতা। মাস তিনেক আগে রাস্তার মাটি বিক্রিকে কেন্দ্র করে বিধায়ক সত্যজিৎ বিশ্বাসের সঙ্গে মতবিরোধ হয়। বেয়াড়া অভিজিৎকে শায়েস্তা করতে বিধায়ক তার বাড়ীতে চড়াও হয়ে মারধোর করে। পড়ে অভিজিৎ বিধায়কের কাছে কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিলে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। শনিবার সরস্বতী পুজোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সে উপস্থিত ছিল। বিধায়কের ভাই সুজিত বিশ্বাসের বয়ান অনুযায়ী খুন করে পালিয়ে যাওয়ার সময় সকলে তাকে দেখে ফেলে। এলাকার লোকেরা ধরেও ফেলত কিন্তু আচমকা একটি লরি এসে যাওয়ার ফলে অভিজিৎ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

এখানে সন্দেহের জাল ঘনিভুত হচ্ছে। রাস্তার মাটি কাটাকে কেন্দ্র করে সামান্য অশান্তির ঘটনায় অপমানিত অভিজিৎ বিধায়ককে খুন করার মতো সাহস জোটায় কোথা থেকে? আদৌ অভিজিৎ খুন করেছে কি করেনি সেটা তদন্ত সাপেক্ষ, এক্ষেত্রে যেটা ভাবা দরকার তা হোল অভিজিৎকে বোড়ে করে আসল খুনিদের আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে কি হচ্ছে না।

এবার একটু দেখা যাক কে এই সত্যজিৎ বিশ্বাস। সামান্য স্কুলের ক্লার্ক থেকে অতন্ত্য কম সময়ে জেলা রাজনীতির দাপুটে নেতায় উপনিত হয়েছিল সত্যজিৎ। হাঁসখালি- কৃষ্ণগঞ্জ এলাকায় তিনিই ছিলেন শেষ কথা। ২০১৫ সালেও নদীয়া জেলার রাজনীতিতে সত্যজিতকে খুব একটা উল্লেখযোগ্য ভুমিকায় দেখতে পাওয়া যায়নি। ২০০৮ সালে হাঁসখালি ব্লক তৃনমূল যুব সভাপতি। ২০১৩ সালে পঞ্চায়েত সদস্য ও পরে প্রধান। ২০১৫ সালে কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বিধায়ক হন। তারপর জেলা যুব তৃনমূলের সভাপতি। ২০১৮ সালে নদীয়া জেলায় নমঃশূদ্র ও মাতুয়া সম্প্রদায় উন্নয়নের দায়িত্ব পান।

বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনে নিজের বিধানসভা কেন্দ্রে ভালো ফল করার পর দলের পক্ষ থেকে বিজেপি মনোভাবাপন্ন মাতুয়া মতাবলম্বীদের তৃনমূলের দিকে টেনে আনার কাজে দলের পক্ষ থেকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই কাজে সত্যিজিৎ বিশাল বিশাল সমাবেশ করে দলের নেতৃত্বের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে। স্বাভাবিকভাবে দলের অন্দরে সত্যাজিতের এই দ্রুত উত্থান অনেকের চক্ষুশূল হয়। পাশাপাশি নদীয়া জেলায় তৃনমূল ছেড়ে বিজেপি যাওয়ার যে নতুন হিড়িক তৈরি হয়েছিল সেটাকে প্রানপনে আটকাচ্ছিলেন সত্যাজিত। এখানেও বিজেপির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল।

হত্যাকাণ্ডের পর তৃনমূল দল সরাসরি বিজেপির দিকে আঙ্গুল তুলছে। আবার উল্টোটাও হতে পারে। সত্যজিতের দ্রুত উত্থান, জনপ্রিয়তা, দলের মধ্যে যাদের হৃদয়ে হিংসার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল তারাই হয়তো আজ বেশী বেশী করে চেঁচাচ্ছে। জঙ্গলের কানুন তো একটু অন্য রকম হয়—সিংহই তার শাবককে খেয়ে ফেলে।

এই হত্যাকান্ড থেকে আবার নতুন করে শান্তির জন্য উত্তরনের পথ খুঁজতে হবে।তা নাহলে রাজনৈতিক এবং সমাজবিরোধীদের চোরা পাঁকে হারিয়ে যাবে বঙ্গ সংস্কৃতি, ভালোবাসা, উন্নয়ন এবং মানবতার দীর্ঘ ইতিহাস।

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *