শুধুই বিরোধিতার জন্য বিরোধিতাঃদেবাশীষ পাইন

downloadগতকাল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য, রাজ্যপাল জগদীপ ধনকার কোর্ট বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে নজিরবিহীনভাবে ছাত্র বিক্ষোভের সামনাসামনি হলেন। সাম্প্রতিক অতীতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বারবার ছাত্র ও কর্মচারি যৌথ ন্যাক্কারজনক বিক্ষোভের শিরোনামে এসেছে। যাদবপুরে আজ আর সুস্থ পঠনপাঠনের পরিবেশ নেই, পরিবর্তে নোংরামির আঁতুড়ঘরে পরিনত হয়েছে। এবং এই কারনে, শিক্ষার মানে সর্বভারতীয় পর্যায়ে যাদবপুর আজ উল্লেখযোগ্য ভাবে অনেক নিচের দিকে নেমে এসেছে।

অতীতে যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ছাত্ররা, ভারতজুড়ে সমাজের সর্বস্তরে দিকদিশা দিত, আন্তরজার্তিক পর্যায়ে আজও স্বমহিমায় বিদ্যমান,সেই যাদবপুর আজ বাঁজা!! কেন? স্বাধিকার ও ছাত্র আন্দোলনের নামে সমগ্র ক্যাম্পাস জুড়ে যে নারকীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছে তাতে গর্ভধারন করা যায় কিন্তু রত্নগর্ভা কিছুতেই হওয়া যায় না।

এই পরিস্থিতির কারন সন্ধানে একটু অতীতে ঝাঁকিদর্শন করা যাক। ২০১১ সালে পশ্চিমবাংলার শাসনে তৃনমূল ও কংগ্রেসের যৌথ সরকার আসার পর থেকেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিষাক্ত হতে শুরু করে। শুধু যাদবপুরই নয়, বাংলাজুড়ে শিক্ষাঙ্গনে একের পর এক জঘন্য ঘটনা ঘটতে শুরু করে। এদল ওদল থেকে দলছুটদের নিয়ে সংগঠিত তৃনমূল ছাত্র পরিষদ এক জগাখিচুড়ি ভৈরব বাহিনী। কলেজের অধ্যক্ষ থেকে ছাত্র কেউই বাদ পড়েনি এদের অত্যাচারের কবল থেকে।

অপরদিকে ২০১১ সালের পর থেকেই শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক জমি হারানোর আতঙ্কে ভোগা শুরু করে বাম ও অতিবামেরা। লক্ষ্য করলে দেখতে পাব, ৭৭ সাল থেকে ২০১১ সালের আগে অবধি শিক্ষাঙ্গনগুলির দখল মোটামুটি বামেদের হাতেই ছিল।এরাও ধোয়া তুলসি পাতা নয়। এই সময়কালে সিলেবাসে প্রমোদায়ন, অনিলায়ন, বিমানায়ন হয়েছে। আচার্য ও উপাচার্যের বিরুদ্ধে শাসকদলের অঙ্গুলিহেলনে বাম ছাত্র, বাম শিক্ষক ও অশিক্ষক সংগঠনের দ্বারা জোর যার মুলুক তার গোছের আন্দোলনের নামে অত্যাচার হয়েছে। উল্লেখ্য, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্য সন্তোষ ভট্টাচার্যের সঙ্গে নোংরামির ঘটনা নিশ্চয় বঙ্গবাসীর স্মরনে আছে।

এখন শিক্ষাঙ্গনের জমি দখলের লড়াইতে কলুষিত হচ্ছে শিক্ষাঙ্গন। ছাত্ররাও নিজেদের ভবিষ্যৎ ভুলে পড়াশোনা শিকেয় তুলে নেমে পড়েছে দখলের লড়াইতে।আর এই সব সংগঠনের দ্বারা চলে আসা কুকর্মের বিরুদ্ধে অনেকদিন ধরেই আওয়াজ তুলেছে ‘এবিভিপি’,তাতে আরও সমস্যায় পড়েছে। ‘হোক কলরব’ ছাত্র আন্দোলনের পর তৃনমূল প্রমাদ গুনতে শুরু করে।ঐ সময় মুখ্যমন্ত্রী থেকে শিক্ষামন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে বলেন- যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় মাদকাসক্তদের আড্ডা, অসভ্য ও উড়নচণ্ডেদের আবাসভুমি। ওখানে পড়াশোনার কোন উপযুক্ত পরিবেশ নেই। সরকার অনুভব করলো, অসভ্যদের রুখতে আরও একদল অতি অসভ্য দরকার। সরকারি প্রস্যয় দেওয়া শুরু হোল জগাখিচুড়ি ভৈরব বাহিনীকে। যার মধ্যে ঢুকে পড়ে সুবিধাবাদী কর্মচারী সংগঠন। এই মিলিজুলি বর্তমানে নবকলেবর পেয়ে নাম হয়েছে তৃনমূল শিক্ষাবন্ধু সমিতি। বামেরা তো আর বসে থাকবে না, তাঁরও নেমে পড়েছে অধিক নোংরামিতে।এই বিষময় পরিবেশের ফল ভোগ করছে, যারা সত্যিকারের ছাত্র। যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে চায়।

সোজা মেরুদণ্ডের রাজ্যপালকে যখন চাপ দিয়ে বাপ বলানো যাচ্ছে না তখন ছাত্র বিক্ষোভের নামে নোংরামির সীমা আরও বাড়াও। অযৌক্তিক ও অপ্রাসঙ্গিক বিক্ষোভ রাজ্যপালের বিরুদ্ধে দেখিয়ে কার লাভ হচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য, উপাচার্য ও অন্যান্য আধিকারিকদের নিয়ে এইধরনের সভাগুলির গুরুত্ব অসীম। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন এবং তৎসংক্রান্ত অনুদানের বিষয়গুলি আলোচিত হয়। আচার্য তদবির করেন। গতকাল ছাত্র বিক্ষোভের নামে কি দেখলাম। এক সংগঠন রাজ্যপালকে সভা করতে দিতে চায় কিন্তু শিক্ষাবন্ধু নামক সংগঠন নারাজ। ছাত্রদের দাবি ছিল, রাজ্যপালকে ছাত্রদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। আমরা দেখলাম চরম হট্টগোলের মধ্যেও অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে রাজ্যপাল প্রশ্নগুলি শুনলেন এবং উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলেন।

কিন্তু ছাত্রদের দ্বারা রাজ্যপালকে করা কিছু অর্বাচীন প্রশ্ন তাদের মেধা নিয়ে আমার মনে সংশয় তৈরি করেছে। ‘সিএএ’ সংসদের উভয় কক্ষে পাশ হয়ে, রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর আইনে পরিনত হয়েছে। রাজ্যপাল একটা রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান, তিনি কি করে এই বিলের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে পারেন!! যাদবপুর ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কে হেনস্তা করার প্রতিবাদে এবিভিপি সন্ত্রাস করে এমনটাই দাবি বিক্ষোভরত ছাত্রদের। ঐ দিনের ঘটনার সবিস্তার রিপোর্ট রাজ্যপাল, রাজ্য সরকারের চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকার সেই রিপোর্ট রাজ্যপালকে পাঠান নি। এখানে কিসের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে রাজ্যপাল তার বিবৃতি দেবেন বা নিন্দা করবেন!! রাজ্যপালের পক্ষে চিহ্নিতকরন অসম্ভব, কে কোন দলের।এক্ষেত্রে রাজ্যপালকে রাজ্য প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতেই হয়। যারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করলেন, তাদের এটুকু জ্ঞান থাকা প্রয়োজন ছিল। যে নেতাদের নির্দেশে বিক্ষোভ করলেন তারাও সঠিক চিত্রনাট্য আপনারদেরকে দেন নি। রাজনিতির স্বার্থে আর কত নিচে নামবো!!

# কালকের সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখে যা মনে হোল, ‘বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা’। ছাত্রদের তোলা প্রশ্নগুলিতে ছোটবেলায় পড়া  সিংহ ও মেষ শাবকের গল্পের কথা মনে পড়ে গেল।

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *