“শরিয়ত আইনেও তাৎক্ষণিক তিন-তালাক প্রথা নিষিদ্ধ অর্থাৎ অবৈধ”–লিখেছেন, সামসুল হক

aabd3f5222975483af60523d62e5b05d1সাম্প্রতিক ভারতবর্ষের সর্বোচ্চ আদালত ঐসলামিক শরিয়ত আইনের একটা বিষয় তালাক প্রথা বা বিবাহ বিচ্ছেদ ইংরেজীতে যার প্রতিশব্দ ডিভোর্স সেই বিষয়ের উপর ছয় মাসের স্থগিতাদেশসহ বিষয়টা অসাংবিধানিক বলে রায়দান করেছে এবং কেন্দ্র সরকারকে এই রায়দানের উপর ভিত্তি ক’রে সঠিক আইন প্রণয়ন করার নির্দেশ দান করেছে । এই রায়দান হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে সোস্যাল মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া উত্তাল-তোলপাড় হয়ে উঠেছে ।কিছু মেকী নারীবাদী পুরুষ, কিছু মহিলা সংগঠন, কিছু গোঁড়া মানুষ যারা ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী সংগঠন করে তাদের কথাবার্তা, চালচলন, সোস্যাল মিডিয়ায় স্টেটাস দেওয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেওয়া, সঠিক ভাবে পর্যালোচনা ক’রে, দেখে মনে হচ্ছে তারা যেন পাঁচ-সাতটা বিশ্বযুদ্ধ জয় ক’রে ফেলেছেন।এমন একটা বিষয়ে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কি চুপচাপ থাকতে পারে ? কিছু দল পক্ষে, দু-একটা দল বিপক্ষে নিজেদের স্বভাব মতোই রাজনীতি শুরু করেছে–তর্জাপালা চলছে।কিছু মুসলিম সংগঠন এই রায়দানের বিপক্ষে মানুষকে ভুল বুঝিয়ে মহিলাদের সঙ্গে নিয়েই জনমত তৈরীতে উঠেপড়ে লেগে গেছে ।   যেসব কবি সাহিত্যিকের কাছে লেখাটা ঝাল-ঝাল পোস্তবাঁটা দিয়ে ভিজেভাত খাওয়ার মত অর্থাৎ শুধুমাত্র লেখার জন্যই লেখা, তানাদের বেশ কিছু লেখা আমি সোস্যাল মিডিয়াতে পড়েছি । সবকিছু শুনে-দেখে-পড়ে আমার এই স্পষ্ট ধারনা হল যে, উল্লিখিত সংগঠন ও ব্যক্তিগণ অধিকাংশই সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বিষয়বস্তু ও মর্মার্থ না জেনে-বুঝে শুধু শুধুই হল্লা আর কলরব সৃষ্টি করছেন আর তার মধ্য দিয়ে আদালতের রায়দান সম্পর্কে সমাজের মানুষের কাছে সঠিক বার্তাটি পৌঁছে দিচ্ছেন না।

বিষয়টা আমার পরিবারের জন্য সব্জির বাজার করার মতো তো নয়–যা ইচ্ছে হল কিনে নিলাম । একটা সামাজিক বিষয় যার গভীর প্রভাব আছে সমাজের মানুষের উপর সেই সম্পর্কে কিছু বলার আগে জেনে-বুঝে বলা উচিত । আমি ধরে নিতেই পারি যে, যানারা আদালতে মামলা করেছিলেন তানারা রায়দানের প্রতিলিপি হাতে পেয়েছেন এবং উকিল সাহেব সঠিক বিষয়টা বুঝিয়ে দিয়েছেন । অবশ্যই তানারা এই মামলায় প্রকৃতই জয়ী হয়েছেন।আমিও ব্যক্তিগত ভাবে এই রায়দান আন্তরিকতার সহিত সমর্থন করি । আর সর্বোচ্চ আদালত যে রায়দান করেছে তার একটা শব্দও শরিয়ত আইন বিরোধী নয় । আমি বিশ্বাস করি বেঞ্চের বিচারকগণ তালাক সম্পর্কিত শরিয়ত আইন সঠিকভাবে অধ্যয়ন করেই এই রায়দান করেছেন । তাহলে, এখন আমাদের জানা উচিত যে, সর্বোচ্চ আদালত কি রায় দান করেছে । আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালত রায়দান করেছে যে,—” তাৎক্ষণিক তিন তালাক প্রথা অসাংবিধানিক তাই সারাদেশে এই প্রথার উপরে ছয় মাসের জন্য স্থগিতাদেশ দেওয়া হচ্ছে এবং দেশের কেন্দ্র সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে যে, ছয় মাসের মধ্যে এই রায়ের পক্ষে সঠিক আইন প্রণয়ন করুক” । আমার মতে ঐ রায়ে অসাংবিধানিক শব্দের সাথে ” ও অমানবিক ” কথাটা যোগ করা উচিত ছিল । শরিয়ত আইনেও তাৎক্ষণিক তিন-তালাক প্রথা নিষিদ্ধ অর্থাৎ অবৈধ।   বেশ কিছুকাল আগে থেকেই অনেক ইসলামিক দেশেও তাৎক্ষণিক তিন তালাক প্রথা আইন করে বন্ধ করা হয়েছে।

এখন ভাবনার বিষয় হল যদি সর্বোচ্চ আদালতের রায়দান শরিয়ত আইনের বিপক্ষে না হয় তাহলে সারাদেশ জুড়ে এতো হল্লা-কলরব-উন্মাদনা আর তর্জা শুরু হওয়ার কারণ কি ?  এর প্রধান কারণ হল, হল্লা-হুজ্জুতি-কলরব সৃষ্টিকারীদের অজ্ঞতা এবং সত্যান্নেষনে, জানা-বোঝা-পড়া ও অধ্যয়নে চরম অনীহা । সবাই একই ক্ষুরে মাথা ন্যাড়া ক’রে বাজারে ঘুরছে । আর সারাবিশ্বের মুসলিমদের কথা বলতে গেলে একটা সত্য কথা স্বীকার করতেই হয় যে, সবচেয়ে নির্বোধ আর কম মস্তিষ্কের ধর্মীয় সম্প্রদায় হল মুসলমান।এর কারণ হল যে, সাধারণ মুসলিমরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তাদের মস্তিষ্কের চর্চার ব্যাপারে উদাসীন থেকে এক দল বাস্তব জ্ঞানহীন, অজ্ঞ, কুচক্রী ও নির্বোধ মোল্লাদের উপর নির্ভরশীল। অথচ তাদের জন্য চিরায়ত বিজ্ঞানময় ধর্ম গ্রন্থ আছে যা অধ্যয়ন ও গবেষণা করলে প্রকৃত সুন্দর ও জ্ঞানী মানুষ হতে পারে।ঐসব কাঠমোল্লারাই মুসলিমদের দিনদিন গোল্লায় নিয়ে যাচ্ছে । যানারা প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞানী তানারা এইসব কাঠমোল্লাদের নির্লজ্জতা ও দাপটের সামনে অহেতুক তর্ক-বিতর্কে আসেন না।

খুব সংক্ষিপ্ত আকারে তিন-তালাক সম্পর্কিত শরিয়ত আইনের নির্দেশগুলো দেখে নেওয়া যাক। যানারা বিস্তারিত জানতে চান তাঁদের জন্য উৎস নির্দেশ থাকবে বিশুদ্ধ ও চিরায়ত গ্রন্থ(কোরান ও হাদিস শরীফ) থেকে টিকা-টিপ্পনী ও ব্যাখ্যাসহ পড়ে নেবেন । বর্তমানে বাংলা, ইংরেজী, উর্দু সহ পৃথিবীর আধিকাংশ ভাষাতে গ্রন্থগুলো পাবেন। তবে আরবী ভাষা ঠিকভাবে শিখে আরবী ভাষাতে পড়লে সব চেয়ে ভাল।   কখনোই কোন কাঠমোল্লার লেখা বাজারি পাতি বই পড়বেন না । কোরান ও হাদিস শরীফে মুসলমান তথা মানুষের জীবন-যাপন ও জীবন বিধান সম্পর্কে যে নির্দেশগুলো আছে তাই হল শরিয়ত আইন । তালাক সম্পর্কে কোরানে ঘোষণা করা হয়েছে যে, “তালাক একটা জঘন্যতম বৈধ কাজ যাহা আল্লাহ খুবই অপছন্দ করেন “। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ(সা:) বলেছেন যে, তিনি তালাককে খুবই ঘৃণা করেন । তালাক তিন প্রকার হতে পারে ।

১মতঃ , কোন স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে । (আল কুরান, তালাক অধ্যায়, 1 নং আয়াত বা বাক্য ১)।

২য়তঃ , স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক দিতে পারে।( আল কুরান, আহযাব অধ্যায়, 28 ও 29 নং আয়াত; আল হাদীস, আবু দাউদ, ৩য় খন্ড ২২০০ নং, বুখারী শরীফ, ৯ম খন্ড ৪৮৮৪,৪৮৮৫ ও ৪৮৮৬ নং)।

৩য়তঃ ,  স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতে । (আল কুরান, বাকারা অধ্যায়, ২২৯–২৩১ নং আয়াত )।   তালাক দেবার শর্ত কি ? –স্ত্রী যদি কোন সুস্পষ্ট নির্লজ্জ কাজে লিপ্ত হয় এবং তা প্রমাণিত সত্য । যেমন ব্যভিচার, স্বামীর পিতামাতার উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা ইত্যাদি । তখন সেই স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে । স্ত্রীর ক্ষেত্রেও একই শর্ত প্রযোজ্য । তাছাড়া স্বামী যদি স্ত্রীর নূন্যতম ভরণপোষণ না করতে পারে বা শারীরিক ভাবে অক্ষম হয়ে যায় । এই রকম ক্ষেত্রে স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারে ( উৎস নির্দেশ আগে দেওয়া হয়েছে ) । তালাক দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি কি ? (১)  তালাক দেওয়া হল এই কথাটা স্বামী তার স্ত্রীকে শোনাবে তিন বার নির্দিষ্ট তিনটি সময়ে এবং কমপক্ষে দুজনের উপস্থিতিতে যারা হবে সেই ঘটনার সাক্ষী । মেয়েদের চারটি রজঃস্রাব (মেন্সটুরেশন) এর মধ্যবর্তী যে তিনটি রজঃরহিত(মুক্ত) সময়কাল পাওয়া যাবে সেই অবস্থায় একবার করে মোট তিনবার তালাক দিতে হবে এবং প্রত্যেক বার দুজন সাক্ষী থাকবে । (২)  নাবালিকা বধূ হলে, যার রজঃচক্র শুরু হয়নি তার ক্ষেত্রে প্রতি মাসে একবার করে তিন মাসে তিনবার তালাক দিতে হবে সাক্ষীর উপস্থিতিতে । (৩) গর্ভবতী মহিলার ক্ষেত্রে শেষ তালাক প্রসব হওয়ার পর দিতে হবে এবং তিন তালাকে একমাস করে মোট কমপক্ষে তিনমাস সময়কাল হতে হবে । সাক্ষী অবশ্যই সবক্ষেত্রেই লাগবে । (৪)  তালাকের সময় স্ত্রীকে দেওয়া কোন উপহার বা সম্পত্তি জোর ক’রে কেড়ে নেওয়া যাবে না ।(৫)  তৃতীয় তালাক দেওয়ার আগের সময় পর্যন্ত যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সদ্ভাব হয় তখন তারা আগের মতো একসাথে বসবাস করতে পারবে এবং সেক্ষেত্রে তালাক হবে না। (৬)  তিন তালাক সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর কোন ভাবেই একসাথে বসবাস করা বৈধ নয় । যদি তারা পুনরায় সংশোধিত হয়ে একসাথে সংসার করার ইচ্ছে করে তাহলে সেই নারীকে তালাকের পর তিনমাস অপেক্ষা করতে হবে এবং তারপর অন্য একজন পুরুষকে বিবাহ করতে হবে । এই দ্বিতীয় স্বামীর সাথে কমপক্ষে একবার সহবাস করতে হবে।   তারপর রীতিমত তিন তালাক নিতে হবে । এই তালাকের তিন মাস পর পুনরায় প্রথম স্বামীকে বিবাহ করলে তবেই একসাথে থাকা যাবে ( আল কুরান, তালাক অধ্যায়, ২,৩ ও ৪ নং আয়াত, বাকারা অধ্যায়, ২২৮ থেকে ২৩১ নং আয়াত )।

সঠিক তথ্য ও পর্যালোচনায় একথা স্পষ্ট যে, তাৎক্ষণিক তিন-তালাক কোরানের নির্দেশ অনুসারে সম্পূর্ণ অবৈধ। তাই শরিয়ত আইনেও তাৎক্ষণিক তিন-তালাক নিষিদ্ধ । কিছু অমানবিক লোক যারা শুধু নামধারী মেকী মুসলিম তারা তিন তালাক প্রথার অপব্যবহার করে চলেছে । আর সেই অপব্যবহার কে মান্যতা দিয়ে চলেছে তত্ত্বজ্ঞানহীন নির্বোধ কাঠমোল্লারা।অবিলম্বে এই অমানবিক প্রথা বন্ধ হওয়া উচিত। তালাকের যে প্রকৃত পদ্ধতি ও ব্যবস্থা তা নারী সমাজের প্রতি ক্ষতিকর বলে আমার মনে হয় না ।

সামসুল হক

সামসুল হক

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *