রোহিঙ্গা গনহত্যার শেষ কোথায় ???? লিখেছেন- সিজাতা ভৌমিক মণ্ডল

398057বাংলাদেশের উদ্দশ্যে ছোট ছোট ডিঙিতে সমুদ্রে ভাসতে থাকা সেই মানুষগুলোই রোহিঙ্গা।আসলে রোহিঙ্গারা কারা, তাদের পরিচয় বা কি? মায়ানমারে তাদের সংকট কি সাময়িক? মায়নামারে তারা কি তাদের ভুমি খুঁজে পাবে নাকি অনন্ত কাল এই ভাবেই ঠাঁই নাড়া হয়ে ভাসতে হবে রোহিঙ্গাদের?

নবম-দশম শতাব্দীতে আরাকান রাজ্য ‘রোহান’ কিংবা ‘রোহাঙ’ নামে পরিচিত ছিল, সেই অঞ্চলের অধিবাসী হিসেবেই ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের উদ্ভব। ঠিক কবে থেকে এই শব্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তা জানা যায় না। মায়ানমার সরকার ‘রোহিঙ্গা’ বলে কোনো শব্দের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। রোহিঙ্গারা পূর্বতন বর্মা, অধুনা মিয়ানমারের পশ্চিম অঞ্চলের মুসলমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।  মায়ানমারের সামরিক জান্তা ও উগ্র রাখাইনদের সাম্প্রদায়িক আক্রমণ ও এথনিক ক্লিনজিংয়ের শিকার হয়ে প্রায় ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গা মায়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

অনেক রোহিঙ্গা নেতা দাবি করেন, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে তাঁদের পূর্বপুরুষরা আরাকানে বসতি গেড়েছিলেন। তাঁরা মনে করেন, সপ্তম শতকে আসা পার্সিয়ান বণিকদের মাধ্যমে এখানে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয় এবং পরবর্তী সময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মুসলমানরাও ধীরে ধীরে এখানে রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত  হয়ে পড়ে।১৫৮৬ সাল নাগাদ, ব্রিটিশ পর্যটক রালফ ফ্লিচ এই এলাকাকে বর্ণনা করেছেন ‘রোকন’ নামে।স্পষ্টতই বোঝা যায়, এই এলাকায় একসময় মুসলমানদের শক্ত রাজনৈতিক প্রভাব ছিল।আরাকান বা অধুনা উত্তর রাখাইন প্রদেশের ভূমিপুত্র হিসেবে দাবিদার বর্তমান রাখাইনদের তুলনায় মুসলমানরা এই অঞ্চলে খুব বেশি দেরিতে আসেননি।৯৫৭ সাল নাগাদ মোঙ্গলদের সময় এই অঞ্চলে রাখাইনরা বসতি স্থাপন করে।১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগের সময় রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ আরাকান রাজ্যকে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে নিয়ে আসার চেষ্টা করে।এ নিয়ে জিন্নাহর সঙ্গে যোগাযোগ করেন রোহিঙ্গা নেতারা।রোহিঙ্গারা একটি বড় সশস্ত্র গ্রুপও তৈরি করে এবং মংদু ও বুথিধাং এলাকাকে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে উদ্যোগ নেয়।অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, রোহিঙ্গাদের এই উদ্যোগ ছিল আত্মঘাতী এবং মায়ানমারে বৈষম্যের শিকার হওয়ার পেছনে এটি একটি বড় কারণ।মায়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সেই সময় থেকে রোহিঙ্গা উদ্যোগকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত করে এসেছে।

১৯৬২ সালে মায়ানমারে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে ধীরে ধীরে রোহিঙ্গাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্য উওরোওর বাড়তে থাকে।১৯৭০ সালের পর থেকে সেনাবাহিনীতে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী থেকে নিয়োগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর আগে থেকে সরকারি চাকরিতে থাকা রোহিঙ্গারা ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হতে শুরু করে। ১৫ইঅক্টোবর ১৯৮২ সালে মায়ানমারের সামরিক জান্তা নাগরিকত্ব আইন প্রকাশ করে। এই আইনে মায়ানমারে তিন ধরনের নাগরিকত্বের বিধান রাখা হয়– পূর্ণাঙ্গ, সহযোগী এবং অভিবাসী। এই নতুন আইনে বলা হয়,১৮২৩ সালে মায়ানমারে ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার পূর্ববর্তী সময়ে মায়ানমারে বাস করা ১৩৫টি গোত্রভুক্ত মানুষই মায়ানমারের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে গণ্য হয় কিন্তু রোহিঙ্গারা চিহ্নিত হয়  গোত্রহীন  হিসেবে।অস্বীকার করে সামরিক সরকার তাদের নাগরিকত্ব। তারা দাবি করে  এই জনগোষ্ঠী আদতে পূর্ব বাংলা থেকে আসা অবৈধ জনগোষ্ঠী, যারা ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরবর্তী মায়ানমারে আশ্রয় নিয়েছে।

১৯৮৯ সাল থেকে মায়ানমার তিন ধরনের নাগরিক কার্ডের প্রচলন করে। পূর্ণাঙ্গ নাগরিকদের জন্য গোলাপি, সহযোগী নাগরিকদের জন্য নীল এবং অভিযোজিত নাগরিকদের জন্য সবুজ রঙের কার্ড দেওয়া হয়।চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পড়াশোনা-চিকিৎসাসেবা সহ সব ধরনের কাজকর্মে এই কার্ডের ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের কোনো ধরনের কার্ড দেওয়া হয় না। জান্তা, রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করে, আর তাই ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত। এসব রোহিঙ্গাকে রাখা হয়েছে কারাগারে। না, আট লাখি রোহিঙ্গাকে বন্দির  বড় কারাগার মায়ানমার নেই তাই রোহিঙ্গারা নিজ গ্রামেই পরবাসী বন্দি। অন্য কোনো অঞ্চলে যাওয়ার কথা তো দূর, পাশের গ্রামে যাওয়ারও কোনো অনুমতি নেই।

১৯৯০সালে আরাকান রাজ্যে স্থানীয় আইন জারি করা হয়। আইনটিতে উত্তর আরাকানে বাস করা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই আইন অনুযায়ী এই অঞ্চলে বাস করা রোহিঙ্গাদের বিয়ের আগে সরকারি অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এই অনুমোদনের দায়িত্বে রয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকা। সাধারণত বিয়ের অনুমোদন পাওয়া খুবই কঠিন।  রোহিঙ্গাদের পক্ষে বৈধভাবে বিয়ে করার হার খুবই কম। রোহিঙ্গারা নিজ গোষ্ঠীর বাইরে বিয়ে করতে পারে না। যদিও মায়ানমারে এ রকম কোনো রাষ্ট্রীয় আইন নেই, তবু রোহিঙ্গারা নিজেদের বাইরে স্থানীয় কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন আইনের ফাঁকে ফেলে ১০ বছর পর্যন্ত জেল দেওয়ার নজির আছে।

২০১০ সালে নাসাকা বাহিনী পুনর্গঠন করা হয়। এ সময় দীর্ঘদিন বিয়ে সংক্রান্ত আবেদন গ্রহণ করা বন্ধ করে দেয় নাসাকা। পরের বছর যখন আবার আবেদন গ্রহণ চালু হয়, তখন নিয়মকে করা হয় আরো কঠোর। তখন থেকে আবেদনের সঙ্গে নবদম্পতিকে মুচলেকা দিয়ে বলতে হয় যে এই দম্পতি দুইয়ের অধিক সন্তান নেবে না।

নুন্যতম শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের পরিসেব পাওয়া থেকেও বঞ্চিত রোহিঙ্গারা। সাধারণত আমরা জানি বৌদ্ধধর্মাবল্মীরা শান্ত,সৎ এবং অহিংসার অধিকারী। কিন্তু মায়নামারে এ ঘটনা সম্পুর্ণ বিপরীত। কি ভাবে একটা জাতিকে জন্তুবৎ আচরণ করে তিলে তিলে শেষ করে দেওয়া যায় তা রোহিঙ্গাদের দেখেই আজ বিশ্ববাসী উপলব্ধি করছে। জাতিপুঞ্জের মানবিক অবস্থানের দিকে তাকিয়ে আমরা। কেউ কেউ মনে করে রোহিঙ্গারা বেইমান- চোর- লম্পট- সন্ত্রাসবাদী।আজ মানবতার দরবারে একটাই প্রশ্ন, ভুখা পেটের মিছিলে এক থলি টাকা আর আগ্নেয়অস্ত্র দুটোই তো সমান মুল্যের- না কি? বহিরাগত বা জবরদখলকারী, যে নামেই অভিহিত কর না কেন আসলে তো প্রাণ ! তারাতো সর্হশক্তিমান ঈশ্বরেরই সৃষ্টি। আজ আধুনিক মনস্ক সুশিক্ষিত মানবজাতির কাছে প্রশ্ন, রোহিঙ্গারা গোবাদির পশুর ন্যায় আর কতদিন অত্যাচারিত হবে।স্বাধীন বর্মায় রোহিঙ্গারা বৈষম্যের শিকার, মায়ানমারের উচিত দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করা। একটি দেশের মধ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী বাস করে আসা বড় একটি জনগোষ্ঠী নাগরিকত্ববিহীন থাকতে পারে না। পৃথিবীর সব মানুষেরই একটি দেশ পাওয়া জন্মগত অধিকার। মায়ানমারের সেনাশাসকরা গায়ের জোরে সেই অধিকার অস্বীকার করবেন, সেটি চলতে পারে না। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব যদি দেওয়া না যায়, তা হলে আগামী দিনের ইতিহাসে একালের বিশ্ব নেতৃত্বকে প্রশ্নের মুখেই পড়তে হবে।
মুল্যায়ন সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত- মতামত আপনাদের। চলুক খোলা মনে আলোচনা। আপনারা কি বলেন??

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *