“রোহিঙ্গাদের অধিকার”,

ARAKAN-MUSLIM-05আচ্ছা, অনুপ্রবেশকারী কাদের বলে? অন্যের ভূখণ্ডে বাইরে থেকে যারা হঠাত বিনা অনুমতিতে উড়ে এসে জুড়ে বসে তাদের বলা হয়। আরও বিষদে ব্যাখ্যা দেওয়া যায় কিন্ত মোটামুটি সারকথা এই। প্রায় ২২হাজার বর্গমাইল জোড়া আরাকানে ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল অবধি রোহিঙ্গারা স্বাধীনভাবে বসবাস করছিলো।উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজা বোডাওফারা বৌদ্ধ ধর্মের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে নির্মম অত্যাচারের পরোয়ানা লিখে দেয় রোহিঙ্গাদের কপালে।

পরে যখন দেশটি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চলে যায় তখনও রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিপীড়ন অব্যাহত ছিল।বেড়ে গিয়েছিল বললে অত্যুক্তি করা হবে না। ব্রিটিশরা মায়ানমারের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর যে তালিকা তৈরি করে তার থেকে প্রথমেই রোহিঙ্গাদের বাদ দেয়।এর অর্থ, রোহিঙ্গাদের জাতি হিসাবে স্বীকৃতির বিলুপ্তি। অথচ দীর্ঘকাল ধরে তারা ঐ অঞ্চলেরই বাসিন্দা। ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পরে পরেই ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে মুক্ত হয় মায়ানমার। কিন্তু রোহিঙ্গারা অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পায়নি। স্বাধীন মায়ানমার সরকার ব্রিটিশদের বানানো তালিকা অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের সার্বিকভাবে ‘বহিরাগত ও সন্ত্রাসবাদী বলে ঘোষণা করে। শুরু হয় নাগরিকত্বের অধিকার কেড়ে নেওয়ার পালা।তার পরেই  রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসে সরকার স্বীকৃত নির্মম অত্যাচার ও গনহত্যা।আবালবৃদ্ধ বনিতা সমেত গর্ভবতী মহিলারাও রেহাই পায়নি সরকারি অত্যাচারের কবল থেকে।

জাতিসংঘ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, আসিয়ান ও আইসি সহ সকল সংগঠন মায়ানমার সরকার দ্বারা সংগঠিত রোহিঙ্গাদের ওপর গনহত্যার প্রতিবাদ করেছে।নির্মম অত্যাচার বন্ধের দাবি রেখেছে। ভালো কথা, কিন্তু সকলে কেন একযোগে মায়ানমার সরকারকে প্রশ্ন করছে না,    রোহিঙ্গা মুসলমানরা কি মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে আকাশ থেকে পড়েছে না মাটি ভেদ করে বেরিয়ে এসেছে? কেন প্রশ্ন করছে না প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদেরকে কেন নাগরিকত্ব  অস্বীকার করা হচ্ছে? নাগরিকত্বের অধিকার অর্জন করতে গিয়ে গুলি ‍করে হত্যা, ধর্ষণ ও লুঠ করে স্বদেশ ত্যাগে বাধ্য করছে? মায়ানমারের আরাকান রাজ্য রোহিঙ্গাদের স্বদেশ ভূমি তাই এত নারকিয় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পরেও তারা মাটি কামড়ে পড়ে আছে।

কিন্তু বার্মিজরা রোহিঙ্গাদের বার্মিজ ভাবতে নারাজ। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চরম বর্নবিদ্বেষ ও জাতিবিদ্বেষ পুষে রেখেছে বার্মিজরা। রোহিঙ্গা বিদ্বেষী বার্মিজরা মনেপ্রানে বিশ্বাস করে, ওদের গায়ের রং আমাদের মতো ফর্সা ও কোমল নয়।ওদের দানবের মতো দেখতে।ওরা আমাদের ভাষা বলতে ও লিখতে জানে না।আমাদের ধর্ম এক নয়। তাই রোহিঙ্গারা আমাদের কেউ নয়,ওদের নাগরিকত্ব দাবী করার কোনও অধিকার নেই। ওদের চলে যেতেই হবে। বার্মিজদের এই বক্তব্য থেকে চূড়ান্ত বর্নবিদ্বেষ ও জাতিবিদ্বেষ প্রমানিত হয়। অভিমতগুলি, ২০০৯ সালে প্রকাশিত কিছু বিদেশী পত্র পত্রিকায় রোহিঙ্গা নিকেশ অভিযানে কিছু বড় নেতার সাক্ষাৎকার থেকে জানতে পারা যায়।

ব্রিটিশরা ভয়ঙ্কর জাতি। নিজেরা ঠিক থেকেছে কিন্তু অর্ধেক পৃথিবী শাসন করেছে জাত,ধর্ম ও বর্ণ বিভাজনের পন্থায়।সকলকে সকলের থেকে আলাদা করো আর রাজ করো। মায়ানমার কি করে এই ব্রিটিশ পলিসির বাইরে যাবে?রাজা বোডাওফারার সময় থেকেই শুরু হয়েছিল বার্মিজদের রোহিঙ্গা বিদ্বেষ।সেটার বুনিয়াদে শিলমোহর লাগায় ব্রিটিশ।

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে ভারত পাকিস্থানের সৃষ্টি হয়েছিল।কিন্তু ভারতে যেমন শুধু হিন্দুরা নয়, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধরাও বসবাস করে।পাকিস্থানেও শুধু মুসলমান নয়, হিন্দু,খ্রিস্টান,বৌদ্ধরা বসবাস করে।অর্থাৎ দুটি রাষ্ট্রের বিভাজন জাতিতত্বের ভিত্তিতে হোল কিন্তু স্ব স্ব রাষ্ট্রে অবস্থানকারী সব জনগোষ্ঠী সেই রাষ্ট্রের নাগরিকত্বের অধিকার পেল।১৯৪৮ সালে মায়ানমার ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।তাহলে বংশ পরম্পরায় বসবাসকারী রোহিঙ্গারা কেন মায়ানমারে নাগরিকত্ব পেল না? মানছি, নাগরিকত্ব নির্ধারণের জন্য যে কোন দেশ-রাষ্ট্রের নিজস্ব আইন থাকে কিন্তু পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনও তো আছে।কোনও দেশ যখন পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীনতা লাভ করে, তখন স্বাধীনতা পূর্ব  বসবাসকারী সমস্ত জনগোষ্ঠীকে সেই দেশ নাগরিক স্বীকৃতি দিতে বাধ্য। তারা যেকোনও জাতিগোষ্ঠীর হতে পারে। আমার অবাক লাগছে জাতিসংঘ কেন এই সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভুমিকা নিচ্ছে না।

১৯৭০ থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর যে ক্রমাগত আক্রমণ চলে আসছে।যত দিন গত হয়েছে পরিস্থিতি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের ধরন বদলেছে। যেমন বর্তমান বিশ্বে ইসলাম ফোবিয়ার তুল্য দ্বিতীয় ফোবিয়া নেই।যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে সমস্থ ধর্মীয় মৌলবাদের তীব্র বিপক্ষে।মায়ানমার সরকার তাই এই ফোবিয়ার আশ্রয় নিয়ে এখন রোহিঙ্গাদের গায়ে ইসলাম ফোবিয়ার ট্যাগ লাগিয়ে দিয়ে জাতিগত মুক্তির আন্দোলনকে ‘ইসলাম জেহাদ’ বলে প্রচার করে চলেছে। মায়ানমার সরকার একদিকে রোহিঙ্গাদের বাঁচার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে , অন্যদিকে তাদের এই বেঁচে থাকার লড়াইকে ইসলামিক সন্ত্রাস বলে দাগিয়ে দিয়ে বিরাট জনসমর্থন আদায়ের ষড়যন্ত্র  করছে।
বার্মিজ সেনাবাহিনি শিশু, বৃদ্ধ কারো প্রতি কোনো প্রকার দয়া দেখায়নি। প্রায় প্রতিটি রোহিঙ্গা নারীকেই কোনো না কোনো ভাবে যৌন হেনস্থা করা হয়েছে।বৌদ্ধ মুসলমানের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা শতাব্দী প্রাচীন বিদ্বেষকে মুসলিম জেহাদি আখ্যা দিয়ে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে মায়ানমার সরকার।

কোনও শিশু তার জন্মলগ্ন থেকেই অপরাধী মানসিকতা নিয়ে জন্মায় না। পেটের দায়ে আজ রোহিঙ্গারা  মাদক ব্যবসা, পতিতাবৃত্তি  ইত্যাদিতে সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছে। শতাব্দী পর শতাব্দী ধরে চলা রোহিঙ্গাদের ওপর বঞ্চনা,শিক্ষার অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া ইত্যাদি কারনে রোহিঙ্গাদের ধর্মান্ধতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।এই পরিনতিতে কি করে আশা করা যায় যে তারা সৎ পথে উপার্জন করবে?এর জন্য দায়ী একমাত্র মায়ানমার সরকার।

২০১৬ সালে মায়ানমারে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি ক্ষমতায় আসে। অং সাং সু কি ক্ষমতায় আসার পর আসা করা গেছিল যে এবার রোহিঙ্গাদের অবস্থা কিছুটা হলেও বদলাবে। কিন্তু নোবেলজয়ী মানবতাবাদী নেত্রী যখন সাম্রাজ্যবাদীদের সুরেই সুর মিলিয়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশকারী  ও সন্ত্রাসী বলে তাদের বার্মা ছাড়তে আদেশ দেয় তখনই রোহিঙ্গাদের কবর খোঁড়া হয়ে যায়। বেঁচে থাকার জন্য নিজেদের রাস্তা খুঁজে নিতে বাধ্য হয় রোহিঙ্গারা।জানার পর অবাক হলাম, ভারত ও বাংলাদেশ বর্ডারে আশ্রয় নিতে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা কম। মহিলাদের সাথে কথা বলে জানা গেলো যে তাদের স্বামী, সন্তান, ভাইয়েরা মায়ানমারেই থেকে গেছে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য। নিজেদের বিলুপ্তিকে রক্ষা করতে রোহিঙ্গারা পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেছে। রোহিঙ্গাদের পাল্টা হামলায় বহু বার্মিজ সেনার মৃত্যু হয়েছে।যদিও এটা বার্মিজ সেনাদের সন্ত্রাসের তুলনায় নস্যি। তবুও বলছি, বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের বঞ্চনার বিষয়টি আগে পরিকল্পিতভাবে তুলে ধরা   উচিত  ছিল। সেটা না করে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন কর্তৃক আরাকান রাজ্য প্রতিষ্ঠার নামে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসের পথ বেছে নেওয়াটাকেও  সমর্থন করা না। বিশ্ববাসীকে জানানোর প্রয়োজন ছিল, রোহিঙ্গারা শুধুমাত্র মুসলমান জনগোষ্ঠী নয়। হিন্দু রোহিঙ্গারাও নির্মম অত্যাচারের শিকার হচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির স্বার্থে বিশ্বের বড় দেশগুলো কেউই আজ বিশেষভাবে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়ে মায়ানমার সরকারের বিরাগভাজন হতে চাইছে না।চিন, রাশিয়া, ব্রিটেন, আমেরিকা, ভারত সকলেই। কারন, মায়ানমারের বন্দর ও মাটির তলায় সঞ্চিত প্রকৃতির অতুল সম্পদকে কেউ হাতছাড়া করতে চাইছে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রোহিঙ্গাদের পুশ ব্যাকের কথা বলে দিয়েছে। প্রতিদিনই ভারত বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের লুকোচুরি খেলা চলছে।

ভারত ও বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠন রয়েছে। আমার ভয়, নিঃস্ব,আশ্রয়হারা রোহিঙ্গারা এদের কবলে না পড়ে যায়। যদি পড়ে যায় তাহলে এই রোহিঙ্গারাই একদিন ধর্মীয় মৌলবাদীদের  শক্তিশালী মোহরার কাজ করবে। যা ভয়ঙ্কর হতে পারে আগামীদিনে।

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *