‘রক্তে ভেসে গেল গনতন্ত্রের বেদিমুল’, দেবাশীষ পাইন।

image-80989১৪/৫/১৮ তারিখ পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত ভোট হয়ে গেল।নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী দলের নানা চাপানউতরের সাক্ষী থাকল বঙ্গবাসী।পরিচয় হোল মেরুদণ্ডহীন, বুকে হাঁটা সরীসৃপ রাজ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে।অধিকাংশ ভারতবাসীর একসময় নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা রাখত না।জনসাধারন ভাবত নির্বাচন কমিশন শুধুই নির্বাচন পরিচালনা করে এবং অবশ্যই শাসক সরকারের ধামাধরা হয়ে।স্বশাসিত এই সংস্থার সাংবিধানিক অধিকার ও ক্ষমতা সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষ অজ্ঞাত ছিল দীর্ঘসময় ধরে।

তারপর একদিন নির্বাচন কমিশনের প্রধান হয়ে এলেন বড়সড় চেহারার এক দক্ষিনী ব্রাম্ভন। নাম টি এন সেশন। নড়েচড়ে বসলেন সকলে। কারন তিনি এসেই সকলের লালিত ধারনার গোড়ামুল ধরে ঝাঁকুনি দিয়েছেন।গনদেবতা জানলো কমিশনের সাংবিধানিক অধিকার ও ক্ষমতা সম্পর্কে। জানলো, স্বাধীন ভারত তাকে কতটা অধিকার দিয়েছে। ভোট দানের গুরুত্ব কি এবং কোথায় জানার পর আজ বেশিরভাগ মানুষ ভোটকেন্দ্র মুখি।ভোটের দিন আর আজ শুধুমাত্র ছুটির দিন নয়।

কিন্তু মুশকিলে পড়লো তারা, যারা এতদিন রাজনিতির অ্যারিথমেটিকের খেলায় অভ্যস্থ হয়ে পড়েছিল। বিডিও থেকে ডিএম।থানার আইসি থেকে ডিজি। সকলের সে এক দিশেহারা অবস্থা হয়েছিল। রাজনিতির ঠিকাদাররা অনেক নিয়ম কানুনের মধ্যে আসতে বাধ্য হোল। গনতন্ত্রের চরাপড়া নদীতে জলস্রোত এলো। মরচেপড়া, ঘুণধরা সিস্টেমের খোলনালছে বদলে গেল।

আরেক লৌহমানবির সঙ্গে বঙ্গবাসীর পরিচয় হয়েছিল। সেশানের পদাঙ্ক অনুসরণকারী – মিরা পাণ্ডে।মাঝে অনেকেই বাম জমানায় এসেছিল কিন্তু সকলেই ঘুটনো টেকে দিয়েছিল শাসকের সামনে। মিরা পাণ্ডের পর যিনি রাজ্য নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি অন্তত আর যাই হোক আত্মসমর্পণ করেন নি।চেয়ারের গরিমা ও দায়িত্ব বুঝতেন তাই শাসকের সামনে নৈতিকতা বিসর্জন না দিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন।

বর্তমান রাজ্য নির্বাচন কমিশনার অমরেন্দ্র নাথ সিংয়ের সঙ্গে দুবার সাক্ষাত করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সৌভাগ্য না বলে দুর্ভাগ্য বলাই যথাযথ হবে। ব্যক্তিগত জীবনে যৎকিঞ্চিত প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করার সুযোগ হয়েছে। প্রত্যেকেই কমবেশি তাদের ব্যাক্তিত্ব, প্রশাসনিক দক্ষতা ও নৈতিকতার ছাপ রেখে গেছেন আমার মনে। অমরেন্দ্র নাথের সঙ্গে সাক্ষাত হওয়ার পর মানুষটিকে বড্ড ক্লিব মনে হয়েছিল আমার।মানুষটির মধ্যে, সিদ্ধান্তে দৃঢ়তার কোনও ছিটেফোঁটা লক্ষণ দেখতে পাইনি।স্ফিত কলেবর সেশানেরও ছিল কিন্তু তার টানটান ব্যক্তিত্ব কখনো অপরকে মুখে হাত চাপাদিয়ে হাসি লুকোবার সুযোগ দিতো না।নির্বাচন বিধি লাগু করতে গিয়ে বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদদের সঙ্গে পাঙ্গা নিয়েছেন। দেশের আইন ও সংবিধানের প্রতি সেশানের অটল আস্থা ছিল। তাই  বারবার আদালতে লড়াই করে ছিনিয়ে নিয়ে এসেছিলেন তার সংবিধান স্বীকৃত অধিকার। আর অমরেন্দ্র নাথকে আদালতে একাধিকবার ধিকৃত হতে হয়েছে তার অযোগ্যতার জন্য। কড়া সমালোচনার কোনও সদুত্তর দিতে পারেন নি আদালতকে।

পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রারম্ভিক পর্ব থেকে লক্ষ করা গেছে কমিশনের শাসক দলের অঙ্গুলিহেলনে চলার প্রবনতা।নির্বাচনী নির্ঘণ্ট প্রকাশ হওয়ার পর বিশেষ কিছু প্রশাসনিক ক্ষমতা সাময়িকভাবে হস্তান্তরিত হয় কমিশনের হাতে। সেই ক্ষমতার নুন্যতম প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছে এই কমিশন।ফলত বিরোধী দল তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, নির্বাচনে অংশগ্রহনে ইছুক ক্যান্ডিডেটকে কিছু নির্দিষ্ট অধিকার দেওয়া হয়েছে যা সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়া থেকে ফল ঘোষণা পর্যন্ত ।ক্যান্ডিডেটের গনতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত করা এবং নিরাপত্তা দেওয়া কমিশনের দায়িত্ব। এই পঞ্চায়েত নির্বাচনে কমিশন যা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার সময় থেকে লাগামছাড়া সন্ত্রাস দমনে অসমর্থ কমিশন অপদার্থতার নজির গড়েছে।কমিশন কর্তৃক নেওয়া সকালের সিদ্ধান্ত রাতের অন্ধকারে কোন পদ্ধতিতে বদলে যায় সেটা আদালতকেও বিস্মিত করেছে।প্রায় দু কোটি মানুষ কেন তাদের ভোট দেওয়ার গনতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হোল এর উত্তর কমিশন আদালতকে দিতে পারেনি। গনতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবীতে বিরোধীরা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছে। কমিশনের কাছে দরবার করেছে। কিন্তু সব প্রচেষ্টা যখন নিস্ফল হয়েছে তখন সুবিচারের আশায় বিরোধীরা বাধ্য হয়েছে আদালতের দ্বারস্থ হতে।

এই প্রতিবেদন যখন লিখছি সেই মুহূর্ত পর্যন্ত ১৮ জন নির্বাচনের দিনে হত্যা হয়েছে। জানিনা কাল সকালের সংবাদে আরও কত লাশ সংযোজিত হবে। এই পরিস্থিতি কি সত্যি অভিপ্রেত ছিল ! এই মায়ের কোল, স্ত্রীর কোল খালি হওয়া, ছেলে- মেয়েদের অনাথ হওয়ার হাত থেকে কি বাঁচানো যেতো না?? আমি বিশ্বাস করি অবশ্যই যেতো যদি কমিশন শুরু থেকে পরিস্থিতি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রন করত। কীসের ভয় আর কোন লোভের বশে চাকরি জীবনের উপান্তে এসে এই কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিলেন। জীবনে হয়তো সিস্টেমের সঙ্গে অনেক সমঝোতা করতে হয়েছে। মনের সব গ্লানি মুছে যেতো যদি ক্যারিয়ারের শেষে প্রান্তে এসে একটু সাহসী হতে পারতেন। ইতিহাস মনে রাখত। স্ত্রী, ছেলে- মেয়ের চোখে বীরের মর্যাদা পেতেন।

আর দিদি, বলিহারি যাই আপনি। মেঠো বক্তব্য রাখেন মেনে নিয়েছি। ভুল শ্লোক আওরান মেনে নিয়েছি। ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যের ফুলঝুরি, মেনে নিয়েছি।নব্বই শতাংশ কাজ শেষ এটা শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মিথ্যা তাও মেনে নিয়েছি। কিন্তু আশ্চর্য হচ্ছি, নিজে মেয়ে হয়ে মায়ের কোল খালি করার খেলায় মাতলেন ! উন্নয়ন করে থাকলে সন্ত্রাস করতে হবে কেন।মানুষ হই হই করে জিতিয়ে দেবে।কাকে ভয় পাচ্ছেন যে এমন ধারা সর্বনাশা রক্তের হোলি খেলায় মাতলেন? নাহয়, বিরোধীদের প্রাপ্য  সন্মান দিয়ে ভোট করতে দিতেন। আপনি তো জানেন জিতবেন, তাহলে? বিরোধীদের ভোট করতে দিলে আপনার মুখ আর মনের যে দূরত্বের বদনাম তা কিছুটা হলেও ঘুচতো। কারন আপনি ৩৪ বছরের বাম সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্রিগেডে মৃত্যু ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন। বিরোধীদের গনতান্ত্রিক অধিকারের দাবীতে একসময় পথ গরম করতেন আর আমরাও খোঁটায় বাঁধা ছাগশিশুর লাফাতাম।আজ যারা টিএমসি করে- সেই ট্রাডিসন সমানে চলছে। বাম সন্ত্রাসের ফেলে যাওয়া ছেঁড়া চটিতে আপনিও পা গলাবেন সেটা কি আর জানতাম। জানলে মিছিলে পা না মিলিয়ে আঁতুড়েই নুন খাইয়ে দিতাম।

সেদিন অনিল বিশ্বাসরা সন্ত্রাস হয়নি, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে বলে সাফাই গাইতেন আজ পার্থ বাবু গান। এযেন এস অয়াজেদ আলির লেখা ভারতবর্ষ গল্পের পটভূমি।

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *