মমতা কেন্দ্রীয় রাজনীতির পাদপ্রদীপে,তার তলায় অন্ধকার-অবাধে চলছে পশ্চিমবঙ্গে শিশু বাণিজ্য চক্র।

WestBengal-crime-branch-arrests-eight-for-25-newborn-trafficking-in-biscuit-containers-across-three-years-indialivetoday_9108ecd6-b6ef-11e6-9e9f-b6ef7e3508e0

বিদেশে এক-একজনের দাম ভারতীয় মুদ্রায় ছয়-সাত লাখ টাকা। ফর্সা ছেলেশিশু হলে দাম সব চেয়ে বেশি। তার পর দাম বেশি ফর্সা মেয়েশিশুর। কালো বা শ্যামলা রংয়ের হলে ছেলে-মেয়ের দাম একটু কম। এই দামেই কলকাতা ও আশপাশের কয়েকটি নার্সিংহোম থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুদের বিক্রি করা হতো।অবাধে চলছিল এই পাচার চক্র,একদম প্রশাসনের নাকের দগায়।এই পাচার চক্রের কারবারিদের জাল সীমান্ত পেরিয়েও বৃস্তিত ছিল।সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া এই শিশুদের বাংলাদেশের এনে পাসপোর্ট তৈরি করে বিক্রি করা হতো বিদেশে।

শুরুতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের অপরাধ দমন শাখা (সিআইডি) এই চক্রের সন্ধান পায় উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়ায়।ঘটনায়  মছলন্দপুরের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নাম উঠে আসে। তদন্তে  গোয়েন্দারা জানতে পারেন, খাস কলকাতার কয়েকটি নার্সিংহোম ও কয়েকজন চিকিৎসকও এই শিশু পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত।

পুলিশ কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তের ঠাকুরপুকুরে এক মানসিক প্রতিবন্ধীদের একটি হোম থেকে ১০টি ১০ মাসের শিশুকে উদ্ধার করে। মছলন্দপুরের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অফিসের পেছনে খোলা জায়গায় মাটি খুঁড়ে মিলেছে দুটি শিশুর দেহাবশেষ ও হাড়গোড়। এর আগে বাদুড়িয়ার একটি নার্সিংহোম থেকে তিনটি শিশু উদ্ধার করা হয়।

শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা দেশের মধ্যে নয়, সদ্যোজাতদের বিক্রি করে দেওয়া হতো বিদেশেও। শিশু বিক্রির আস্তানাগুলোর অন্যতম কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের শ্রীকৃষ্ণ নার্সিংহোম।এই নার্সিং হোমের কর্ণধার পার্থ চট্টোপাধ্যায় কলেজ ষ্ট্রীট ব্যবসায়ী সমিতির।ব্যবসায়ী সংগঠনটি সরাসরি তৃনমূলের শ্রমিক সংগঠনের সাথে যুক্ত না থকলেও, তবে মদতপুষ্ট।এই পার্থ বাবুর  কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে প্রচুর বিদেশি মুদ্রা। ২০০০ ইউরো, ১০৬০ মার্কিন ডলার, ২০০ হংকং ডলার, ১০ গ্রাম ওজনের ১০টি সোনার কয়েন এবং লক্ষাধিক টাকার গয়না।সিআইডির শীর্ষ কর্মকর্তা, অতিরিক্ত ডিরেক্টর জেনারেল রাজেশ কুমারের জবানীতে, ‘পার্থ চট্টোপাধ্যায় শিশু বিক্রি করেই ওই আয় করেছিলেন।’ তার বক্তব্য, ‘আরও কয়েকটি নার্সিংহোম ও লোকজনের নাম এই ঘটনায় উঠে এসেছে।’

In this photograph taken on November 23, 2016, local residents stand in front of the Sohan Nursing Home and Poly Clinic after an officer from the Criminal Investigation Department (CID) of the West Bengal police sealed the main Nursing Home, in Baduria around 65 kms west of Kolkata. Twelve people have been arrested in eastern India for trafficking newborn babies, who were smuggled out of clinics in biscuit boxes, police said. / AFP PHOTO / STRINGER

সিআইডির একটি সূত্রের খবর, অপরাধচক্র সদ্যোজাত কোনো শিশুকে পাশ্চাত্য দেশে পাচারের সময়, অবৈধভাবে সীমান্ত পার করিয়ে প্রথমে বাংলাদেশে ঢোকান হয়।বাংলাদেশে ভুয়া নামে পাসপোর্ট-ভিসা করিয়ে, অথবা সে দেশের কোনো নাগরিককে ব্যবহার করে শিশুটিকে পশ্চিমা কোনো দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সিআইডির এক তদন্তকারী অফিসার বলেন, “অন্য যেসব শিশুকে ইউরোপ-আমেরিকায় পাচার করা হয়েছে, তাদের এতদিন বেবি পাসপোর্ট করিয়ে, সরাসরি এই রাজ্য থেকেই পাচার করা হয়েছিল। গোয়েন্দারা এখনও পর্যন্ত যেটুকু জানতে পেরেছেন, উদ্ধার করা শিশুদের কিন্তু চুরি করা হয়নি। কখনও প্রসবের পর প্রসূতিকে মিথ্যে করে বলা হতো, তিনি মৃত সন্তান প্রসব করেছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হতভাগ্য পরিবার শোকে-হতাশায় মৃত সন্তানকে দেখতে চাইতেন না।সেই সুযোগেই হতো শিশু পাচার। আবার কখনও কুমারী মা বা দেরিতে গর্ভপাত করাতে আসা কোনো বিবাহিত মহিলার প্রি-ম্যাচিওরড ডেলিভারি করিয়ে, শিশুকে ইনকিউবিটরে দীর্ঘ দিন রেখে সুস্থ করে তুলে বিক্রি করা হতো। এখানেই আসছে চিকিৎসকদের ভূমিকার কথা।চিকিৎসকরা, বিশেষ করে স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ কিংবা শিশু চিকিৎসক জড়িত না থাকলে, এই চক্র চালানো মুশকিল।সেই কারনে এখনও অবধি বহু  চিকিৎসককে  গ্রেপ্তার করেছেন গোয়েন্দারা।

তদন্তে জানা গেছে, কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা দালালের কাজ করত। তাদের কাছেই থাকত ডেটা বা তথ্যপঞ্জি, যেখানে  সন্তান দত্তক নিতে মরিয়া দেশি-বিদেশি দম্পতিদের তালিকা ও তাদের বিস্তারিত বিবরণ।এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় অনেককেই  গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। তবে তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন, এটা শুরুর শুরু, গ্রেপ্তারের সংখ্যাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, গোয়েন্দারাও সেটা আন্দাজ করতে পারছেন না।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *