মমতা কী পারবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে ?

aa-Cover-f71ct0tm0apt5vni49ngo8g046-20180511060548.Medi২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। নোট বাতিল, জিএসটি চালু, আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, চরম বেকারিত্ব,সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান এবং সাম্প্রতিক রাফায়েল বিমান চুক্তিতে দুর্নীতি ইত্যাদি নানা ঘটনায় বিজেপির ওপর ক্ষুব্ধ আপামর ভারতবাসী ও  এনডিএ জোটের শরিকেরা।

যদিও সংসদের উভয় কক্ষে এবং বাইরে বিজেপি বিরোধী যে দলগুলি আছে তাদের নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। একটা অবিশ্বাসের বাতাবরনও বিদ্যমান। এরই মধ্যে কংগ্রেস অতীতে কয়েকটি উপনির্বাচনে এবং কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে ভালো ফল করেছে। কর্নাটকে জোট করে সরকার গড়েছে। কিন্তু তবুও কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী যে দেশ গঠনের জন্য বলিষ্ঠ নেতা, এখনো সেই ভাবমূর্তি জনমানসে গড়ে তুলতে পারেননি।

অতীতে দেখা গেছে, যাঁর মধ্যে নীতিতে অটল ও তেজস্বীতা রয়েছে তাকেই ভারতের সাধারন মানুষ নেতা হিসাবে মেনে নিয়েছে। সেই কারনে নোটবন্ধির বিরোধিতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজেপি বিরোধী লড়াই তাকে অনেকটা সামনে নিয়ে এসেছে। এই সুবিধাজনক অবস্থান মমতা কখনই হাতছাড়া হতে দেবে না। সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাহুল গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী পদ প্রার্থী করার বিষয়ে বিরোধী জোট শিবিরে যে মতপার্থক্যের বাতাবরন তা অনেকটাই মমতার কলকাটি নাড়ার প্রভাবে। এই সব কারণেই বঙ্গ তৃণমূল শিবির ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বাঙালি প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন দেখছেন।

৯৬ সালে বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে নিয়ে বাঙালি, প্রধানমন্ত্রী প্রাপ্তির স্বপ্ন দেখেছিল। বিরোধী ১৩ দলের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও জ্যোতি বাবুর দল শিলমোহর না দেওয়ায় বাঙালির স্বপ্ন ভেস্তে গিয়েছিল। দ্বিতীয় সুযোগ আসে ভারতের রাষ্ট্রপতি হওয়ার। ২০১২ সালে ২৫সে জুলাই বাঙালির সেই ক্ষেদ মিটিয়েছিলেন প্রনব মুখোপাধ্যায়। এবার বাঙালি প্রধানমন্ত্রী দেখার আশায় কোমর বেঁধেছে বঙ্গ ব্রিগেড।

২০১৪ সালের লোকসভার নির্বাচনে বিজেপির গায়ে সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ থাকলেও তারা বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে। বিপুল জয়ের পর থেকেই বিজেপি দেখতে থাকে ক্ষমতায় টিকে থাকার নানা স্বপ্ন। নেতারা জনসমক্ষে বলতে থাকে, কংগ্রেসর পঞ্চস্ত প্রাপ্তি হয়েছে অতএব বিজেপির যুগ শুরু।প্রকারন্তরে বলার চেষ্টা, ভবিষ্যতে বিজেপিই শাসনে থাকবে।

২০১৯ লোকসভার নির্বাচনের আগে অনেক প্রশ্ন সামনে উঠে আসছে। বিজেপি কি ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় থাকতে পারবে? গেলবারের আসন ধরে রাখতে পারবে? কংগ্রেস নিজের অবস্থান থেকে নিমনীয় হয়ে বাকিদের সঙ্গে নিয়ে একটা জোড়াল ধাক্কা দিতে পারে এমন আশঙ্কায় বিজেপি ভুগছে।

কারণ, ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর নোট বাতিলের ঘটনায় দেশের সাধারন মানুষ যেমন ক্ষুব্ধ হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই বিজেপির সাথ ছেড়েছে। যেমন অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মমতাকে সঙ্গে নিয়ে নোট বন্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলনে পথে নামে। এই আন্দোলন সাধারনের মনে ধারনা তৈরি দেয়- গরিব মানুষের ভোগান্তি আর বড়লোকদের নোট গোপন পথে ব্যাংকে জমা হওয়া।

জিএসটি, গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স। এটাও মেনে নিতে পারেনি দেশবাসী। চালু হওয়া পর একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী জিএসটির নামে অধিক মূল্যে পন্য বিক্রি করতে শুরু করে। এরপর রয়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের লাগাম ছাড়া দাম। আকাশছোঁয়া মুল্য বৃদ্ধিতে লাগাম টানতে মোদী সম্পূর্ণ বিফল। উত্তরোত্তর পেট্রো পন্যের( পেট্রোল, ডিজেল ও রান্নার গ্যাস) দাম বৃদ্ধির ফলে দেশের মানুষ নাজেহাল। সঙ্গে বেড়েছে সাম্প্রদায়িক শক্তির আস্ফালন। মানুষ ভেতরে ভেতরে গুমরোচ্ছে। গোটা দেশই এখন এই সব ঘটনায় সোচ্চার।

একটার পর একটা ঘটনায় এনডিএ শরিকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ছাড়তে শুরু করেছে বিজেপির সঙ্গ। মহারাষ্ট্রের জোটসঙ্গী শিবসেনা ঘোষণা করে দিয়েছে, আগামীর কোনো নির্বাচনে তারা বিজেপির জোটসঙ্গী হবে না। ওডিশার নবীন পট্টনায়কের অবস্থানও একই। অন্ধ প্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডু সঙ্গ ছেড়েছে। মমতার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করেছে। বিহারের নেতা জিতন রাম মাঝি বিজেপি ছেড়ে আরজেডিতে যোগ দিয়েছে। বিজেপি-শাসিত মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থানের স্থানীয় সরকারসহ সংসদ ও বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির পরাজয় শুরু হয়েছে।ভারতের বিভিন্ন জনমত সমীক্ষায় উঠে এসেছে বিজেপির জনপ্রিয়তায় ভাটার টানের ছবি। ফলে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এককভাবে জয়ের ধ্বজা ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক মহলে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রধানমন্ত্রী করার প্রশ্নে তৃনমূল কংগ্রেসের যুক্তি- আগামীর নির্বাচনে বিজেপি আর তাদের আসন ধরে রাখতে পারবে না। তাদের আসন কমবে। অন্যদিকে আসন বাড়বে কংগ্রেসের। এই দুটি দলের সম্মিলিত আসনসংখ্যা যদি ১৫০ ওপরে না যায়, সেক্ষেত্রে সরকার গড়তে শরিক বা অন্যান্য দলের সমর্থন নিতে হবে। তৃণমূলের ধারণা, বিজেপি ও কংগ্রেসের পরই হবে তাদের স্থান। কারণ, কংগ্রেস যদি সরকার গড়তে না পারে, ক্ষেত্রে তারা ধর্মনিরপেক্ষ কোনো জোটকে সমর্থন দেবে। আর সেটাই মমতার সুবর্ন সুযোগ। তৃণমূলের ধারণা, দেশে মোদীবিরোধী শক্তির প্রধান মুখ এখন মমতা।

তৃনমূল দল স্বপ্ন দেখতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হল, বিরোধী শিবিরে আরও অনেক নেতারা আছেন যারা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য দাবিদার, তারা কি মমতাকে সমর্থন দেবে? এক্ষেত্রে মমতা খানিকটা বাকিদের থেকে এগিয়ে রয়েছে। কারণ, মমতা সাতবার লোকসভার সাংসদ, কেন্দ্রীয় সরকারের রেলমন্ত্রী, কয়লামন্ত্রী ও যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গে দুবারের মুখ্যমন্ত্রী। সুতরাং যোগ্যতার প্রশ্নে দ্বিমত থাকার অবকাশ নেই। দ্বিমত রয়েছে, প্রধানমন্ত্রী পদে বিরোধীরা তাকে বসাবেন কি না? অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই, দেখা যাক ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত কী ঘটে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *