“মমতার পদ্মাতঙ্ক”

WhatsApp Image 2019-11-07 at 12.56.24 PMযদি বলা হয় বিগত লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবাংলায় বিজেপির উত্থানের পিছনে মুসলিম তোষণের বিরুদ্ধে  হিন্দুত্ববাদী মেরুকরণ হয়েছিল তাহলে ব্যাপারটা অতি সরলীকরণ হয়ে যাবে,মমতা-বিরোধী রাজনৈতিক মেরুকরণও নেহাত হেলাফেলার ছিল না।

‘ল অফ নেচার, মানে প্রকৃতির সূত্র বলছে উত্থানের চরম শিখরে পৌঁছলে পতন অনিবার্য। পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্যপাট সেই সুত্র  বাস্তবতার ব্যতিক্রম হয় কী করে ! লোকসভা ভোটের গরম বাজারে গ্রামাঞ্চলের সাধারন ঠেকে কান পাতলে শোনা যাচ্ছিল, “সিপিএম যখন চলে গেল আর তৃণমূল চলে এল, তখনও বুঝতে পারেন নি যেমন, তেমন আজ এ রাজ্যে বিজেপি ঢুকছে আর তৃণমূল কংগ্রেস বিদায় নিচ্ছে, সেটাও আপনি আজ বুঝতে পারছেন না।”

কী সাংঘাতিক এক রাজনৈতিক রূপান্তরের আলোচনা সাধারন ঠেকে চালাচালি হচ্ছিলো। আসলে আমরা  যারা  শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে রাজনিতির আঁক কষাকষি  করি, মাটির সঙ্গে যোগাযোগ না রেখেই।  বুঝতে হবে,  কী অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল গ্রামের সাধারন ঠেক। তৃণমূল কংগ্রেস  দিদিকে প্রধানমন্ত্রী করার স্লোগান দিয়েছিল, কিন্তু  মোদী কিভাবে প্রধানমন্ত্রী হলেন তা  আজ সকলের সামনে।

সবই ত হোল এবার আসল কথা, মমতার এমন দসা হলো কেন? গড়পড়তা ব্যাখ্যা, ওঁর অত্যাধিক  সংখ্যালঘু তোষণ নীতির ফলেই এই পরিনতি। আবার বিষয়টা অতি সরলীকরণ হয়ে গেল, আমরা কেউই  তীব্র  মমতা-বিরোধী রাজনৈতিক মেরুকরনের দিকে আলোকপাত করছি না। আজ পশ্চিমবঙ্গের আর্থ-সামাজিক প্রকৃত  চিত্র খুবই উদ্বেগজনক । সীমাহীন কর্মহীন মানুষ । রাজ্যে কোনও বড় শিল্প নেই। কলকারখানা নেই, মাথাপিছু আয় কম, জাতীয় মূল স্রোত থেকে বাঙালি পিছু হটছে। সেই ৭৭ সালের থেকে  বাঙালিকে  কেন্দ্র ও দিল্লি বিরোধী করে রেখেছিল মুলত বামপন্থীরা বর্তমানে তৃনমূল। তখন কংগ্রেস বিরোধী আন্দোলন চলতো এখন মোদী বিরোধী। নিজের অযোগ্যতা এবং অক্ষমতাকে অন্যপথে চালিত করার এ এক সর্বনাশা তিরন্দাজি খেলা। আখেরে ক্ষতি বাংলার ও মানুষের।

চিত্তরঞ্জন দাস, সুভাষ বোস, বিধান রায়দের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক অম্লমধুর ছিল। বাঙালির ডিএনএ তে  দিল্লি বিরোধিতার বিজ অনেক আগে পোঁতা হয়েছিল। আজ তা মহীরুহে পরিনত হয়েছে। কিন্তু উপরিউক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে দিল্লির সংঘাত মুলত আদর্শ বা ন্যায্য দাবি আদায়কে কেন্দ্র করে ঘটেছিল। ‘নেহি চলেগা নেহি চলেগার নেতিবাচক রাজনীতি বামপন্থীদের হাত ধরে। বিরোধিতার ডিএনএ’কে  হাতিয়ার করে বামপন্থীরা বাংলাকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গবাসী আজ  ক্লান্ত।তারা দেখছে যে  ত্রিপুরার মত ছোট রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত ঘুচেছে। ফলে কেন্দ্রীয় সমস্ত প্রকল্পের সুযোগ সুবিধা যেমন উত্তরপ্রদেশ বা অন্য রাজ্য পাচ্ছে, ত্রিপুরার মত ছোট রাজ্যও পাচ্ছে।

আসলে, ১৯৭৭ সালের পর থেকে রাজ্যের প্রতি বঞ্চনা এক মস্ত বড় প্রচারের হাতিয়ারে পরিনত হয়েছে। হয়। মমতা ব্যানার্জি  সিপিএমের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সুত্রে  গ্রহণ করেছেন। মমতার রাজনীতি সম্পর্কে আম জনতার মতামত – তৃণমূল কংগ্রেস হলো ‘খারাপ সিপিএম-এর পরিবর্ধন। সিপিএমের  নীতি দেখেই মমতার রাজনীতি পরিপক্কতা পেয়েছে।

মমতার তৃণমূল কংগ্রেস হলো পশ্চিমবাংলার দল। মমতা যতই গায়ের জোরে সর্বভারতীয় বলুক। বিজেপির মতো সুসঙ্ঘবদ্ধ রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে মমতা দিশাহারা। ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান যতই বাংলায় এঁটে বসেছে ততই মমতার মানসিক সন্তোলন হারাচ্ছে। নাহলে শুধুমাত্র ‘জয় শ্রী রাম’ বলার জন্য  বিজেপি কর্মীদের গ্রেপ্তার করা অথবা এক কার্টুনিস্ট মহিলাকে  স্যোশাল মিডিয়ায় সমালোচনা করার জন্য গ্রেপ্তার , ইত্যাদি অগুনতি অগনতান্ত্রিক পদক্ষেপ শাসকদলের বিরুদ্ধেই গেছে।  উত্তরপ্রদেশে যে ভাবে জাতপাতের ভিত্তিতে ভোট হয়, পশ্চিমবঙ্গে সেভাবে কোনোদিন ভোট হয় নি, এমনটা বিজেপি বিরোধী দল্গুলির প্রচার। তাহলে, মমতা যে নমঃশুদ্র মতুযা সম্প্রদায়, ওবিসি এবং নানা নিম্নবর্গ সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে ভোট ব্যাঙ্ক বানিয়ে নির্বাচন করাচ্ছে, এটাকে কি বলবেন?  এটাও একটা  অবক্ষয়ের নিদর্শন। বিজেপি মতুয়া প্রার্থীর কাছে  তৃণমূলের মতুয়া প্রার্থী পরাজিত হয়েছে।মোদ্দা কথা, মমতা যতই হাউ হাউ করুন, মোদী নামক ব্যক্তিত্ব এতটাই বড়  ফ্যাক্টর যে অন্য সব জাতপাতের বিষয়গুলি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে।

পশ্চিমবঙ্গে, বর্তমানে মানুষের মনোভাব হচ্ছে, বামফ্রন্টকে ৩৪ বছর পরীক্ষা করেছি, এখন তৃনমূলকেও দেখছি। জেলায় জেলায় তৃনমূলের অত্যাচার ও অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে একমাত্র বিজেপি। বামপন্থীরা ফসিল হয়ে গেছে। কংগ্রেস নামক দলটাই আছে কিনা বুঝতে আতস কাঁচের তলায় ফেলতে হবে তাই ভোট কাকে দেব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।খাস কলকাতার মধ্যবিত্ত ও উচ্ছবিত্ত বাবুসমাজের মুখেও আজ বিজেপি’র নাম। আর দিল্লি বিরোধী ‘ডিএনএ’ চুলকে লাভ নেই। মনোভাবের সত্যতার হাতেগরম ফল মিলেছে ১৮টি আসন।

বাতাস গরম হলে উর্দ্ধমুখি হয়, শূন্যস্থান পুরনে নতুন বাতাস দখল করে, এটাই প্রকৃতির নিয়ম। বাংলার মানুষের ‘রাম’ ধাক্কা খাওয়ার পর মমতা সম্পুর্ণ নতুন রণসাজে প্রস্তুত হওয়ার চেষ্টা করছেন।প্রশান্ত কিশোর কে ভাড়া করে এনেছেন। তিনিও নানান দাওয়াই বাতলে যাচ্ছেন। দিদিকে বলো, গ্রামে যাও, সাধারন মানুষের সঙ্গে রাত্রিবাস করো ইত্যাদি ইত্যাদি। নেতারা ছবি তুলে দিদিকে পাঠিয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। দিদির কাছেও খবর, কেউই রাত্রিবাস করছেন না। শৃঙ্খলিত সংগঠনের মধ্যে বেড়ে না উঠলে যা হয় তাই হচ্ছে। ভাইপো, ভাইরা এবং দিদির নিকট বলয়ে থাকা নর নারীদের জীবনযাপন মানুষকে ক্রমাগত হতাস করছে। এদের দেখে কর্মীরাও দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে উঠেছে। আর কেনই বা হবে না- সময় থাকতে ‘টু পাইস কামিয়ে নাও’।ক্রমশ প্রশান্ত কিশোর অশান্ত কিশোরে পরিনত হচ্ছেন। কানাঘুষো- অনেক বিষয়েই পিসি ভাইপোর সঙ্গে মতের অমিল হচ্ছে।

আগত পুরসভা ও পৌরসভার নির্বাচনে তৃনমূল মেরেপিটেও কতটা কি করতে পারবে বলা মুশকিল। পঞ্চায়েত নির্বাচনের পুনরাবিত্তি হলে মানুষ কিন্তু বিধানসভায় টিকিয়া উড়ান গাড়ি চালাবে। দিদিভাই বিগত লোকসভার ফলাফলে মালুম পেয়েছেন। মমতার প্রায় ১২ জন মন্ত্রী এবার বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে হেরেছেন। মমতা তাঁদের টিকিট দেবেন কিনা জানা নেই। কারন অনার গমনাগমনের ধরনধারন ‘অ্যামিবার’ মতো। এছাড়া অগুনতি বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি এগিয়ে রয়েছে।  সুব্রত মুখোপাধ্যায়, শুভেন্দু অধিকারী সহ অনেক প্রথম সারির  নেতারা বিজেপির সঙ্গ পেতে চাইছে অনেকদিন থেকেই। মমতা এই অভ্যন্তরীন সমস্যাগুলি কীভাবে সামলাবেন সেটাও বিবেচনার বিষয়।

এনআরসি নিয়ে তৃনমূল, বামপন্থীরা এবং কংগ্রেস বিজেপির বিরুদ্ধে ঘোঁট পাকানোর চেষ্টা করছে। মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছে কিন্তু সফল হবে না। এনআরসি হবেই। বিজেপির সরল সত্যটা আজ মানুষ বুঝছে, বিশ্বের সমগ্র  হিন্দুরা আমার ভাই বোন। তার মানেই মুসলিম বিরোধিতা নয়। মুসলিমরা যেমন নিজের দেশে ছিলেন তেমনিই থাকবেন। বিরোধিতা অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে, যাদের সংখ্যাধিক্য দেশের আর্থ সামাজিক, কৃষ্টি সংস্কৃতির ধ্বংস সাধন করছে। আশার কথা, মুসলিমরাও বিষয়টা ধিরে ধিরে বুঝতে শুরু করেছে। অতএব বিচ্ছন্নতাবাদি রাজনিতির সময় সমাপ্ত।

সব মিলিয়ে কোনও সন্দেহ নেই, ভারতবর্ষের সমগ্র জনসমাজের কাছে এখন পশ্চিমবঙ্গ এক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য হয়ে উঠেছে। বাকিটা আগামী ৩টি বিধানসভার উপনির্বাচন এবং আগত বিধানসভার ফলাফল বলে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *