ভাষা ও জাতি বিভেদের রাজনীতি দারজিলিংকে অশান্ত করে তুলল। দেবাশীষ পাইন

darjeeling-situation-may-sink-under-another-crisis-১৫ই জুন ২০১৭,ভ্রমনার্থিরা গিজগিজ করছে পাহাড়ের রানি দার্জিলিঙে।বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্ধোপাধ্যায় প্রশাসনিক বৈঠক করছেন।ভ্রমনার্থিরা হোটেলের ঘরে প্রস্তুতি নিচ্ছেন,ম্যালে বেড়াতে যাবেন বলে।হটাত করে পাহাড়ের রানি অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল।জিজেএম প্রধান বিমল গুরুং ভ্রমনার্থিদের পাহাড় ছাড়ার হুঙ্কার দিয়ে বললেন পরিস্থিতি আরও অশান্ত হতে পারে,হলে তার দায় আমার নয়।ভানুভক্ত ভবনের সামনে জড় হওয়া একদল মারমুখি জিজেএম সমর্থক পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছে।ইট,পাথর,টিয়ার গ্যাসের ধুঁয়া,জায়গায় জায়গায় জ্বলছে বাড়ি,পুলিশের গাড়ি।সে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি।কেন?মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন এবার থেকে পশ্চিমবাংলার সব স্কুলে বাংলা ভাষা পড়ান বাধ্যতামুলক।পরে যদিও মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন যে পাহাড়ে যেসব অঞ্চল নেপালিভাষা অধ্যুষিত সেখানে প্রযোজ্য হবে না,তাও কেন অশান্তি দিন দিন বেড়েই চলেছে?ক্রমবর্ধমান এই আশান্তির কারন অন্য,আরও গভীরে।

পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত পাহাড় অঞ্চলটি অতীতে সিকিম রাজার অধীনে ছিল।১৯ শতকে নেপাল,সিকিমের থেকে দার্জিলিং দখল করে নেয়।১৮১৬ সালে ব্রিটিশরা একরকম জোরকরে নেপালের থেকে দখল করে নেয়।সিকিমকে দার্জিলিং ফেরত না দিয়ে নিজেদের দখলে রেখে বাংলার সঙ্গে জুড়ে দেয়।১৯৪৭ সালে বাংলাভাগে দার্জিলিং পশ্চিমবঙ্গের অংশ থেকে যায় আর এটাই আজকের পরিস্থিতির মুল কারন।

১৯৪৭ সালের পর থেকেই অল ইন্ডিয়া গোর্খা লিগের নামে আন্দোলন শুরু হয়।দাবী ছিল,নেপালি ভাষীদের ভাষার ভিত্তিতে আলাদা রাজ্য দিতে হবে।

অন্য আরও অনেক কারনে এই দাবিকে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছিল।দিল্লি সবসময় শঙ্কিত ছিল,কারন নেপালি ভাষার জাতীয়তাবাদকে বাড়তে দিলে হয়তো আগামীদিনে পড়শিদেশ নেপাল গোর্খাল্যান্ড দাবীর পক্ষে সওয়াল করতে পারে।উদাহরনস্বরুপ,১৯৮৫ সালে কম্যুনিস্ট নেতা আনন্দ পাঠক যখন পাহাড়ের জন্য আলাদা শাসন ব্যবস্থার দাবী তুলে সোচ্চার হয়েছিলেন।তখন কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল,এই ধরনের দাবিকে মান্যতা দেওয়ার অর্থ হল সর্বনাশকে স্বীকৃতি দেওয়া।বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি উৎসাহ পাবে এবং তাদের জয় হিসাবে ধরে নেবে।

পশ্চিমবঙ্গ চায়না,দার্জিলিং বাংলা থেকে আলাদা হোক-প্রথম কারন-দার্জিলিং বাঙালির আবেগজুড়ে আছে দ্বিতীয় কারন চা ও পর্যটন শিল্পের রাজস্বের কারনে।

585491-gjm-protest-for-gorkhaland-ptiদীর্ঘ বঞ্চনা আর অবহেলাকে কেন্দ্র করে ১৯৮০ সালে সুভাষ ঘিসিং এর দল জিএনএলএফ দার্জিলিংকে হিংস্র আন্দোলনের মাধ্যমে অশান্ত করে তুলেছিল।ঘিসিং এরও একই দাবী ছিল,ভাষার ভিত্তিতে গোর্খাল্যান্ড।ঘিসিং এর ক্যায়দাটা ছিল হিংস্র আন্দোলনের মাধ্যমে ভয়ের পরিবেশ ধরে রাখা।এমনকি,ঘিসিং খুব জোড়ালভাবে বৃহত্তর নেপাল গঠনের হুমকি ও ১৯৫০ সালের ইন্দো-নেপাল চুক্তি লোপের দাবী জানাত।ঘিসিং এর গোর্খাল্যান্ড দাবী আন্দোলনের পেছনে নেপালের প্রচ্ছন্ন মদত ছিল এইকারনে-বহুদিন ধরে ভারতে বসবাসকারী নেপালি বংশভুতরা তরাই অঞ্চলে নেপালি নাগরিকত্বের দাবী জানিয়ে আসছিল।এই দাবিকে আটকানো ছিল নেপালের লক্ষ্য।রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের এমনটাই ব্যাখ্যা।

অশান্ত দারজিলিংকে শান্ত করতে ১৯৮৮ সালে দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল তৈরির মধ্যে দিয়ে দাবীর কিছুটা মেনে নেওয়া হয়।২০১১ সালে কাউন্সিলের ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে নতুন নামকরন করা হয়-গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেসান।লাভজনক চা শিল্পসহ মোট ৫৪টি বিষয় জিটিএ’র নিয়ন্ত্রনে রাখা হয়।কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় হল, জিটিএ অন্য অটোনামাসের থেকে কম ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল।যেমন,বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল,যাদেরকে নতুন আইন প্রনয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

পরিস্থিতি উতপ্ত হতে তখন শুরু করল যখন থেকে তৃনমূল কংগ্রেস পাহাড়ে স্থানীয় রাজনীতিতে দাঁওপ্যাঁচ খেলা শুরু করল।পাহাড় বিভিন্ন জনজাতিতে ভরা সুতরাং গোর্খারাই একমাত্র পাহাড়ে বসবাসকারী এমনটা নয়।২০১১ সালে তৃনমূল সরকার পাহাড়ে বসবাসকারী লেপচা,তামাং,রাই,ভুটিয়া এবং মাঙ্গার গোষ্ঠীর উন্নতিকল্পে ৬টা বোর্ড গঠন করে ফেলল।সরকারের তরফে বলা হল যে এতদিন ধরে এই গোষ্ঠীগুলির জন্য কোন উন্নয়ন করা হয়নি।মুদ্দাটাকে জোরদার করার জন্য ২০১৬ সালে বিধানসভার নির্বাচনে বিখ্যাত ফুটবলার বাইচুং ভুটিয়াকে শিলিগুড়ি টাউন কেন্দ্র থেকে ক্যান্ডিডেট করা হল।

তৃনমূলের রাজনীতি ফল পেতে শুরু করল মিরিক পৌরসভায় বোর্ড গঠন করে।এই জয়টা খুব উল্লেখযোগ্য এই কারনে,সুভাষ ঘিসিং গোর্খাল্যান্ড দাবী আন্দোলনের প্রায় ৩০ বছর পার করার পর সমতলের কোন অগোর্খা পার্টি পাহাড়ে জয় পেলো।

সবচাইতে বড় লক্ষ্য করার বিষয় হল তৃনমূল কংগ্রেস মিরিক পৌরসভায় বোর্ড গঠন করার পর জিজেএম অস্থির হয়ে পড়েছিল।কিছু একটা কাণ্ড করে পাহাড়কে অশান্ত করে তুলতে চাইছিল।জিজেএমের হাতের কাছে সোনার সুযোগ তুলে দিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী।বাংলা ভাষাকে আবশ্যিক পাঠ্য করার মুখ্যমন্ত্রীর ফরমানকে হাতিয়ার করে বিমল গুরুং অন্য খেলায় নেমে পড়লেন।মুখ্যমন্ত্রী পরে যখন বললেন,যে আমি কখনই নেপালিদের ওপর বাংলাভাষা চাপিয়ে দেওয়ার কথা বলি নি।আমার কথাকে বিকৃত করে অন্য ছবি আঁকার খেলা চলছে।মুখ্যমন্ত্রী আত্মপক্ষ সমর্থন করে যখন এ কথাগুলো বলছেন ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে।বিমল,তৃনমূল দলকে বাঙালির দল বলে কাঠগড়ায় তুলে পুনরায় পাহাড়ে সব গোষ্ঠীকে একত্রিত করে ১৯৯০ সালের গোর্খাল্যান্ডের দাবিকে সামনে এনে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাইছে।এছাড়া বিমল গুরুং এর আর কোন উপায় নেই।

তৃনমূলের বিভাজন রাজনীতির ফলে বিমল ক্রমশ শক্তিহীন হয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়ছিল।তলে তলে বিভিন্ন অশুভ শক্তির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে সুযোগের অপেক্ষা করছিল।পড়শি দেশ নেপালের মদত আছে জানাই ছিল।ক্রমশ জানা যাবে আরও কাদের কাদের মদতে চলার চেষ্টা করছে বিমল।তবে পরিশেষে একটা কথা না বলে পারছি না, সেটা হল মমতা সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ বলে কিছু নেই।থাকলে আগাম প্রস্তুতি নিয়ে আটকানো যেত,তাহলে আর যাই হোক নিরীহ ভ্রমনার্থিরা হেনস্তা হওয়ার হাত থেকে নিস্কৃতি পেত।বিচ্ছিন্নতাবাদের রাজনীতি দুজনেই করছে-একজন জমি নিয়ে অন্যজন জাতি নিয়ে।

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *