ভারত ছাড়ো আন্দোলনের- ৭৬

quit-indiaক্রিপস মিশন ব্যর্থ হওয়ার পর গান্ধিজি তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পরিকল্পনা করতে শুরু করেন । ১৯৪২সালে ২৬ শে এপ্রিল গান্ধিজি ‘হরিজন’ পত্রিকাতে ‘ভারত ছাড়ো’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। এই প্রবন্ধে গান্ধীজি লেখেন, ” ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবিলম্বে অবসান চাই । শুধু ভারতের স্বাধীনতাই একমাত্র লক্ষ্য নয়, বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য নাত্সীবাদ, ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক এবং একজাতির উপর অন্যজাতির আক্রমণের  অবসান চাই।”

১৯৪২সালে ১৪ই জুলাই মহারাষ্ট্রের ওয়ার্ধা অধিবেশনে ‘কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি’ গান্ধিজির ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের প্রস্তাব অনুমোদন করে।প্রস্তাবে আরও বলা হয়, ব্রিটিশ ভারত ছেড়ে চলে গেলে ভারতীয় জনপ্রতিনিধিরা একটি সামরিক সরকার গঠন করবেন এবং সকলের গ্রহণযোগ্য একটি সংবিধান রচনা করবেন।এরপর গান্ধিজি দৃঢ় কন্ঠে ঘোষণা করেন, ‘করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে’।অর্থাৎ দেশ স্বাধীন করব, না হয় মৃত্যুবরণ করব। ৯ ই আগস্ট ১৯৪২ সালে সকাল থেকে ভারতব্যাপি তিব্র আন্দোলন শুরু হয়।

১৯৪২ সালে ৯ই আগস্ট আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার সবার প্রথমে গান্ধিজিকে গ্রেফতার করে পুণায় আটক করে রাখে। এরপর একে একে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, জওহরলাল নেহরু, আবুল কালাম আজাদ, জে. বি. কৃপালনী সমেত বহু প্রথম সারির নেতা কারারুদ্ধ হন । ব্রিটিশ সরকার কংগ্রেসকে বেআইনি সংগঠন রূপে ঘোষণা করে ।

আন্দোলনের শুরুর দিকে মুলত দেশের ছাত্র-শিক্ষক, যুবসম্প্রদায় ও বুদ্ধিজীবী মধ্যবিত্ত মানুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল । ক্রমে, দেশের শ্রমিক, কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে গণআন্দোলনের চেহারা নেয়।  দেশব্যাপী ধর্মঘট, শোভাযাত্রা, মিছিল, মিটিং ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হতে থাকে। এ সবের বিরুদ্ধে সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হলে আন্দোলন হিংসাত্মক রূপ নিতে শুরু করে। রেললাইন ধ্বংস, স্কুল-কলেজ বর্জন, বিভিন্ন অফিস-আদালতে অগ্নি-সংযোগ, ট্রেন ও টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন, ডাকঘর, রেজিস্ট্রি অফিস, রেলস্টেশন ইত্যাদি দখল হতে শুরু হয়।

ভারত ছাড়ো আন্দোলন ভারতজুড়ে এক গনঅভ্যুত্থানের চেহারা নিয়েছিল ঠিকই কিন্তু ভারতের বিশেষ কিছু জায়গায় আন্দোলন ভয়ঙ্কর আকার নিয়েছিল। যেমন, মহারাষ্ট্রের ‘সাতারায়’ শ্রীনাথ লালা ও নানা পাতিলের নেতৃত্বে।মেদিনীপুরের ‘তমলুক ও কাঁথিতে মাতঙ্গিনী হাজরা ও সুশীল ধাড়ার নেতৃত্বে, উত্তরপ্রদেশের ‘বালিয়া’ জেলায় চৈতু পান্ডে ও সরযূ পান্ডের নেতৃত্বে। এছাড়া আজমগড়, আসামের নওগাঁ, ওড়িশার তালচের, বালাশোর ইত্যাদি জায়গায় আন্দোলন চরম আকার নেয় ।

পাঞ্জাবের গৃহবধু ভোগেশ্বরী ফকোননি, আসামের স্কুলছাত্রী কনকলতা বড়ুয়া, অরুণা আসিফ আলি, সুচেতা কৃপালিনী, জয়প্রকাশ নারায়ণ, আচার্য নরেন্দ্রদেব, রামমনোহর লোহিয়া, যোগেশ চ্যাটার্জি, উষা মেহেতা, অচ্যুত পট্টবর্ধন, অজয় মুখার্জি প্রমুখরাও উল্লেখযোগ্য ভুমিকা পালন করেছিল।

বাংলায় মেদিনীপুর জেলায় তমলুক ও কাঁথিতে মাতঙ্গিনী হাজরার অবদান ভারতের  স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ৭৩ বছর বয়স্কা বিধবা মাতঙ্গিনী হাজরা তমলুক আদালত শীর্ষে ভারতের ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা তুলতে গিয়ে ব্রিটিশের গুলিতে প্রাণ হারান। সেদিনের আন্দোলনে মাতঙ্গিনী হাজরার ভুমিকা আন্দোলনকারীদের মধ্যে দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *