“বিষাক্ত নগরী তিলোত্তমা”

420727-pollution-kolkataবর্তমানে কলকাতা শহরের দূষণ মাত্রার হার বিপজ্জনকের থেকেও বেশি বিপজ্জনক৷ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন একথা ৷ রাজ্য সরকার ও কলকাতার মেয়র একযোগে অস্বীকার করছে। সরকার বলছে ভুল তথ্য পরিবেশন করছে বিশেষজ্ঞরা আর মেয়র বলছে, আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে।

কলকাতার দূষণ পরিস্থিতি, বিপজ্জনক সীমারেখা পেরিয়ে এখন সহ্যসীমার অনেক ওপরে চলে গেছে ৷ ব্যস্ত এলাকাগুলোকে বাদ দিলাম, কলকাতার ঢাকুরিয়া লেক, বেলেঘাটা লেক বা সবুজ গাছে ভরা জায়গাতেও দূষণের মাত্রা কখনও কখনও অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়৷  তাই কলকাতার রাস্তায় ঘোরাফেরা আর মৃত্যুর সঙ্গে দোস্তি প্রায় সমতুল।

বাতাসে মিশে থাকা মারাত্মক দূষণকণা,সাধারন চোখে দেখা যায় না। এই দূষণকনা নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে আমাদের ফুসফুসে গিয়ে জমা হয়,তারপর রক্তে গিয়ে মেশে। কলকাতার বাতাসে নাইট্রোজেন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেশি৷ শহরে গাড়ির ও শহরতলির কারখানার  ধোঁয়া হাঁপানি ও ফুসফুসের অসুখ ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে ৷সরকার ঘটা করে প্রতিবছর পরিবেশ দিবস পালন করে কিন্তু ঐ পর্যন্তই। কিসসু করে না।

কলকাতার মেয়রকে গিয়ে প্রশ্ন করুন, উনি উত্তর দেবেন, কলকাতার পরিবেশ বিশ্বের অন্য অনেক শহরের থেকে ভালো। আদৌ বিপজ্জনক নয়। বাস্তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা ও সমাজ কর্মীরা জানেন  মেয়রের উক্তি মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়।

কলকাতার মার্কিন কনসুলেটে দূষণ পরিমাপের একটি অত্যাধুনিক যন্ত্র বসানো হয়েছে। সেই যন্ত্রের রিপোর্ট হচ্ছে কলকাতার দূষণের পরিমাণ সহ্যসীমার অনেক ওপরে এবং কলকাতাকে বিশ্বের সবথেকে দূষিত শহর বললেও অত্যুক্তি হবে না৷

এই খবর পাওয়ার পর তড়িঘড়ি করে কলকাতার মেয়র শোভন চ্যাটার্জি রীতিমতো সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে দাবি করলেন, মার্কিন কনসুলেটের দাবি মিথ্যে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত৷ ওদের  দূষণ নির্ণায়ক যন্ত্র নিম্নমানের। কনসুলেট কলকাতার মর্যাদা হানি করার জন্য জেনেশুনে ভুল তথ্য পরিবেশন করেছে।

পাল্টা পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মেয়রের দিকে আঙ্গুল তুলেছেন। মার্কিন কনসুলেটের যন্ত্র খারাপ সেটা পুরসভা জানল কী করে।একেই বলে নাচতে না জানলে উঠোন ব্যাকা। কলকাতার দুটিমাত্র স্বয়ংক্রিয় ও  ৯টি ম্যানুয়াল দূষণ পরিমাপ ব্যবস্থা আছে, যা দীর্ঘদিন ধরে অকেজ হয়ে পড়ে রয়েছে। মেয়র বলছেন, মেশিনগুলিকে নাকি নতুন করে ক্যালিব্রেট করা হচ্ছে। বিগত একবছর ধরে কোনও কাজই করা হয়নি। যিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবন দূষণমুক্ত করতে অক্ষম তিনি কি করে কলকাতার দূষণমুক্তি করবেন!

কিছু সমাজকর্মী ও দূষণপর্যবেক্ষকরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলের দূষণহার পরিমাপ করে যাচ্ছেন। রিপোর্ট, অত্যন্ত আশঙ্কাজনক৷ কেন কলকাতায় দূষণ ক্রমশই বাড়ছে৷ লিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং, ক্রোম-লেদার প্রসেসিং এবং ইলেকট্রনিক ওয়েস্ট ভরা দূষিত খাল-বিল। জলাশয় বুজিয়ে  নগরায়ন ৷ শহর জুড়ে ফ্লাই ওভার এবং মেট্রো রেলের কাজ চলছে, যার দরুণ দূষণ বাড়ছে৷  আদালতের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে ডিজেল চালিত ট্রাক অবাধে চলছে কলকাতার রাস্তায় ৷  দিল্লির মতো সিএনজি বা প্রাকৃতিক গ্যাসের জ্বালানিতে যান চলাচল কলকাতায় এখনো চালু করা যায়নি৷ কয়লার উনুন, জঞ্জাল পোড়ানর ধোঁয়া শীতকালে পরিমণ্ডলে আটকে যায়৷ তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে এলে, হাওয়ার গতি কমে গেলেই এই দূষণ জমির ৫ থেকে ৭ ফুট উচ্চতার মধ্যে আটকে পড়ে, যা প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস বিপজ্জনক করে তোলে৷

সুপ্রিম কোর্টের ঘোষণা অনুযায়ী, কলকাতার সবচেয়ে দূষিত এলাকা ট্যাংরা-তিলজলা৷ শহরের যত্রতত্র আবর্জনার ডাই দেখলে মনে হবে, সারা শহরটাই দূষিত ! ঘুমিয়ে কলকাতা পুরসভা ও রাজ্য প্রশাসন৷

কোনও ব্যক্তিগত বিদ্বেষের কারনে এই কথাগুলো অবতারনা নয়। কলকাতা আমাদের প্রানের শহর, গর্বের শহর, ভালবাসার শহর তাই অব্যবস্থা মেনে নিতে কষ্ট হয়। সন্দেহ নিরসনের জন্য বেশী পরিশ্রমের দরকার নেই, আজকাল মোবাইল অ্যাপ দিয়েও দূষণের হার জানা যায়৷ অনেকেই এখন এই অ্যাপ ব্যবহার করে নিখুঁত আবহাওয়ার খবর পাচ্ছেন ৷ তর্কবিতর্কের দরকার নেই-  কলকাতাবাসীরা নিজেরাই জেনে নিন  ঠিক কতটা খারাপ পরিবেশের মধ্যে তাঁরা বসবাস করছেন। সঙ্গে এও জেনে যাবেন কনসুলেট মিথ্যা বলছে না কলকাতার মেয়র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *