বাংলার বাঘ- আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আজ জন্মদিন…

image_172_22972ফিচার টেবিলঃ ১৮৭৫ সালে এক বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বালককে রবিনসন ক্রুশো বইটি উপহার দিয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। মন দিয়ে বইটি পড়তেও বলেছিলেন তাকে। সে দিনের সেই ছেলেটি উত্তরকালে বিদ্যাসাগরের মতোই বইয়ের প্রেমে মজেছিলেন। বিদ্যাসাগরের গ্রন্থসংগ্রহ পুরোপুরি বাঁচেনি, কিন্তু ‘বাংলার বাঘ’ স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ৪৫ হাজার বইয়ের অসামান্য সংগ্রহের পুরোটাই তাঁর পরিবারের আনুকূল্যে জাতীয় গ্রন্থাগারে স্থান পেয়েছে, এবং উত্তরসূরিদের সংযোজনে আজ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬ হাজারে!

বিখ্যাত চিকিৎসক গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও জগত্তারিণী দেবীর ছেলে আশুতোষের জন্ম কলকাতায়,পৈতৃকনিবাস হুগলি-র জিরাট। প্রেসিডেন্সির কৃতী ছাত্র, বি এ পরীক্ষায় তিনটি বিষয়ে প্রথম হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শীর্ষস্থান, এম এ-তেও (অঙ্ক) প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। পরে পদার্থবিদ্যাতেও এম এ করেন, দুটি বিষয়ে এখানে তাঁর আগে কেউ এম এ করেননি। অর্জন করেন প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ স্কলারশিপ। পিতৃবন্ধু বিচারপতি দ্বারকানাথ মিত্রকে দেখে মনে মনে বিচারপতি হওয়ার বাসনা ছিল, পরে হাইকোর্টের বিচারপতি থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছ’টি নতুন বিষয়ে স্নাতকোত্তর পঠনপাঠন চালু করেন। বহু বিদ্বৎসভায় তাঁর নেতৃত্ব ছিল অবিসংবাদিত। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের তিনিই প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি (১৯১৪)।১৮৮০ থেকে ১৮৯০ সালের মধ্যে বিভিন্ন জার্নালে তিনি উচ্চতর গণিতের ওপর প্রায় ২০টির মতো প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি কালটিভেশন অফ সায়েন্সের সঙ্গে তিনি সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ১৮৮৭ থেকে ১৮৯১ সালের মধ্যে তিনি গণিতের ওপর একাধিক লেকচার প্রদান করেন। তার দুটি অসাধারণ অ্যাকাডেমিক অবদান হলো ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত জিওমেট্রি অফ কনিক্স এবং ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত ল অফ পারপিচুইটিস। ১৯০৮ সালে তিনি ক্যালকাটা ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯৪ সালে তিনি ল’এর ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৮৯৮ সালে ট্যাগোর ল প্রফেসর হন।

১৯০৪ সালে তিনি তার কাঙ্ক্ষিত কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতির পদে অধিষ্ঠিত হন। এর আগে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো ও ১৮৮৯ সালে এর সিন্ডিকেটের সদস্যের পদ অলঙ্কৃত করেন। তিনি ১৮৯৯ থেকে ১৯০৩ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নরের কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। ১৯০২ সালে লর্ড কার্জন তাকে বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সদস্য হিসেবে নিযুক্ত করেন। ১৯০৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর পদে অধিষ্ঠিত হন এবং ১৯১৪ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।

এ শহরে একটি কলেজ, তাঁর পৈতৃক বাসভবনের সামনের রাস্তা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আশুতোষ সংগ্রহশালা তাঁর স্মৃতি বহন করছে। তাঁর বাড়িতেই আছে আশুতোষ মুখার্জি মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউট, যেখানে তাঁর ব্যবহৃত নানা জিনিস, স্বর্ণপদক ইত্যাদির সঙ্গে রয়েছে অজস্র আলোকচিত্র ও অমূল্য নথিপত্রের সংগ্রহ। ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবার্ষিকী হলে আশুতোষের ১৫টি সমাবর্তন ভাষণের সংকলনগ্রন্থ রাখা আছে।

মানুষটির স্বাধীনচেতা মনোভাব ও সাহসিকতা নিয়ে বহু গল্প রচিত আছে আর সেই ঘটনাগুলোকে মনে রেখে বাংলার মানুষ বেশ গর্বের সঙ্গে তার নাম দিয়েছিলেন– “বাংলার বাঘ” । ১৯২৪ সালের ২৫ মে পাটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *