বাঁচার জন্য, কংগ্রেসকে ‘একের বিরুদ্ধে এক লড়াই’ ফর্মুলা মানতেই হবে।

indexভারতীয় মতদাতাদের যে মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে সেটা কর্ণাটক নির্বাচনের পর মেনে নিতে হবে। ২০১৯ সালের আগত লোকসভার নির্বাচনে যদি বিজেপিকে পরাজিত করতে হয় তাহলে বিজেপি বিরোধী সব রাজনৈতিক দলকে এক ছাতার তলায় আসতে হবে।এই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে ভারতের শতাব্দী প্রাচীন রাজনৈতিক দল কংগ্রেসকে।

ভবিষ্যতের কথা ভবিষ্যতই জানে তবে এই মুহূর্তে কংগ্রেসের পক্ষে এককভাবে বিজেপিকে হারিয়ে শাসন ক্ষমতায় আসা এককথায় অসম্ভব।ইঙ্গিতটা প্রথম পাওয়া গেছিল উত্তরপ্রদেশের দুটি কেন্দ্রের উপ-নির্বাচনে।তারপর বিগত গুজরাট নির্বাচন এবং নিকট সাম্প্রতিক কর্ণাটক নির্বাচনে। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী জান প্রান লড়িয়ে দিয়েছিলেন এই দুটি রাজ্যের নির্বাচনে কিন্তু জনাদেশ আদায় করতে বিফল হয়েছেন। কর্ণাটক নির্বাচনে সরকারবিরোধী হাওয়া খুব একটা ছিল না। রাহুল প্রচারও করেছিল একটানা। ঘুরে বেরিয়েছিল মন্দিরে মন্দিরে।সঙ্গে ছিল সিদ্দারামাইয়ার মতো প্রভাবশালী মুখ তবুও কেন এমন বেহাল দশা হোল সেটাই ভাবিয়ে তুলেছে গোটা দলকে।

প্রাক নির্বাচনী পরিকল্পনার অভাবে জন্য গত নির্বাচনের তুলনায় ৪৪টি আসন কম পেয়েছে কংগ্রেস৷ ১২২ থেকে নেমে  আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৮টিতে৷ জেডি‌এসের সঙ্গে জোট করে লড়াই করলে ৫৪ শতাংশের বেশি ভোট পেতো কংগ্রেস-‌‌জেডি‌এস‌ ৷ আসন সংখ্যার নিরিখে যা বিজেপি‌‌র থেকে অনেক বেশি হতো৷ ২০১৩ সালে ১২২টি আসনে জিতে প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হার ছিল ৩৬.৭৯ শতাংশ৷ এবার মাত্র ৭৮টি আসন দখল করে প্রাপ্ত ভোটের হার ৩৮ শতাংশ৷ ভোট শতাংশ বেড়েছে বলে কংগ্রেস যে সফলতার ছবি তুলে ধরতে চাইছে, সেটা আত্মতুষ্টি।সেই হিসাবে তো গুজরাটেও বিজেপি ভোট শতাংশ বাড়িয়েছে।

অতীতে জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক দলের ছাতার তলায় ছোট দল্গুলি বা আঞ্চলিক দল্গুলি জোট বাঁধত।সেই কারনে বড়দলের দাদাগিরি ছোট দলকে মেনে চলতে হতো। বর্তমান রাজনৈতিক আবহে জাতীয় স্তরে বিজেপি‌ বিরোধী ‘‌ফেডারেল ফ্রন্ট’‌ গড়ার উদ্যোগ দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে।একদল কংগ্রেস বিহীন ফেডারেল ফ্রন্ট গঠন করে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে চাইছে অন্য দলগুলি চাইছে, কংগ্রেস জোটে থাক কিন্তু রাহুল গান্ধীকে জোটের প্রধানমন্ত্রীর মুখ হিসাবে তুলে ধরা যাবে না। সমর্থনে আছে একদা ইউপিএ’র জোট শরিক অনেক দল। এই মতের পক্ষে অনেক আঞ্চলিক দলের সম্মতি আছে বুঝতে পেরে তড়িঘড়ি সোনিয়া গান্ধী তার দলের অবস্থান বদলে ফেলেছেন।

download

রাহুল গান্ধী যতই কংগ্রেস দলের সভাপতি হোন,এখনও দলের চালিকা শক্তি সোনিয়া গান্ধী। সোনিয়া অনেক দূরদৃষ্টি সম্পন্ন।পরিস্থিতি অনুযায়ী নমনীয় হতে জানেন।তিনি বুঝেছেন, কংগ্রেস আজ আর ক্ষমতার মধুভান্ড নয় যে ছোট দলগুলি এসে ভিড় জমাবে।একটার পর একটা রাজ্য হারিয়ে কংগ্রেস আজ নখদন্তহীন বাঘে পরিনত হয়েছে। অতীতে যারা কংগ্রেস দাদাগিরির শিকার হয়েছে তারা এখন শোধ তুলতে চাইছে। তাই সোনিয়া নিজে এবং গোলাম নবি আজাদকে দিয়ে বলাচ্ছেন- রাহুল প্রধানমন্ত্রীর মুখ নয়।কংগ্রেস চায় আগে সর্বসম্মত ফেডারেল ফ্রন্ট’‌ গঠন হোক তারপর সকলে বসে ঠিক করে নেওয়া যাবে কে প্রধানমন্ত্রী হবে। কংগ্রেস যদি আগামী ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে আন্তরিক ভাবে বিজেপিকে উৎখাত করে কেন্দ্রে ধর্ম নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে চায় তাহলে কংগ্রেসকে তার সমস্ত ইগো  পেছনে ফেলে বিভিন্ন রাজ্যে আঞ্চলিক দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতেই হবে।

এখানে মমতা ব্যানার্জির দেওয়া ‘একের বিরুদ্ধে এক লড়াইয়ের’ তত্ত্ব বড় হাতিয়ার হতে পারে। যে রাজ্যে যে দল শক্তিশালী তার সঙ্গে জোট করতে হবে। সেক্ষেত্রে বাংলায় তৃনমুল,অন্ধ্রপ্রদেশে তেলুগু দেশম পার্টি, তেলেঙ্গানায় টিআরএস, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে, বিহারে আরজেডি৷ বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কংগ্রেস-  সিপিএম, সবাইকে এটা উপলব্ধি করতেই হবে৷‌‘‌কর্ণাটকের নির্বাচন একটা বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার করে দিয়েছে, তা হলো, ‘‌ওয়ান-‌ইজটু-‌ওয়ান’‌ সূত্রই একমাত্র পথ৷’‌

গতস্য শোচনা নাস্তি, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। তবে একটা কাজের কাজ হয়েছে, কাঠের হাড়ি রোজ যে ছুলোয় চড়ানো যায় না সেটা অন্তত বিজেপিকে শিক্ষা দেওয়া গেছে।গোয়া, মনিপুর,মেঘালয়ে বিজেপি যা করেছে তা কর্ণাটকে এসে ধাক্কা খেয়েছে।

২০১৯ লোকসভার আগে, এই বছরের শেষের দিকে রাজস্থান,মধ্য প্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে বিধানসভার নির্বাচন রয়েছে। সবকটি রাজ্যে কংগ্রেসকে লড়তে হবে বিজেপির বিরুদ্ধে।বিগত দিনে মোদী, অমিত সাহ আর আরএসএস ত্রিফলার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাহুল গান্ধীর সফলতার গ্রাফ খুবই নিম্নমুখী।উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট এবং কর্ণাটকের ভোটের শেষে এটা প্রমান হয়েছে যে রাহুল গান্ধীর গ্রহণযোগ্যতা এখনও জনমানসে পোক্ত হয়নি। তার ওপর বিজেপির পক্ষ থেকে লাগাতার পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে আক্রমন রয়েছে। এই তিন রাজ্যের জন্য বিজেপির কি কৌশল হতে চলেছে তা এই মুহূর্তে কারোর পক্ষে জানা সম্ভব নয়।তার ওপর কর্ণাটকে মোদী অমিত জুটি যে বেইজ্জত হয়েছে তা গুলি খাওয়া বাঘের সঙ্গে তুলনা করা যায়।সরকারে থাকার সব রকমের সুযোগ সুবিধা প্রয়োগ করতে পিছপা হবে না বিজেপি।সংবিধান, গনতন্ত্র সব সিকেয় তুলে ছাড়বে।এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের সামনে একমাত্র পথ খোলা রয়েছে যে যেখানে শক্তিশালী তার সঙ্গে জোট করে ‘একের বিরুদ্ধে এক’ লড়াই। বিজেপি ধাক্কা খেয়ে যাবে।নাহলে কংগ্রেসকে পাঞ্জাব, মিজোরাম ও পুদুচেরির মতো রাজ্যেই আটকে থাকতে হবে৷ ‌

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *