পশ্চিমবঙ্গে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, সামাজিক মাধ্যম কতটা দায়ী?, পায়েল সামন্ত

7th1_web-750x500.jpg.pagespeed.ce.RBNFNdIQEtসব মতের প্রতি সহিষ্ণুতার কথা বলে ভারতীয় সংবিধান৷ কিন্তু ইদানিং উগ্রতাই হয়ে উঠেছে ভারতীয় রাজনীতির মুল উপাদান। পশ্চিমবঙ্গও গা ভাসিয়েছে এই স্রোতে।গোদের ওপর বিষফোড়া সোশ্যাল মিডিয়া। সমাজ গঠনের ইতিবাচক মৌলিক দিকগুলি তুলে ধরার বদলে হিংসা, ঘৃনা দিয়ে বিরোধীদের ঘায়েল করার মাধ্যম হয়ে উঠেছে। করছে।

সম্প্রতি রানিগঞ্জ-আসানসোল কাণ্ডের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় ও তার মেয়েকে নেট দুনিয়ার হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে। আসানসোলের নূরানি মসজিদের ইমাম ইমদাদ উল্লাহ রশিদিকে নিয়ে গান বেঁধে নেটে হুমকি পেয়েছেন কবীর সুমন৷ যদিও সুমন বাবুর ঘন ঘন অবস্থান বদল তার ওজন অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। তবুও। ভাইয়ে ভাইয়ে দাঙ্গার রাজনীতি যে অন্যখাতে বইতে শুরু করেছে এবার তা স্পষ্ট৷ এর আগে পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়েছিল প্রকাশ্যে কটুক্তির রাজনীতি৷ সে তালিকায় বাম জমানার অনিল বসু থেকে শুরু করে হাল আমলের তাপস পাল, অনুব্রত মন্ডল সকলেই আছেন৷ আবার কারণে-অকারণে সোশ্যাল মিডিয়া নামক প্রকাশ্য স্থানে চলছে খুন জখমের হুমকি৷ বোঝাই যাচ্ছে, এবার শুরু হয়েছে হুমকির রাজনীতি৷ এইভাবে চলতে থাকলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আমাদের সাধের বাংলা।

রামনবমী পালনকে কেন্দ্র করে ফের সেই প্রশ্ন ঘুরেফিরে এলো৷ সর্বমতের সমন্বয় যেখানে মূল মন্ত্র, তার জায়গায় ঘাঁটি গাড়ছে উগ্র কট্টরপন্থা৷ প্রশ্ন উঠছে, শুধুই কি উগ্র কট্টরপন্থা? নাকি রাজনীতি থেকে সমাজ বা সোশ্যাল মিডিয়া জীবনের সব স্তরেই ক্রমশ আধিপত্য বাড়াচ্ছে অসহিষ্ণুতার ভাইরাস?

হিন্দু ও মুসলিম মৌলবাদ হাত ধরাধারি করে এগোচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশে, একে অপরকে পুষ্ট করছে৷ এসবই প্রমাণ করে পারস্পরিক অবিশ্বাস, অনাস্থা ক্রমশ আমাদের ভেতর জাঁকিয়ে বসছে৷ এটাই আসলে হিংসা আর উগ্রতার উৎস৷ রাজনীতি একেই অবলম্বন করছে, কখনও তার জন্ম দিচ্ছে ভোটের স্বার্থে৷

যারা সাম্প্রদায়িকতার বিষ নেটে ছড়াচ্ছে তারা অধিকাংশ ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে ফেসবুকে সাম্প্রদায়িকতার হানাবাড়ি তৈরি করছে।  এ রাজ্যের এক বাসিন্দাকে রাজস্থানের হিন্দুত্ববাদীরা লাঙল দিয়ে মেরে ফেলল এবং তাকে পোড়ানো হচ্ছে সেই বীভৎস দৃশ্যকে ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা হচ্ছে, এটা কীসের ইঙ্গিত? কেন আমরা এখনো বুঝতে চাইছি না !

এখন অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন সোশ্যাল মিডিয়ায় হুমকির ক্ষমতা কত? আমি বলব অসীম। ভুলে গেলে চলবে না মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা নিধনে ফেসবুক থেকে যে উসকানি ও বিদ্বেষমূলক প্রচার করেছিল, সেটার অভিযোগ খোদ ফেসবুক কর্তা স্বীকার করেছেন৷ এবং পশ্চিমবঙ্গে বাদুড়িয়া কাণ্ডের উস্কানিমুলক প্রচার এই ফেসবুক থেকেই শুরু হয়েছিল।

ফেসবুক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই৷ অসহিষ্ণুতা কেবল ভার্চুয়াল জগতেই তো নয়, অতীতে উগ্রতা ও ঔদ্ধত্যের রাজনীতি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হাত ধরে শুরু৷ইতিহাস সাক্ষী।  ২০০৭ সালে বামপন্থীরা নন্দীগ্রাম পুনর্দখল করার পর বাম নেতারা সূর্যোদয় বলে আখ্যা দিয়েছিলেন৷ সেই সময় বুদ্ধবাবু বলেছিলেন ‘অপোজিশন পেইড ব্যাক ইন দ্য মেন কয়েন’৷শিউরে উঠছি,  সে সময়ে ফেসবুকের আধিপত্য থাকলে ব্যাপারটা কোথায় দাঁড়াত।বিজেপি সেই ট্র্যাডিশনকে পুঁজি করেছে। বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ ঔদ্ধত্যে, বেঁফাস, উগ্র মন্তব্যে নজির গড়েছেন৷ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারী ছাত্রী থেকে বাংলার বিদ্বজন, এমনকী নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সম্পরকেও অশালীন মন্তব্য করতে কসুর করেননি।এসবই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে  প্রতিহিংসার রাজনীতি ছড়াচ্ছে।

বাংলায় প্রতিহিংসার রাজনীতি এখনো ভয়াবহ জায়গায় যায়নি।সচেতন হলে রাস টানা জাবে।কিন্তু বাংলার বাইরে হিন্দুত্ববাদীরা যা করছে, সেটা একতরফা৷ নাৎসীরা যেমন ইহুদিদের একতরফা আক্রমণ করেছিল এখানে তাই হচ্ছে৷ সারা ভারত জুড়ে৷ বাংলায় দু’জন ইমামের সঙ্গে যা ঘটেছে, তার পরবর্তী শান্তি ও সহাবস্থান  প্রমাণ করছে, ব্যাপারটা দাঙ্গার পর্যায়ে যায়নি৷ কিন্তু একদল ইমামদের সঙ্গে এই আচরণ দাঙ্গা উসকাতে চেয়েছিল৷

আসানসোলে হুমকি দেওয়ার পর বাবুল এবার পাল্টা হুমকি কি অনুভব করতে পারছে। ছেলে- মেয়েকে হুমকি দিলে সব বাবা মায়েরই এক অবস্থা হয়।তাপস পাল তার অবস্থাও সকলে দেখছে। বীরভূমে পাড়ুইয়ের সাগর ঘোষ হত্যাকান্ডের সঙ্গে অনুব্রতর নাম জড়িয়ে আছে। ইনি প্রকাশ্যে পুলিশকে বোমা মারার হুমকি দিয়েছিল এবং সেটা সামাজিক মাধ্যমে গণহারে ছড়িয়ে পড়ে। তৃনমুল দল কখনই অনুব্রতকে সংযত হওয়ার পরামর্শ দেয় না। উল্টে মাথায় অক্সিজেন কম সরবরাহের দোহাই খোদ মুখ্যমন্ত্রী দিয়ে থাকেন। রাজনৈতিক দলের সুপ্রিমোর উক্তি যদি এমন হয় তাহলে অনুব্রতকে দুষে লাভ কি।

আসানসোল কাণ্ডে বাবুলের মন্তব্যকে ঘিরে দলের সাফাই- ওটা ‘বাবুলের ব্যক্তিগত মতামত’ ব্যাস, এটা বলেই দল দায় সেরে নিল !

শাসক বিরোধীদের মধ্যে বিধানসভায় ও তার বাইরে পক্ষে বিপক্ষে  টিকা টিপ্পুনি, তির্যক মন্তব্য লেগেই থাকে। বাংলাও এর বাইরে নয়। কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল শালীনতা। বঙ্গ বিধানসভার ইতিহাস তার প্রমান। বামেরা এই সংস্কৃতি কলুষিত করার অগ্রদুত।কিন্তু বর্তমানে রসাতল অবস্থা।অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের কথায়, সকলে উসকানিমূলক পরিস্থিতিতে শান্ত থাকতে পারেন না ৷ বেশিরভাগই উল্টোপাল্টা কথা বলে ফেলেন৷ এটার জন্য সঠিক রাজনৈতিক অনুশীলনের একান্ত প্রয়োজন। কারা আজ বিধানসভায় দেখতেই পাচ্ছেন। ভিনদেশী কিছু মানুষ, যাদের বাংলার কৃষ্টি সংস্কৃতি সম্পর্কে কোন ধ্যান ধারনাই নেই আজ তারা নেতৃত্ব দিচ্ছে। এ দোষে একা বিজেপিকে দোষারোপ করলে অন্যায় হবে।

এই সব মানুষগুলিকে চিনতে হবে আমাদের এবং সতর্কতার সঙ্গে হিংসা আর বিষোদগারের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। ফেসবুক তো নেহাত মাধ্যম৷ আমরা নিজেরা যদি বন্ধ না করি তাহলে ফেসবুককে দোষ দিয়ে লাভ কী?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *