পদ্মাবতী- ধর্মের ফতোয়া নাকি ভোট রাজনীতি, লিখেছেন সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

maxresdefault

ভোট বড় বালাই আর উন্নয়নও বন্ধ
তাই কি এতো ফতোয়া? প্রতিবাদী গন্ধ!  

এ কোন ভারতবর্ষ যেখানে সাংস্কৃতিক জগত ও শিল্পীরা বিপন্ন। শিল্পীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপই শুধু নয় তাদের মেরে ফেলার হুমকি পর্যন্ত। কখনও তাদের অঙ্গহানি আবার তাদের মাথার দাম ধার্য করছে মোদীর ডিজিটাল ভারতের মহামহিমরা। এবং এরপরও তারা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে। দেশের অতীতের প্রধানমন্ত্রীরা শিল্পী জগতের প্রতি শ্রদ্ধা আর সাংস্কৃতিক মনভাবের পরিচয় রেখেছে। কথিত গায়িকা লতা মঙ্গেশকারের গাওয়া দেশাত্মবোধক সঙ্গীত শুনে সজল নয়নে পন্ডিত জওহারলাল নেহেরু শিল্পীকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানান। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী শান্তিনিকতেনর পঠনপাঠনে শিক্ষিত তাই স্বাভাবিক ভাবেই দেশবাসী চিরকাল তার রুচি এবং শৈল্পিক জগতের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন পেয়েছেন। আর, আজ মোদীজির ভারতে  প্রমাণ হয়ে গেছে বারবার ভোটব্যাঙ্কের ভার বাড়াতে প্রশয়ের রাজনীতিকে সমর্থন। সামনে গুজরাটের ভোট, রাজপুত ভোটারের সংখ্যাও যথেষ্ট  আর উন্নয়নও তথৈবচ তাই পদ্মাবতীর কাঁধে বন্দুক রেখে ভোট বৈতরণী পেরনোর প্রচেষ্টা।

সঞ্জয় লীলা বানসালির সিনেমা ‘পদ্মাবতী’ রিলিজে করতে দেওয়া যাবেনা বলে ফতোয়া জারি  করলো গুজরাটের ‘বিজয় রুপাণি’। তারপরেই রাজস্থানের বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া। দেশ জুড়ে পদ্মাবতী বন্ধের আন্দোলনের নামে অহিংসার আগুন জ্বালানোর সাথে পরিচালকের কাটামুন্ডুর দাম ধার্য আর দীপিকার নাক কেটে নেওয়ার ফতোয়া জারি। কারণ রাজপুত রাণী পদ্মীনি আলাউদ্দীন খিলজীর হাত থেকে  সম্ভ্রম বাঁচাতে ১৬০০০ রাজপুত রমণী সহ জহর ব্রতর মাধ্যমে জ্বলন্ত অগ্নিতে প্রাণ দেন। সিনেমায় নাকি আলউদ্দীনের প্রতি পদ্মিনী তার আসক্তি প্রকাশ করেছে। রাজপুত রমণী হয়ে বেশ্যার মত নৃত্য প্রদর্শন করেছেন স্বামী সমীপে। তাই এ সিনেমা প্রকাশ করা যাবেনা।

ইতিহাস বড় কঠিন অতীতের সত্য। ঐতিহাসিক ঘটনা গল্পের খাতিরে দেশ-কাল-সীমানা পেরিয়ে কিছুটা রকম ফের হয় কিন্তু বদলায় না অবশ্যই। ইঁট কাঠ পাথরের ভগ্নস্তুপের আড়ালে ইতিহাস ফিসফিস করে সবাক হয়। শিল্পী তার কলমে, তুলিতে, ক্যামেরার লেন্সে তাকে নিজস্ব রুপ দেয়। তাইতো কবির চেতনার রঙে পান্না হয়ে ওঠে সবুজ। কখনো শুধু নাম বা বংশ পরিচয় ঢেকে দেয় ব্যক্তির কুকীর্তি, আবার কখনো কর্ম হারিয়ে দেয় বংশ পরিচয়কেও। এমনই এক নারী সাহসিকতার মূর্তরুপ পদ্মাবতী। দৃঢ়চেতা এই নারীর ভাগ্যে ঘনিয়ে এসেছিল  অকস্মাৎ নিয়তির চরম পরিহাস।

অনেকটা রুপকথার মতোই এই কাহিনী। অপরুপা পদ্মিনী ছিলেন সিংহলের (শ্রীলঙ্কা) রাজকন্যা। চিতোরের রাজা রাওয়াল রতন সিং এর দ্বিতীয় স্ত্রী।রতন সিং এর সভায় রাঘব চেতন নামে এক সঙ্গীতকার ছিলেন, যে আবার গোপনে জাদুবিদ্যা চর্চা করতো। সেসময় রাজ্যে জাদুবিদ্যা চর্চা নিষিদ্ধ ছিল। একদিন জাদুচর্চার সময় হাতে নাতে ধরা পড়লে রাজা তাকে রাজ্য থেকে নির্বাসিত করেন। এই অপমানের জ্বালায় প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে ওঠে রাঘব চেতন। সে সোজা দিল্লী চলে গিয়ে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজীর দরবারে আশ্রয় নেয়।আলাউদ্দিন খিলজী ছিলেন খিলজী বংশের দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে ক্ষমতাধর শাসক। তিনি সম্পদ ও ক্ষমতালোভী ব্যক্তি ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর চাচা জালালউদ্দিনের কাছেই মানুষ হন। পরিণত বয়সে তিনি জালালউদ্দিনের এক কন্যাকে বিয়ে করেন এবং কারা রাজ্যের শাসক হিসেবে নিযুক্ত হন। কিন্তু তার বরাবরই লোভ ছিল সিংহাসনের প্রতি।

নিজের কূটপরিকল্পনা সফল করার লক্ষ্যে তিনি প্রথমে পার্শ্ববর্তী হিন্দু রাজ্যগুলোর উপর আক্রমণ করতে থাকেন এবং প্রচুর ধন-সম্পদ হস্তগত করে নিজের সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে থাকেন। এদিকে জালালউদ্দিন ভাবতে থাকেন, এসব ধন-সম্পদ বোধহয় তারই জন্য।১২৯৬ সালে আলাউদ্দিনের সাফল্যের খবর শুনে জালাউদ্দিন গোয়ালিয়র আসেন তার সাথে দেখা করার জন্যে। আলাউদ্দিন অভ্যর্থনা জানাবার ছলে  আলাউদ্দিন তাকে হত্যা করেন। আলাউদ্দিন খিলজী নিজেকে দিল্লীর অধিকর্তা ঘোষণা করেন।

মসনদে বসে অমুসলিমদের উপর আলাউদ্দিন জিজিয়া, খরাজ, কারি ও চারি, চার ধরনের কর ব্যবস্থার প্রচলন করেছিলেন। মাত্র কয়েক দশক পুরোনো ইতিহাসেরও অনেক বিষয় অনেক সময় মেনে নিতে সংকোচ হয় মানুষের। সেখানে আমরা জানছি কয়েকশ বছর আগের ইতিহাস। মনে রাখতে হবে, সে সময়টা ছিল আলাদা, আর কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা উচ্চ বংশ কখনোই পৃথিবীর বুকে একজন মানুষের চরিত্র নির্ধারণ করেনি।

প্রতিশোধপরায়ণ ‘রাঘব’ রানী পদ্মাবতীর রুপের গুণাগুণ বর্ণনা করতে থাকে সুলতানের কাছে। সেই রুপকথনের জালে জড়িয়ে আলাউদ্দিন খিলজী প্রাসাদে ফিরে তৎক্ষণাৎ চিতোরের দিকে সৈন্য পরিচালনার আদেশ দেন।কিন্তু চিতোর পৌঁছে হতাশ হন খিলজী। রতন সিং এর দুর্গটি ছিল অনেক বেশি সুরক্ষিত। বাধ্য হয়ে তিনি রতন সিং এর কাছে খবর পাঠান যে তিনি রানী পদ্মাবতীকে শুধু এক ঝলক দেখতে ইচ্ছুক। তাকে দেখতে পেলেই তিনি সসৈন্যে দিল্লী ফিরে যাবেন।  একজন রাজপুত নারীর জন্য এই প্রস্তাব ছিল অসম্মানজনক। তাদের প্রথা অনুযায়ী অচেনা ব্যক্তির সাথে দেখা করা নারীদের জন্য বারণ ছিল। কিন্তু নিশ্চিত যুদ্ধ এড়াতে রতন সিং পদ্মাবতীকে রাজি করান। শর্ত থাকে যে, আলাউদ্দিনকে আয়নায় রানীর প্রতিচ্ছবি দেখতে হবে। মহলের একটি কক্ষে এমনভাবে কিছু আয়না স্থাপন করা হয় যাতে সরাসরি সাক্ষাৎ না করে দূর থেকেই রানী নিজের প্রতিবিম্ব দেখাতে পারেন। কিন্তু এই উপায়ে রানীকে চাক্ষুস দেখার পর আলাউদ্দিনের বদ অভিপ্রায় আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। যে করেই হোক পদ্মাবতীকে তার পেতেই হবে!
শিবিরে ফেরার সময় কিছুদূর পর্যন্ত পথ রতন সিং আলাউদ্দিনকে এগিয়ে দিতে আসেন। এই সুযোগের ফায়দা নিয়ে আলাউদ্দিন রতন সিংকে তৎক্ষণাৎ অপহরণ করে ফেলেন। রাজার মুক্তিপণ হিসেবে তিনি দাবী করেন রানী পদ্মাবতীকে।পরদিন ১৫০, কোনো বর্ণনামতে ২০০ পালকি খিলজীর শিবিরের দিকে রওনা হয়। প্রত্যেকটি পালকি ছদ্মবেশে চারজন করে দুর্ধর্ষ রাজপুত যোদ্ধাদের দ্বারা বাহিত হচ্ছিল আর প্রত্যেক পালকিতে দাসীর বদলে লুকিয়ে ছিল আরও চারজন করে যোদ্ধা। এই প্রতিহিংসাপরায়ণ ভয়ানক সৈন্যদলটি খিলজীর শিবিরে পৌঁছেই অতর্কিত হামলা করে। আলাউদ্দিন খিলজীর শিবিরে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালিত করে এই সেনাদল রাজা রতন সিংকে মুক্ত করে নিয়ে যায়।

এই ঘটনার পর দ্বিগুণ আক্রোশে আরও বেশি সৈন্য চালনা করে আলাউদ্দিন চিতোরের দুর্গ অবরোধ করেন। অতি সুরক্ষিত সেই দুর্গে প্রবেশ করতে না পারায় অবরোধই ছিল একমাত্র পথ। দিনের পর দিন অবরুদ্ধ থাকার পর দুর্গের ভেতরে রসদ ফুরিয়ে এলে রাজা রতন সিং সিদ্ধান্ত নেন দুর্গের ফটক খুলে মুখোমুখি হবার। দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ থাকার পর রাজপুতদের জন্য এ যুদ্ধ ছিল অসম যুদ্ধ। পদ্মাবতী ও দুর্গের অন্যান্য নারীরা জানতেন এ যুদ্ধে তাদের পুরুষদের জয়ের সম্ভাবনা কতোটা ক্ষীণ। এরকম পরিস্থিতিতে সম্মান রক্ষায় রাজপুত নারীদের মধ্যে ‘জওহর ব্রত’ নামক আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহননের এক রকম প্রথার প্রচলন ছিল। বিজয়ী সৈন্যদের হাতে লাঞ্চিত হবার চেয়ে মৃত্যুকেই তারা বেশি সুখকর মনে করলেন।

রাতে দুর্গের ভেতরে এক বিশালাকার অগ্নিকুন্ড জ্বালানো হলো। সবার আগে আগুনে ঝাঁপ দিলেন রানী পদ্মাবতী, অন্য নারীরা তাকে অনুসরণ করলেন। স্বজনহারা সৈনিকদের বেঁচে থাকার আর কোনো উপলক্ষ্য থাকলো না। পরদিন সকালে যুদ্ধের সাজে সেজে খিলজী বাহিনীর সাথে লড়তে বেরিয়ে গেলো রাজপুতদের দল। ফলাফল যা হবার তাই হলো। খিলজীর সেনাদল যখন দুর্গে প্রবেশ করল তখন শুধু নারীদের দেহাবশেষ আর ভস্মই পেলো। যার মোহে এতো জনবল ক্ষয় করলেন আলাউদ্দিন খিলজী, তাকে তার পাওয়া হলো না।

রানা প্রতাপের আমলে রাজপুত ইতিহাস গ্রন্থ ‘খুমান খায়সায়’ স্থান পায় এই কাহিনী। তবে স্বাভাবিকভাবেই, বিভিন্ন ঐতিহাসিকের জবানীতে এই কাহিনী কিছুটা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে এসেছে। অনেকের মতে আবার এই কাহিনী রাজপুত ইতিহাসকে গৌরবান্বিত করতে লিখিত নিছক রুপকথা। তবে কাহিনীটির কতোটা সত্য, আর কতোটা মিথ্যা তা বর্তমানে নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা একেবারেই অসম্ভব।

এই ইতিহাস নিয়ে একটি সিনেমা তৈরি করছেন সঞ্জয় লীলা বানসালী। অভিযোগ উঠেছে তিনি ইতিহাস বিকৃত করে আলাউদ্দিন খিলজীর চরিত্রটি নমনীয় করার চেষ্টা করেছেন। উগ্র জনতা পরপর কয়েকবার সেই সিনেমার সেটে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগও করেছে।সেন্সর বোর্ড, কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে ছবিটির মুক্তি আপাতত স্থগিত করার আবেদন জানিয়েছে গেরুয়া বাহিনী। গেরুয়া শিবিরের দাবি, ক্ষত্রিয়দের ভাবাবেগে আঘাত করছে ‘পদ্মাবতী’।

‘ছবির শ্যুটিংয় সময় রাজস্থানে সেটে ভাঙচুর চালিয়েছিল রাজপুত করনি সেনা। বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ দেখিয়েছে সঙ্ঘ পরিবারের সংগঠনগুলি। তাদের দাবি, নৃশংস, অত্যাচারী আলাউদ্দিন খিলজি ও পদ্মাবতীর সম্পর্ক বিকৃতভাবে দেখানো হয়েছে ছবিতে।বিজেপির মুখপাত্র আইকে জাদেজার কথায়, ”ইতিহাসকে বিকৃত করে আগ্রাসী শাসক ও পদ্মাবতীর সম্পর্ক দেখিয়েছেন পরিচালক। আপাতত ওই ছবিটির মুক্তি রদের জন্য সেন্সর বোর্ড, কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে আমরা চিঠি দিচ্ছি।

“এই প্রথম নয় মোদী রাজত্বে সাহিত্যিক নয়মতারা সায়গালদের অপমান করা হয়, গুলাম আলীর সঙ্গীত অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়, সুধিন্দ্র কুলকার্ণীর মুখে কালি লেপে দেওয়া হয়, অভিনেতা নাসিরুদ্দিন সাহকে দেশদ্রোহী আখ্যা দেওয়া হয়, কালবুর্গী, গোবিন্দ পানসেরেকে হত্যা করা হয়। এই হচ্ছে মোদীর ডিজিটাল হিন্দু ভারত। অম্বেদকারের স্বপ্নকে মাটিতে গুড়িয়ে দেওয়ার কালবেলা চলছে এ ভারতে। সতীদাহ প্রথা আর জহরব্রত অনেকাংশেই মিলেমিশে। সতীদাহতে সমাজের মাথারা জোর করত অসহায় বিধবাকে জহরব্রত তে অসহায় বিধবার বা নীরীটির আর কোন উপায়ই থাকেনা। দুক্ষেত্রেই নারীর অসহায়তা মিলেমিশে যায়। সমাজের মাথারা তান্ডব চালায়। সমাজপতিরা ফতেয়া জারি করে। আজ মোদীর ডিজিটাল ভারতে বড় বেশী প্রয়োজন রামমোহন রায়, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের। কারণ এই মণীষিরাই পারেন ভারতের বিবেককে জাগ্রত করতে। আজ সুশীল সমাজ চুপ করে বসে থাকলে চলবেনা। প্রশ্ন উঠুক পদ্মীনি নারী তাই কেন তার অধিকার নেই স্বামীর সঙ্গে মনোরঞ্জনের সময় নিজেদের মত নাচেগান করার। কেন তাকে বেশ্যা আখ্যা দেওয়া হবে?

সে নারী তাই কেন সে রণকৌশলে প্রতিপক্ষ পুরুষটিকে মেপে নিতে পারবেনা? কেন পদ্মীনি নিয়ে যে আন্দোলন কৃষক মৃত্যুতেও তা হবেনা? কেন মসজিদের জায়গাতেই মন্দির তৈরী হবে? মন কি এ বাত মনকে বড় বিচলিত করে। সুশীল সমাজ শিল্পের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোলাগাকে আলাদা করুক। গর্জে উঠুক। ঘুমর ঘুমর তালে বাজুক ঘুঙুর। পদ্মীনি শুধু চরিত্র নয় হয়ে উঠুক প্রতিবাদী নারী । রাজনীতির কারবারীদের বিরুদ্ধে উঠুক আওয়াজ। ঐক্যতান বাজুক আজ।

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *