ন্যায় অন্যায় বোধটা প্রখর ছিল, জীবন দিয়ে প্রতিবাদ করে গেছেন।

Dr-Shyam-Prasad-Mukharjee-1488118074_835x547বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠের ভারতমাতা আর অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বঙ্গমাতা এই দুই মাতাই ছিল শ্যামাপ্রসাদের আরাধ্য।শ্যামাপ্রসাদ যদি না থাকতো তাহলে ১৯২৬ সালেই শরৎচন্দ্রের বহু বিতর্কিত উপন্যাস ‘পথের দাবী’র অপমৃত্যু ঘটতো।

ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী মাত্র ২৯ বছর বয়সে ১৯৩০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট-সিন্ডিকেট সদস্য নির্বাচিত হন। মাত্র ৩২ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মনোনীত হন। ১১টি সমাবর্তন অনুষ্ঠানের ভাষণ তার প্রাজ্ঞতার পরিচয় বহন করে।যা আজও অম্লান। ১৯৩২ সালের ২৩ জুলাই শ্যামাপ্রসাদ সিন্ডিকেট মিটিংয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদ অলঙ্কৃত করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।যদিও সেই সময়ের বঙ্গসমাজ এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে সমালোচনার ঝড় বইয়ে ছিল কিন্তু শ্যামাপ্রসাদকে টলানো যায় নি।

১৯৩২ সালের সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা ও ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন বাংলার পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ করে তোলে। তিনি শিক্ষাঙ্গন ছেড়ে রাজনীতিতে না আসতে চাইলেও শিক্ষাব্যবস্থার উপর সাম্প্রদায়িক উদ্যত ছোবল তাঁকে ব্যথিত করে। ১৯৩৬ সালের ১৫ জুলাই টাউন হলে Calcutta Municipal Bill ও Secondary Education Bill-এর প্রতিবাদ সভায় নিজের অবস্থানকে স্পষ্ট করেন। শ্যামাপ্রসাদের লেখা Leaves from a Diary থেকে- ‘Then Came two…The Calcutta Municipal Bill and the Secondary Education Bill. It was the letter which forced me out of my academic restriction where education was made the play thing of party and communal politics, I felt it my duty to rouse public opinion.’

১৯৩৭ সালের নির্বাচনে হিন্দু সমর্থিত কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র বসু, মুসলিম লিগ নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন ও কৃষক প্রজা পার্টির নেতা ফজলুল হক কেউই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। কৃষক প্রজা পার্টিকে সমর্থন দিতে কংগ্রেস অস্বীকার করলে কৃষক প্রজা পার্টির সঙ্গে মুসলিম লিগের সরকার গঠিত হয়।

১৯৩৯ সালের আগস্ট সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি হিন্দু মহাসভার নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকার কলকাতায় আসেন।শ্যামাপ্রসাদ সাভারকারের অনুরোধে হিন্দু মহাসভার কার্যকরী সভাপতি ও বাংলার সভাপতি নির্বাচিত হন। তৎকালীন ঘৃন্য সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আবর্ত তাকে রাজনীতিতে টেনে এনেছিলেন,একথা তিনি নিজের ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করেছেন- ‘1939 continued to be a year of Hindu oppression at the hands of communal ministry Fazlul Haq at its head, Legislative and administrative measures were either adopted or advocated which aimed at a deliberate curtailment of Hindu rights. So long as such activities related to departments other than education, I have my protests recorded in the Assembly but did not find it possible to mobilize public opinion outside.

১৯৪০ সালের ২৪ মার্চ মুসলিম লিগ পাকিস্তান প্রস্তাব পাস করে। লিগের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে হিন্দু মহাসভা ও কৃষান প্রজা পার্টির সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ-হক মন্ত্রিসভায় যোগদান করে। ১৯৪১ সালের নভেম্বরে হক সাহেব মুসলিম লিগ ছেড়ে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধতে অগ্রসর হন। ডঃ মুখার্জী ১১ই ডিসেম্বর ১৯৪১ থেকে ২০ নভেম্বর ১৯৪২ অবিভক্ত বাংলার অর্থমন্ত্রী রূপে দায়িত্ব পালন করেন।এই সময় কাজী নজরুল ইসলামের ভয়ঙ্কর আর্থিক অনটন চলছিল।নজরুল ইসলাম নিরুপায় হয়ে হক সাহেবের দ্বারস্থ হন। হক সাহেব আর্থিক সাহায্য দিতে অস্বীকার করেন। অবশেষে নজরুল ইসলাম ডঃ মুখার্জীর শরণাপন্ন হন এবং সহযোগিতা পান। ডঃ মুখার্জী নিজের মধুপুরে বাড়ি সস্ত্রীক কাজি সাহেবকে থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য।    কৃতজ্ঞ নজরুল ইসলাম মধুপুর থেকে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে একটা চিঠি লেখেন।

‘এই coalition ministry-তে একমাত্র আপনাকে আমি অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করি ও ভালবাসি, আর কাউকে নয়। আমি জানি আমরাই এই ভারতবর্ষকে পূর্ণ স্বাধীন করব। সেদিন বাঙালী আপনাকে এবং সুভাষবাবুকেই সকলের আগে মনে করবে-আপনারাই হবেন এদেশের পতাকার নায়ক’।

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ও সুভাষ বসুর মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল সুবিদিত। আর দুজনকেই ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়। ডঃ মুখার্জী ২৩ জুন ১৯৫৩সালে কাশ্মীরে শেখ আবদুল্লার কারাগারে ‘Medical Murder’-এর শিকার হতে হয়। আর নেতাজি তাইহকু বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে বলে বিশ্বজোড়া প্রচার করে দেওয়া হয়। দুটি ঘটনারই সত্য মিথ্যা আজও রহস্যে আবৃত।

১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে ব্রিটিশ দমন নীতির প্রতিবাদে মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক পদত্যাগ করেন। মুসলিমলিগ নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যভার গ্রহণ করেন। ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় নাজিমুদ্দিন মন্ত্রীসভার অসামরিক সরবরাহ মন্ত্রী সোহরাওয়ার্দির খাদ্যের ঘাটতির বদলে উদ্বৃত্তের কথা প্রকাশ করেন। কলকাতা ও নোয়াখালি দাঙ্গা প্রসঙ্গ তো আছেই।সবটাই জিন্নার ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’ (Direct Action) নামক নরমেধ যজ্ঞ ছিল।

১৯৪৭ সালের ২০ জুন বাংলার বিধানসভায় হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের প্রস্তাব পাকা হয়। ডঃ মুখার্জী সেদিন প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘If 25 percent Muslims could not agree to live in India, how could 44 percent Hindu live in Bengal under 54 percent Muslims.

সুরাবদ্দীরা পৃথক বাংলা চেয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস নেতা শরৎ বসু ও ১৪ জন হিন্দু সদস্য এবং মুসলিম লিগ নেতা আবুল হাফিস ও ১৬ জন মুসলিম সদস্য নিয়ে অবিভক্ত বাংলা গঠনের পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনা না হলে বাংলার হিন্দুদের শেষ আশ্রয় চলে যেত। বাঙালী হিন্দুরা ইহুদিদের মতো ১০০০ বছর যাযাবরের জীবন কাটাতে হত। বর্তমান পূর্ববঙ্গে ১২ শতাংশ সংখ্যালঘু হিন্দু আর পশ্চিমবঙ্গে ৩৬ শতাংশ সংখ্যালঘু মুসলিম। পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে ডঃ মুখার্জীর রাজনৈতিক বিচক্ষণতার ইতিবৃত্ত।

স্বাধীন ভারতে নেহেরুর মন্ত্রিসভায় শ্যামাপ্রাসাদ মুখার্জী শিল্পমন্ত্রী রূপে শপথ গ্রহণ করেন। ভারতের শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন শিল্প উন্নয়ন নিগম, প্রথম শিল্পনীতি প্রণয়ন, চিত্তরঞ্জন লোকমোটিভ স্থাপন, সিন্ধ্রি সার কারখানা-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। খড়গপুরে ভারতের প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স স্থাপনা, কলকাতার প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সোশাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্থাপনার ভাবনা তাঁরই মস্তিষ্ক প্রসূত।

১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের হত্যা, লুণ্ঠন ও নারীদের সম্ভ্রমহানি ইত্যাদি নিত্য ঘটনার প্রতিবাদে, ১৯৫০ সালে ১৪ই এপ্রিল নেহেরু- লিয়াকত চুক্তির বিরুদ্ধে লোকসভায় শ্যামাপ্রসাদ গর্জে ওঠেন। অবশেষে নেহেরু মন্ত্রিসভা থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯৫২ সালে শ্যামা প্রসাদ দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। তিনি লোকসভায় ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি নামে বিরোধী দলের প্রতিষ্ঠা করে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন।

জনসংঘ ঐ সময় বাংলা প্রদেশে ৮টি আসন ও রাজস্থানে ৮টি আসন লাভ করে। রাজস্থানে জমিদার প্রথা বিলোপ আইনের প্রশ্নে বিধায়করা দ্বিধাবিভক্ত ছিল। ডঃ মুখার্জী রাজস্থান পরিষদীয় দলের জরুরি বৈঠকে নির্বাচনী ইস্তেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরন করান। ওই সভায় আটজন বিধায়কের মধ্যে মাত্র দু’জন ভৈরব সিং শেখা‍ওয়াত ও জগৎ সিং জালান উপস্থিত ছিলেন। ডঃ মুখার্জী সেই দিনই বাকি ছ’জন বিধায়ককে বহিষ্কার করেন।এমনই ছিল তানার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা।

কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা চালু রাখলে অদূর ভবিষ্যতে সমস্যা বাড়তে পারে তা তিনি বারবার লোকসভার ভিতরে ও বাইরে ব্যক্ত করতেন।ভারতের অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে সংবিধানের বিশেষ অনুচ্ছেদ ৩৭০ ধারা বিলোপ ও পারমিটরাজ বাতিলের দাবিতে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী কাশ্মীর অভিযান করেন। ১৯৫৩ সালের ১১ই মে পাঞ্জাবের উধমপুরে শেষ সভাটি করে কাশ্মীর প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেফতার করা হয়।১৯৫৩ সালে ২৩ জুন বন্দি অবস্থায় শেখ আব্দুল্লার কারাগারে ডঃ মুখার্জীর মৃত্যু হয়।মৃত্যু প্রসঙ্গে ডঃ মুখার্জীর সেবায় নিয়োজিত নার্সের বক্তব্য খুব প্রাসঙ্গিক, ‘‘One lion has been killed by Abdullah.’’।

ডঃ মুখার্জীর মরদেহ নিয়ে কলকাতার মিছিলে মানুষের ঢল নামে। কলকাতা সহ সারা ভারতবর্ষের মানুষ শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুর বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল।শ্যামাপ্রসাদের মা যোগমায়াদেবী, মুখ্যমন্ত্রী ও চিকিৎসক বিধানচন্দ্র রায় পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তোলেন।

লোকসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় তখন লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ছিলেন।তিনি ব্রিটেনের একটি সংবাদ পত্রে ‘Hindu Leader Dead’ শিরোনামে খবর দেখতে পান। পরবর্তীকালে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় এই অনন্য ব্যক্তিত্বের বহুমুখী প্রতিভা প্রসঙ্গে লেখেন, ‘‘He was a great Indian, great patriot, great educationist, great orator and a great human being.’’

ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ভারতীয় রাজনীতিতে যে বহ্নিশিখা প্রজ্বলন করেছিলেন তা আজও রাজনীতির জটিল আবর্তে জ্বলে চলেছে। মৃত্যুকালে ২০,০০০ টাকা ব্যক্তিগত দেনা আর বিমা কোম্পানির কাছ থেকে ২০,০০০ টাকা প্রাপ্তি জীবনের শেষ স্থিতিপত্র। আজকের অধিকাংশ রাজনীতিবিদ এই বহ্নিশিখার কাছে সত্যই ম্লান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *