“নেহেরুর বউ”, সৌম্য আইচ রায়

13_11_2014-budhniসারা  ভারতের  আকাশে  তখন  নতুন  প্রভাতের  সূর্য। মানুষের  উন্নয়নের  আকাঙ্খায়  প্রতিদিন শিলমোহর  পড়ছে। পণ্ডিত নেহেরু  আসুমদ্র  হিমাচল  ছুটে বেড়াচ্ছেন  নতুন  ভারত  গড়ার  স্বপ্ন নিয়ে। আধুনিক  ভারতের  ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন  হচ্ছে  ভারত  জুড়ে।

এমনি এক সময় ১৯০৯, পূর্বভারতের  বাংলা ও বিহারের সংযোগ স্থলে শুরু হলো সব থেকে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প । ডিভিসি, দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন। আদিবাসী অধ্যুষিত  এলাকায় তদানিন্তন ভারতবর্ষে এক বিরাট কর্মযোগ্য।

শীতের সকাল উত্তরের হাওয়া বইছে হু হু করে। ১৩ বছরের বুধনি মাঝি , এখনও মনে আছে সেদিনের কথা। বুধনির কথায় কোম্পানি দামোদরের উপর বাঁধ দিচ্ছে। “আলো আইবেক, কারখানা হবেইক, কুতো লোক কাজ পাইবেক”।

তারই এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী টন্ত্রী আইবেক। মন্ত্রী এলেন বটে। সঙ্গে বাঁধ পড়লো বুধনি মাঝির জীবনে। সমাজ থেকে বাইদ গিলাম ওই বাঁধের কারনে।ঘটনাটা হলো ডিভিসি ড্যাম উদ্বোধন করতে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত  জহরলাল নেহেরু। কিন্তু যা হয় অতি উৎসাহি কিছু কর্মকর্তা সেই দিন বাঁধ উদ্বোধনে পণ্ডিত জহরলাল নেহেরুর গলায় মালা পরিয়ে দিলেন  বুধনি মাঝিকে দিয়ে।

পণ্ডিতজিও সেই মালাটি অপত্য স্নেহে ১৩ বছরের কিশোরী বুধনি মাঝির গলায় পড়িয়ে দিতে, ব্যাস তাতেই হলো সর্বনাশ। ওঁর সমাজের লোকেরা দাঁড়িয়ে দেখলো এই মালাবদল। আর প্রথামত যার সঙ্গে হবে মালাবদল সেই হবে স্বামী। এটা অনুষ্ঠানের পড়ে বুঝতে পারলেন ১৩ বছরের কিশোরী বুধনি। বুঝতে পারলেন ডিভিসি’র অফিসাররা এক ভয়ঙ্কর কাজ তাকে দিয়ে করিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু ততক্ষণে যা সর্বনাশ হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে।

ডিভিসি’র অফিসাররা ড্যামেজ কন্ট্রোল করার জন্য তৎক্ষণাৎ বুধনি মাঝিকে ডিভিসি তে চাকরি দিলেন। পরে বিষয়টি নেহেরুজির কানে উঠলো।

তিনি বুঝলেন যে তার অজান্তে , পরোক্ষে এক অবলা আদিবাসী, নিরক্ষর মেয়ের জীবনে কি সর্বনাশ ডেকে আনলেন। জীবনে ঘর সংসার হলোনা বুধনির। পেলনা স্বামী সুখ। পেলনা স্বামী সুখ। পেলনা সন্তান সুখও। আদিবাসী নিয়ম কানুন সব ভয়ঙ্কর। ঐখানকার আদিবাসী সমাজ ছুঁড়ে ফেলে দিল বুধনি মাঝিকে সমাজে জায়গা হলো না, ঐ বাঁধের উপর জীবন কাটাতে লাগলো বুধনি মাঝি।

গ্রামের মোড়ল মাতব্বর রা বললেন যেহেতু অন্য জাতের লোকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে তাই তার আর গ্রামে থাকা চলে না। সে সমাজ চ্যুত একঘরে।

চাকরি থাকায় প্রথমে খাওয়া পরার অসুবিধা হয়নি। কিন্তু তিন বৎসর পর গ্রামের মাতব্বরদের চালে ডিভিসি ওঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। কারন ওদের দাবি  ওখানে যেহেতু জলা জমি আদিবাসীরা দিয়েছে  ডিভিসি’কে তাই ডিভিসি’র চাকরি আদিবাসীদের ন্যায্য প্রাপ্য । কেন সমাজচ্যুত রা চাকরি পাবে। বুধনি মাঝি তো আদিবাসী সমাজের কেউ নয়।

বুধনি মাঝি ডিভিসি ছেড়ে চলে যায় বিহারে। অধুনা ঝাড়খণ্ড। তখন একটাই বিহার প্রদেশ ছিল। সেখানে দেখা হয় জনৈক সুধীর দত্ত নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। প্রেম ভালবাসা এবং এক স্থির জীবনের আশায় বুধনি মাঝির সাথে সুধীর বাবুর বিয়ে হয়। কিন্তু সমাজ ওদের বিয়েতে বাধ সাধে। এবং সারা দেয় না।

আদিবাসী নিয়মে একবার কারও বিয়ে হয়ে গেলে, স্বামী জীবিত থাকলে পুনঃবিবাহ অসম্ভব। অর্থাৎ পণ্ডিত নেহেরু তখনও বেঁচে। অনেক অনুনয় বিনয়ের পর, শেষমেশ তারা একসঙ্গে থাকার অনুমতিটুকু আদিবাসী সমাজের মাতব্বরদের কাছ থেকে আদায় করতে পেরেছিল। তাদের তিনটি সন্তানের জন্ম হয়।

১৯৮৫সালে তদানিন্তন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধির কানে পৌঁছয় বুধনি মাঝির কাহিনি। দাদুর না জানা ভুলের মুল্য চোকাতে তিনি বুধনিকে ডেকে নেন উড়িষ্যায়। যতটা সম্ভব মানবিক হৃদয় নিয়ে সাহাজ্য করেন বুধনি মাঝিকে। এবং বুধনি ডিভিসি’র চাকরিটা ফেরত পায়।

তবে সমাজে তার জায়গা হলোনা আজও। ৭৫ বছরের ‘কুলটা’ কে ক্ষমা করেনি ওদের সমাজ। কে বোঝাবে এটা কুপ্রথা। সমাজের অধিকাংশ বুধনির নাম ও প্রতিপত্তিতে ঈর্ষান্বিত। তবুও সমাজ হার মানেনি আর হার মানতে চায়নি।

একজনের গলায় মালা দেওয়া মানে যে বিয়ে হয়ে যাওয়া নয়, কে বোঝাবে এই সমাজকে।এমন সাহসই বা কোথায়  ভোটের রাজনীতিতে তাদের কেউ এই শিক্ষাটা কোনদিন দিতে যাবেনা। ওরা এই অন্ধকারে থাকলেই তো ওদের লাভ।

বুধনির শেষ ইচ্ছা একবার রাহুল গান্ধীর সাথে দেখা করার। নেহেরুজীর প্রপৌত্রের কাছে তিনি একটা ঘরের  ও ছেলেদের চাকরির আবেদন জানাতে চান।

আর সুশিক্ষিত সমাজের কাছে তার দাবী তারা যেন বুধনির  আদিবাসী সমাজকে শিক্ষিত করুক। আলো দেখাক নবজাগরনের। বোঝাক এইসব পুরোনো কুসংস্কার আসলে কোন শিক্ষা হতে পারেনা।

সমাজের নিয়মনিতি যুগে যুগে পাল্টায়। কেননা সময়ের সাথে তাকে তালমেলাতে হয়। যদিও উল্টো ঘটনা ঘটছে আজ। মানুষ যেন আরও বেশী করে পুরোনো ধ্যানধারনা সমাজের নামে, ধর্মের নামে, বেশী বেশী করে আঁকড়ে ধরতে চাইছে।

তাতে কাউকে চরম শাস্তি দেওয়া বা প্রয়োজনে খুন করতেও পিছপা হচ্ছেনা। তাই শুধু আদিবাসী কুসংস্কারকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আসলে সমাজ থেকে সুশিক্ষাটাই উঠে গিয়েছে।

সমাজ এখন রাষ্ট্রব্যবস্থার সাহায্যে পশ্চাৎ মুখে হাঁটছে। তাই বুধনি মাঝিদের নিজ সমাজে সন্মানে ফিরে যাওয়াটাই বোধহয় আর সম্ভব হবেনা। হারিয়ে যাবে তাঁর আত্মজ সমাজ থেকে। হয়তো সারাজীবন সমাজচ্যুত  হয়ে মন্দাকি বুধনি!

সৌম্য আইচ রায়

সৌম্য আইচ রায়

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *