“নেপাল-ভারত সীমান্ত সংকটে গোবিন্দ গৌতমের মৃত্যু থেকে কি শিক্ষা নিলাম”

kanchanpur-10032017074648-1000x0প্রাচীন প্রবাদ আছে-অন্যায় ও অত্যাচারের মাশুল গুনতে হয়।কোন কোনও ক্ষেত্রে এমন হয় মাশুল চোকানো যেন শেষ হতে চায় না।বর্তমান নেপাল-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেই রকমই অবস্থা।নেপালে রাজতন্ত্রের অবসান হয়েছে।প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রজাতান্ত্রিক(রিপাবলিক) নেপাল।প্রজাতান্ত্রিক নেপাল গঠনের শুরুর যে লড়াই তাতে আমেরিকার নেতিবাচক ভুমিকা থাকলেও শেষে মেনে নেয়।ভারত,আমেরিকার অবস্থানের সাথে তাল মিলিয়ে চলেছিল।পরে ভারত নির্ধারকের ভুমিকা পালন করে।যদিও, পরে যখন নেপালে নতুন কনস্টিটিউশন গঠন করা তখন ভারতের ভুমিকাকে বাদ রেখেই করা হয়।ভারত আন্দাজ করতে পারেনি আগের রাজতন্ত্রী নেপাল-ভারতের কলোনিয়াল দাসত্ব চুক্তির বাইরে গিয়ে নতুন নেপাল ভারতের সঙ্গে ভিন্ন কিছু সম্পর্ক করতে চলেছে!দিন বদলাচ্ছে এটা ভারতের অনুমান করা উচিৎ ছিল।সেইক্ষণে ভারত প্রাকটিক্যাল ভুমিকা পালন করলে আজ সম্পর্কটা অন্য ধারায় বইত কিন্তু দুর্ভাগ্য সেটা হয়নি।ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা সে প্রশ্ন উঠছে।কারন নেপালের মূল তিনটি রাজনৈতিক দল-নেপালি কংগ্রেস, লিবারেল বা ট্র্যাডিশনাল কমিউনিস্ট আর সশস্ত্র ধারার নতুন মাওবাদী কমিউনিস্ট যারা একসাথে সংসদের মোট ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আসনে প্রতিনিধিত্ব করে- এদের সবার সাথে ভারতের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে আছে।ভারত ভেবেছিল, নতুন নেপাল রিপাবলিক হলে ভারতের ক্ষতি নেই। নেপালকে ল্যান্ডলকড করা আছে মানে, ভারত দিয়ে ভৌগোলিকভাবে ঘেরা।ফলে নতুন নেপালও আগের মতোই ভারতের অনুগ্রহে এবং নিয়ন্ত্রণের থাকবে।এটা ভারতীয় আমলা ও গোয়েন্দাদের কলোনিয়াল দৃষ্টিভঙ্গি আর কিছুই নয়।নতুন নেপাল বাড়াবাড়ি করলে সীমান্তসংলগ্ন মাধেসি ও তরাই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সাথে নেপালের প্রধান ধারার জনগোষ্ঠীর, পাহাড়ি-সমতলী স্বার্থবিরোধকে উসকে দিয়ে তা থেকে নেপালকে টাইট দেওয়া যাবে এবং এটা করতে গিয়েই ভারত সব হারিয়ে ফেলেছে।
ভারত দ্বারা নেপাল ল্যান্ডলকড অবস্থাটি কি?নেপালের ছোট-বড় শহুরে জ্বালানি বলতে গ্যাসের ব্যবহার।নেপালের রিমোট গ্রামগুলিতে হয়তো আজও কাঠ জ্বালানি চলে, কিন্তু একটি সেমি-আরবান শহরও গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে অভ্যস্ত।এই গ্যাস নেপালে আসাটা নির্ভর করে যদি ভারত গ্যাস নেপালে আসতে দেয়।শুধু গ্যাসই নয়, নেপালে বরাবরই রান্নার গ্যাসসহ সব ধরনের জ্বালানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষ ও ভোগ্যপণ্য আমদানি করা হয় ভারতের ভেতর দিয়ে।ভারত নেপালের জনগণের চাহিদাকে পণবন্দী করে চাপে ফেলতে গিয়ে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।ক্রুদ্ধ নেপালের তিন প্রধান দল পারস্পরিক বোঝাপড়া করে নেপালে ভারতের সব প্রভাব ও স্বার্থকে অস্বীকার করেছিল।তিন প্রধান দল একজোটে ২০১৫ সালে সেপ্টেম্বরে তাদের নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা করে।নতুন কনস্টিটিউশনের ফলে ভারত নেপালের রাজনীতির ওপর সমস্থ প্রভাব ও নিয়ন্ত্রন হারাল।ভারত নেপালকে চাপে রাখতে পাঁচ মাস ধরে সব ধরনের পণ্য নেপালে যেতে বন্ধ করে দিয়েছিল।ভারত কতৃক এই চরম পদক্ষেপের ফলে নেপালের সাধারণ মানুষের মনে ভারত বিদ্বেষের জন্ম হয়।সম্পর্কের চরম অবনতি রাজনীতির গণ্ডি অতিক্রম করে আমজনতা  স্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল।

nepal-indiaনেপাল-ভারত সীমান্ত প্রায় ১৭০০ কিলোমিটার।সীমান্ত লাগোয়া বাসিন্দাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল অনেকটা একপাড়ার বাসিন্দা গেছে অন্য পাড়ায় সওদা কিন্তে।এবার সেই সম্পর্কেও আগুন লাগতে শুরু করল।সীমান্তে এক কালভার্ট নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত। ভারতের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী কোন আলোচনায় না গিয়ে সরাসরি গুলিচালনা করে এবং এক নেপালি তরুণের(গোবিন্দ গৌতম)মৃত্যু হয়।ঘটনার সারাংশ হল, সীমান্তে নেপালের কালভার্ট নির্মাণকে ভারতীয়রা দাবি করে, কালভার্টের অপর পার নোম্যান্সল্যান্ডে পড়েছে, তাই তাদের আপত্তি আছে। নেপালের বক্তব্য, সীমান্ত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক টেবিলে বসে ঠিক করা হোক।ভারত গুলি চালিয়ে হত্যা করে বল প্রয়োগের স্তরে নিয়ে গেল কেন?

নেপাল সরকারের কর্মকর্তাদের বক্তব্য,দ্বিপাক্ষিক ঐক্যমতের ভিত্তিতে কালভার্ট নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয় কিন্তু নির্মাণের পর নেপাল-ভারত সীমান্তে কাঞ্চনপুর জেলায় আনন্দবাজারে কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়।এই ঘটনাই সীমান্ত উত্তেজনা বাড়িয়েছে।’
৯ মার্চ সকাল থেকেই প্রায় ১০ হাজারের মতো ক্ষুব্ধ স্থানীয় নেপালিরা সঙ্ঘবদ্ধ হতে থাকে।ঘটনাস্থলে অনেক মিডিয়াও ছিল।তারা ভাঙা কালভার্টের স্থানে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। সীমান্ত সীমার অপর পারে ভারতীয় এসএসবিও সমবেত হয়।মিডিয়া বলছে এসএসবির লোকাল ইউনিট চিফ যাকে স্থানীয় ভাষায়‘থানেদার’ ডাকা হয়, পিস্তল বের করে পরপর চারটি ফায়ার করেন এবং চতুর্থ শটটি গোবিন্দকে কোমরে আঘাত করে।কথাগুলো বলছিলেন, দেবেন্দ্র খাড়কা, তিনি মৃতব্যক্তির এলাকার।গুলিতে আহত গোবিন্দকে ধানগাড়ী সিপি হাসপাতালে নিয়ে গেলেও বাঁচানো যায়নি।’
এসএসবির গুলি ছোড়ার ঘটনায় পরিস্থিতি যখন দ্রুত অবনতি হচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে আগুনে আরো ঘি ঢেলে দেয় নেপালের ভারতীয় হাইকমিশন।তিনি বিবৃতি দিয়ে বলেন ‘কাঞ্চনপুরের আনন্দবাজার সীমান্তে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।খুবই দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অপেশাদার মনোভাবের পরিচয় দিয়েছিলেন। যেখানে এসএসবি গুলি ছুড়েছে’ বলে দাবী করে বিবৃতি দেয় সেখানে হাই কমিশনের সব কিছু অস্বীকার করার কোন মানেই হয় না।স্বভাবিক ভাবে নেপালি জনগন ফুঁসে উঠে ভারতবিরোধী স্লোগান তুলে সারা নেপাল তোলপাড় করে ফেলে।পরিস্থিতি উত্তেজনাকর হয়ে ওঠায় একদিন পর ভারত তার অবস্থান বদলায়। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে জানায়, এসএসবি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করা হয়েছে।ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির হয়ে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অজিত দোভাল নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে সহমর্মিতা জানান এবং তদন্তের আশ্বাস দেন।নেপাল সরকার গুলিতে নিহত গোবিন্দ গৌতমকে শহীদের মর্যাদা দিয়ে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কাঞ্চনপুর জেলার ডোডা নদীর তীরে তার সৎকারের আয়োজন শুরু করে।

এব্যাপারে ভারতের অবস্থান যে ভুল ছিল তার প্রতিফলন ঘটে এনডিটিভির প্রতিবেদনে।নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসএসবির গুলিচালনার নিশ্চিত ব্যালাস্টিক পরীক্ষার রিপোর্ট ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে হস্তান্তর করেন।সুষমা,অভ্যন্তরীণ যাচাইয়ের রিপোর্ট এলেই শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অপর দিকে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখার প্রধান আকার পাতিল নিরপেক্ষ তদন্তের দাবী করেছেন।

একটা দেশের নাগরিক অন্য দেশের বাহিনীর ছোড়া গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা খুবই সিরিয়াস ইস্যু।এই ধরনের ইস্যুকে খুবই সতর্কতার সঙ্গে নাড়াচাড়া করা উচিৎ সেখানে হাইকমিশনের দায় অস্বীকার করে বিবৃতি সকলকে অবাক করেছে।অ্যাম্বাসি অফিসিয়ালদের এমন আচরণ যদি চলতে থাকে তাহলে ভারত কর্তৃক দীর্ঘ পণ্য অবরোধ যা ইতোমধ্যেই(২০১৫ সালে)ভারতের গায়ে দাগ লাগিয়েছে সেই সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটবে।নেপালের মধ্যে বয়ে চলা ভারতবিরোধী স্রোত নিশ্চয় ভারতের কোন স্বার্থ রক্ষা করছে না এটা ভারতের বোঝা দরকার।ভারতের উচিৎ বিষয়টিকে সত্তর বিবেচনার সঙ্গে সমাধান করা নচেৎ নেপালি জনগনের ওপর এর প্রভাব বাড়তেই থাকবে।জনগণের ভেতরের প্রবল চাপ নেপালকে  চীনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।এটা হলে তা ভারতের জন্য ভয়ানক হবে।সেজন্য নেপালের পাবলিক সেন্টিমেন্টের বিষয়ে ভারতীয় কর্মকর্তারা আরও সেনসিটিভ হন।নাহলে বিপদ এড়াতে পারবেন না।

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *