“ধর্মীও মেরুকরনের রাজনীতি রুখতে মমতা সোনিয়ার জোট, সময়ের ডাক”–লিখেছেন সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

575860-sonia-rahul-mamataতবে কি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট হচ্ছে তৃণমূলের?মমতা ও সোনিয়ার মন্তব্যে সে রকমই ইঙ্গিত আছে।তৃনমূলের কোরকমিটির সভায় দলীয় নেতাদের উদ্দেশ্যে মমতার নির্দেশ-কংগ্রেসকে আমার ওপর ছেড়ে দিন। বিজেপির বিরুদ্ধে অল আউট ‌যান।তাহলে কি মমতার মন্তব্যে জোটের ইঙ্গিত?বিষয়টা দানা বাঁধছিল রাষ্টপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে  যখন মমতা সোনিয়া গান্ধীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। জোটের সম্ভাব্র সম্ভাবনার আঁচ আগে থেকে পেয়ে গিয়েছিল বঙ্গ কংগ্রেস নেতারা তাই দলের হাই কমান্ডের বিরুদ্ধে কার্যত বিদ্রোহ ঘোষণা করছিলেন।এবং ১ ঘন্টার বৈঠক সেরে মমতা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তখন অধীর আবার প্রাকাশ্যে বলেছিলেন তাকে দলে থাকা নিয়ে ভাবতে হবে যা নিয়েও কম জলঘোলা হয়নি।
এদিকে মমতার  সাথে মান্নানের বৈঠক,দুজনেই করেন  নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ বলছেন বটে,তবে এ কথা কেউ মানতে চাইছেন না।জোটকে পাক্কা করার জন্যই এই বৈঠক বলে মনে করছে রাজনীতিমহল।তবে জোট নিয়ে সব থেকে বড় প্রমান দিলেন স্বয়ং নেত্রী।
কোর কমিটির বৈঠকের পর এক তৃণমূল নেত্রীর বক্তব্য ”বিজেপির বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক প্রচার শুরু করুন। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজেপি গুজব রটাচ্ছে। পালটা প্রতিরোধ করতে হবে। আর কংগ্রেস নিয়ে নরম মনোভাব নিয়েছেন নেত্রী। তিনি কংগ্রেসের ব্যাপারটা বুঝে নেবেন।” মমতার বক্তব্যে এটা পরিস্কার, যে আগামী লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট হতে চলেছে তৃণমূলের। তা না হলেও কংগ্রেস প্রার্থীকে জায়গা ছেড়ে দিতে পারেন মমতা এমনটা মত রাজনৈতিক মহলের একাংশের।
এদিকে আগামী ২৫ মে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে আবার তাবৎ বিরোধীদের নিয়ে বৈঠক ডাকছেন সোনিয়া। সেখানে মমতা আবার হাজির হবেন বলেই আশা। এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী বাছাই পর্বে প্রতিটি দলের সঙ্গে আলাদা করে ২০১৯ সালের আগাম জোট নিয়েও কথা শুরু হবে।  তবে রাজনৈতিক মহল সূত্রের খবর,সোনিয়া গান্ধী যদি রাহুল গান্ধীকেই প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে প্রোজেক্ট করতে চান তাহলে সেটা অন্যান্য আঞ্চলিক দলের নেতানেত্রীরা সম্ভবত নাও মানতে পারেন।কারণ নীতীশ কুমার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মায়াবতী, নবীন পট্টনায়ক, সীতারাম ইয়েচুরি, শারদ পাওয়ারের মতো নেতানেত্রীরা সোনিয়াকেই কংগ্রেসের শেষ কথা হিসাবে এবং গুরুত্ব দেওয়ার মতো নেত্রী হিসাবে মান্য করেন। রাহুলের সেই রাজনৈতিক গুরুত্ব এই নেতাদের কাছে নেই।সুতরাং সম্ভাব্য মহাজোটের প্রধান শর্তই হবে কোনও মুখকে প্রোজেক্ট না করা।আর সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে বড় মুখ আপাতত সোনিয়াদের হাতে নেই। তাই রাজনৈতিক মহল মনে করছে কিছুদিন আগে মমতার দেওয়া হুমকি, বাংলা দখলের চেষ্টা করলে দিল্লি দখল করে দেখিয়ে দেব, এবার বিজেপি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে বাধ্য হবে।
এদিকে বিভ্রান্ত রাজ্য কংগ্রেস। তিন জেলার পৌরভোটে সিপিএম’র সাথে জোটবেঁধে নাগরিক মঞ্চের মুখ পুড়ল। সিপিএম প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। দিশাহীন রাজ্য কংগ্রেস, রাজ্য নির্বাচন কমিশন না দশ জনপথ, বিক্ষোভটা কোথায় দেখানো উচিত, তা নিয়েই বিভ্রান্ত রাজ্য কংগ্রেস।
যে তৃণমূল পুরভোটে  কংগ্রেসকে লাটে তুলে দিয়েছে বলে তাদেরই অভিযোগ, মঙ্গলবার দিল্লিতে বিজেপি বিরোধিতার নামে তাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধীরা। যে মমতার বিরুদ্ধে দলভাঙানো, সন্ত্রাস, পুলিশ অপব্যবহার সহ হাজার অভিযোগ কংগ্রেসের, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মুখে মোদিকে রুখতে সেই মমতার দ্বারস্থ কংগ্রেস হাইকমান্ড।
দলের একাংশের বক্তব্য, হাইকমান্ডের বিরুদ্ধেই ধর্ণায় বসা উচিত। যারা কংগ্রেসকে শেষ করছে, তাদের সঙ্গে বৈঠক চলবে না। নিজের নেতাদের না সামলে এখানে কমিশন বা অন্য কারুর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে লাভ কী?
একসময় এই বিজেপি রোখার নামে বামেদের প্রতি নরম হতে গিয়ে প্রদেশ কংগ্রেসের সর্বনাশ করেছে দিল্লি। এখন সেই বিজেপি ঠেকানোর নামে মমতাকে তোল্লাই দেওয়া। এতে দলটাই তো উঠে যাচ্ছে।
আপাতত শুধু রাষ্ট্রপতি ভোট নিয়ে ইস্যুভিত্তিক কথা। বামেদের সঙ্গেও কথা বলবে কংগ্রেস। তার বাইরে রাজ্য রাজনীতিতে এখনও বামঘেঁষা হয়েই নাকি চলতে চান রাহুল।
এর মধ্যে মানস ভুঁইয়াকে রাজ্য সভার প্রার্থী ঘোষণা করলেন মমতা ব্যাণার্জী। এই পরিস্থিতে এ যেন জোঁকের মুখে নুন পড়ল। এদিকে সিপিএম এর রাজ্যসভায় প্রার্থী হিসাবে সীতারাম ইয়েচুরির নাম প্রস্তাবে দলেও আপওি আছে। কংগ্রেস হাইকমান্ডের কাছে মমতা দেবী  প্রস্তাব দিয়েছেন ছটার মধ্যে পাঁচটি প্রার্থী তাদের।ছ নম্বর প্রার্থী  পচ্ছন্দসই হলে মমতাদেবী তাদের বাড়তি ভোট দিয়ে কংগ্রেস প্রার্থীকে জেতাতে পারেন। রাজ্য কংগ্রেস ঘরোয়া আলোচনায় এবং পরিষদীয় নেতৃত্ব  ঠিক করেছে ষষ্ঠ আসনে তৃণমুলের সঙ্গে সমঝোতা হলে বিক্ষুব্ধ বিধায়ক নিয়ে তারা সিপিএম প্রার্থীকেই জেতাবেন।
এই প্রেক্ষিতেই প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী হাইকম্যান্ডের বিরুদ্ধে পরোক্ষে তোপ দাগেন, বাংলার কংগ্রেস কর্মীরাও হাইকম্যান্ডের জোট বার্তা মানবেন না।
২০১৯ লোকসভা নির্বাচনই লক্ষ। নরেন্দ্র মোদীকে মসনদ থেকে হটাতে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী এখন থেকেই পরিকল্পনা কষছেন। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাই চান। সেই কারণেই দুই নেত্রী আবার এক মঞ্চে আসতে চাইছেন।
এদিকে, তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কংগ্রেস ছেড়ে অধীরবাবু যদি বিজেপিতে আসতে চান, তবে তাঁকে স্বাগত জানানো হবে মন্তব্য করেন বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। তিনি বলেন, অধীরবাবুর মতো বড়ো নেতার জন্য আমাদের দরজা খোলা। তিনি তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে চান। আমাদের লড়াইও তৃণমূলের বিরুদ্ধে।
কংগ্রেস সম্পর্কে দলকে নরম থাকার বার্তা দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুঝিয়ে দিলেন, BJP-র বিরুদ্ধেই আসল লড়াই।তাহলে বাম-কংগ্রেসের জোট ভঙ্গ কি এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা?
প্রশ্ন উঠছে, বঙ্গ-রাজনীতিতে কি এ বার তা হলে নতুন সমীকরণ? রাজনৈতিক মহল বলছে, সোনিয়া-মমতা দু-তরফেই রয়েছে নানান বাধ্যবাধকতা। পুরভোট সহ সাম্প্রতিক নানা নির্বাচনের ফল বলছে, বাম-কংগ্রেস নয়, এ রাজ্যে ক্রমশ প্রধান বিরোধী শক্তির জায়গা নিচ্ছে BJP। ফলে, কংগ্রেসের বদলে গেরুয়া শিবিরকেই টার্গেট করছেন মমতা। মোদী-বিরোধী শক্তিকে এক জায়গায় আনতে চাইলে কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের সুসম্পর্ক তৈরি করতেই হবে।নাহলে ধর্মীয় মেরুকরনের রাজনীতি বাংলার সেকুলার ধাঁচাকে শেষ করে ফেলবে।এই মেরুকরন রুখতে সোনিয়া মমতা জোট অবশ্যম্ভাবী।সময়ের ডাক।

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *