“তালাক তালাক তালাক, তারপর বিচ্ছেদ”– লিখেছেন, সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

imagesতালাক তালাক তালাক, তারপর বিচ্ছেদ। নারীর পক্ষে কতটা অপমান জনক এই শব্দ। শুধু তিনবার এই শব্দ উচ্চারণ করেই নারীকে বৈবাহিক সম্পর্ক, অধিকার সব কিছু থেকে মুছে বেলা যায়। এ ধারণার বিরুদ্ধে শিক্ষিত উদারমনস্ক নারী-পুরুষ প্রত্যেকের লড়াই এর ফল স্বরুপ
তিন তালাক’ বলে মুসলিমদের বিবাহবিচ্ছেদকে অবৈধ ঘোষণা করলেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে এ বিষয়ে আইন প্রণয়নে পার্লামেন্টকে নির্দেশ দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। গত ২২/0৮/২০১৭ মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। তবে বিচারপতিদের সবাই রায়টিতে সম্মত দেননি।
আমার ব্যক্তিগত মতে এই তিন তালাক বাতিলের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত আসলে মুসলীম নারীদের পরিবর্তনের মুক্তির দরজা খুলে দিল।সত্যি সংস্কার শুধু মুখে বললে আসে না, সংস্কার আসুক মননে ও চিন্তনে।   পৌরুষ  শাসিত সমাজে নারিমুক্তির কোণ ধর্ম বা সীমানা থাকা বাঞ্ছনীয় নয়।নারী অধিকারের লড়াইতে সব সীমানা ভেঙে সকলেকে সকলের পাশে থাকতে হবে।
আমাদের চলচিত্ত জগতের এই তালাক নিয়ে কয়েকটি সিনেমা হয়েছে। মনে পরছে ছোটবেলায় দেখা সওদাগার সিনেমাটি। বাংলা গল্প রস অবলম্বনে যা বানানো। মদ্দা কথা নারীই তাহলে পুরুষের অর্থনৈতিক, শারীরিক, মানসিক সব চাহিদা পুরণের সহকারী। কিন্তু একথা কায় মন বাক্যে স্বীকার করতে পৌরুষে লাগে। কেন! লাগাম হাত ছাড়া হওয়ার ভয় নাকি মিথ্যা পৌরুষের মুখোশ খুলে শুধু মুল্যহীন মুখ টুকু উন্মোচনের আতঙ্ক??!!
আচ্ছা বুক বাজিয়ে আমাদের মা কাকিমা দিদা তারা বলতে পারবেন কি তিন তালাক না হোক ত্যাগ দেওয়ার ভয় আদিকাল থেকেই তাদেরও কি ছিল না? তালাক প্রাপ্তা মুসলীম রমণী আর ডিভোর্সী অমুসলীম নারীটি তাদের দুজনেরই ট্রমাটিক কোন তফাত থাকে কি???
সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে দেওয়া রায় ঘোষণাকালে প্রধান বিচারপতি জে এস খেহর বলেন, ‘এটা খুবই সংবেদনশীল মামলা, যেখানে অনুভূতির যোগ আছে। আমরা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে এ বিষয়ে উপযুক্ত আইন তৈরির বিষয়টি বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছি।’
তিন তালাককে ‘বাজে বিধান’ আখ্যা দিয়ে সর্বোচ্চ আদালত বলেন, ‘আমরা আশা করি, আইন তৈরির সময় পার্লামেন্ট মুসলিম পারিবারিক আইনের বিষয়টি বিবেচনায় নেবে। সব পক্ষকে রাজনীতিমুক্ত হয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
রায়ের সময় কিছু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে তিন তালাক প্রথা চর্চা হয় না উল্লেখ করে আদালত বলেন, ‘স্বাধীন ভারত কেন এই প্রথা থেকে মুক্ত হতে পারবে না?’
ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, তিন তালাক বৈধ। তবে স্কাইপ ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তালাক পেয়ে কয়েকজন নারী এক হাজার ৪০০ বছর ধরে চলা এই প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তারা প্রকৃত স্যালুটের অধিকারিণী।
মঙ্গলবার বিভিন্ন ধর্মের পাঁচ বিচারক তালাকের বিষয়ে রায় দেন। তাঁরা হলেন প্রধান বিচারপতি খেহর, বিচারপতি কুরিয়ান জোসেফ, বিচারপতি রোহিন্তন ফালি নরিমান, বিচারপতি উদয় উমেশ ললিত ও বিচারপতি এস আবদুল নাজির। তাঁদের বেঞ্চে গত ১২ থেকে ১৮ মে এ বিষয়ে শুনানি হয়েছিল।

তালাক কি ? কি কি উপায়ে বিবাহ বিচ্ছেদ হতে পারে ? স্বামী কি যখন খুশি তখন তালাক দিতে পারে ? এই ৯০ দিন অতিক্রান্ত হবার আগে কি তালাক প্রত্যাহার করা যাবে ? বিচ্ছেদ প্রাপ্ত স্বামী কি আবার আগের স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারে? স্ত্রী কীভাবে স্বামীকে তালাক দিতে পারে? তালাক-ই-তৌফিজ , খুলা , মোবারাত কি ? স্ত্রী কর্তৃক আদালতে আবেদন মাধ্যমে তালাক ? পাঁচ জন বিচারপতির মধ্যে তিন জন বিচারপতি তিন তালাককে অবৈধ বলে রায় দেন।
এই মামলায় গত কাল প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বিচারপতি আবদুল নাজির তিন তালাকের সঙ্গে সংবিধানের কোনও সংঘাত নেই বলে রায় দেন।তবে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র সরকারকে ৬ মাসের মধ্যে মুসলিমদের বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করতে নির্দেশ দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে বলা হয়েছে তিন তালাক মুসলমান মহিলাদের মৌলিক অধিকারকে লঙ্ঘন করে।
আইনজীবী সইফ মেহমুদ দাবি করেন, প্রধান বিচারপতি তাঁর রায়ে বলেছেন, কোনও ধর্মের পার্সোনাল ল-তে কোনও সাংবিধানিক কোর্টের হাত দেওয়া উচিত নয়।
তিন তালাকের আবেদনের বিরুদ্ধে ছিল মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড। যাঁদের বক্তব্য ছিল, ধর্মীয় অধিকারের ব্যাপারে আদালত নাক গলাতে পারে না।
পাঁচজন আবেদনকারী ছিলেন তিন তালাকের এই মামলায়। মূল আবেদনকারী ছিলেন উত্তরাখণ্ডের বাসিন্দা শায়রা বানু। সঙ্গে ছিলেন ইশরাত জাহান, গুলশন পরভীন, আফরিন রহমান, আতিয়া সাবরি।

তবে প্রধান অভিযোগকারিনী যিনি তিনি শায়রা বানু। ৩৬ বছর বয়সী শায়রা বানুই হলেন সেই মুসলমান মহিলা যিনি ‘পার্সোনাল ল প্র্যাকটিস’-এর বিরুদ্ধে সরব হন এবং আইনি লড়াই লড়েন। যদিও শায়রা বানুর পিটিশনে কোথাও মুসলিম ল বোর্ডের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ ছিল না, তিনি  মূলত আইনের কাছে সবার সমান অধিকার এবং ধর্মের ভিত্তিতে লিঙ্গ বৈষম্যের বিষয়টিকেই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। শায়রা যখন পিটিশন দায়ের করেছিলেন, তিনি সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন ‘তাৎক্ষণিক তালাক’-এর ওপর।  শায়রা বানুই প্রথম ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টে একটি পিটিশন ফাইল করেন। মুসলিম পর্সোনাল ল (শরিয়ত) অনুযায়ী কোনও মুসলমান মহিলা তার স্বামীকে ডিভোর্স করতে পারেন না। শায়রার প্রতিবাদ এই পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধেও। “আইনে কী বলা আছে আমি তা জানতে চাই না। একজন পুরুষই তালাক দিতে পারে, এটাকে কোনও এক বিশেষ লিঙ্গের বিশেষ ক্ষমতা ছাড়া আর কী বলা যাতে পারে”, এই প্রশ্নটাই ছিল শায়রা বানুর।

১৫ বছর আগে স্বামীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হয় শায়রা বানুর। আর এই বিচ্ছেদের মূল কারণই ছিল বধূ নির্যাতন। বিয়ের কয়েকদিন পর থেকেই স্বামীর পরিবার থেকে পণ চাওয়া হয়। গাড়ি, টাকা চেয়ে বারবার তার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হত। তার স্বামী বিয়ের প্রথম দুবছর তাকে তালাক দেওয়ার ভয় দেখিয়েছিল। তিনি গোটা বিষয়টি তার পরিবারকে জানালে তাঁরা তখুনি তাকে ডিভোর্সের পরামর্শ দেয়, ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ জানিয়েছেন শায়রা বানু। শায়রা এখন দুই সন্তানের জননী। ১৫ বছর বয়সী একটি মেয়ে এবং ১২ বছর বয়সের ছেলে দুজনের কেউই তাঁর সঙ্গে থাকে না। শায়রা বানুর স্বামী এখন জেলে।
এদিনের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন নারীবাদী হিসেবে পরিচিত লেখিকা, তাসলিমা নাসরিন। “সর্বোচ্চ আদালতের এই রায় মুসলিম ল বোর্ডের ওপর একটা চরম থাপ্পড়। নারীদের আরও শিক্ষিত এবং স্বাধীন হওয়া দরকার”।
এই জয় শুধু শায়রা বানু,ইশরাত জাহান, গুলশন পরভীন, আফরিন রহমান, আতিয়া সাবরি’দের নয় এই জয় ধর্মের গন্ডি ভেঙে প্রতিটি নারী জাতির।
এই পাঁত সাহসীনির প্রায়াস এক নুতন দিগন্ত খুলে দিল। পরিশেষে একটি ঘটনা দিয়ে শেষ করি। ভীড় বাসে প্রতিদিন বাদুর ঝোলা হয়ে কর্মক্ষেত্র যেতে যেত অভিঞ্জতার সঞ্চয় বাড়তে থাকে। এমন একদিনের কথা। বোরখা পরিহিতা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এয়ার পোর্ট এক নম্বর থেকে বাসে উঠলো সম্ভবত বাঙালি মহিলা (সিঁন্দুর পরিহিতা)। পাশে দাঁড়ানো মেয়টি তাকে একটু জায়গ দিল। বাসের গতিতেই হোক বা ভীড়ের কারনে মুসলিম মেয়েটি বাঙালীর মেয়েটির গায়ে পড়ে যাচ্ছিল এর ভিওিতে কথোপকথন।

বাঙালী: কিতনা বার বোল রাহা হু, ঠিক সে খাড়ে নেহি হো সাকতে।
মুসলিম: ইস লিয়ে বোলতে হ্যায়, বাঙালী লোগকো ইতনা ভি চান্স মিলা তো সর পড় চড় যাতে হ্যায়।
বাঙালী: ওর তুম লোক সাবকে সামনে পারদা করতি হো, ওর  মরদলোগ যো ভি রিলেশানকে হো উসিকি সাথ…..
ভুলটা কিন্তু দুজনেরই। আসলে লিপিস্টিক আন্ডার মাই বুরখা র তর্জমা করলে দাঁড়ায় ঘোমটার নিচে ক্ষেমটা নাচ। কষ্ট কিন্তু শুধু নারীদেরই- মুসলিম হোক বা অমুসলিম।

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *