“জাল বিছিয়েছে-‘দিদি”…সাবধান

downloadনিজের অভিযোগ,ক্ষোভ দিদিকে জানাবেন ভাবছেন ?ভালো কথা, জানান। কিন্তু জানাবার আগে দুবার ভেবে দেখার দরকার আছে। কারন,‘দিদিকে বলো’-র লক্ষ্য আদৌ যে সরল ব্যাপার তা কিন্তু নয়। কেন? তাহলে একটু আলোচনা করা যাক।

আপনি ক্ষোভ, অভিযোগ ইত্যাদি জানাতেই পারেন। মতামত দেওয়ারও সুযোগ আছে।আর আছে ‘অন্যান্য’ বলে একটি বিভাগ। আপনি যদি কিছু জানাতে বা জানতে চান তাহলে ওয়েবসাইটে গিয়ে একটি ফর্ম পূরণ করতে হবে। লিখতে হবে নিজের নাম, বয়স, পেশা, লিঙ্গ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ফোন নম্বর এবং হোয়াটস অ্যাপ নম্বর ইত্যাদি। এসব সুলুক সন্ধান চাওয়া নিতান্তই নিরীহ ব্যাপার। এবার যে প্রশ্নগুলো আসছে সেইগুলো আর আপাত নিরীহ থাকছে না। যিনি অভিযোগ জানাচ্ছেন বা মতামত দিচ্ছেন, তাঁকে নিজের জেলার নাম জানাতে হবে। জানাতে হবে তিনি গ্রামবাসী, নাকি নাগরিক। গ্রামবাসী হলে ব্লকের নাম লিখতে হবে। শহরবাসী হলে জানাতে হবে পৌরসভা অথবা কর্পোরেশনের নাম।

এবার দু’টি  চমকপ্রদ প্রশ্ন অপেক্ষা করছে। প্রশ্ন ক্রমিক সংখ্যা দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ। দ্বাদশ প্রশ্নটি- ‘আপনি কী কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য?’ ত্রয়োদশ প্রশ্নটি- ‘আপনি কি ‘দিদি-কে বলো’র দূত হতে চান?

যাঁরা www.didikebolo.com  ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিজেদের সমস্যা জানাতে চান, তাঁদের শেষ দুটি প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই দিতে হবে। নাহলে ফর্মটি জমা পড়বে না। এবার দ্বাদশ প্রশ্নের কলামে যিনি তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী তিনি জামার বোতাম খুলে নিজের অবস্থান  লিখবেন। আর যিনি অন্য রাজনৈতিক দলের মতবাদে বিশ্বাসী বা সক্রিয় কর্মী, তিনি স্বাভাবিক ভাবেই জায়গাটিতে ‘না’ লিখবেন। কারণ, মমতা ব্যানার্জির শাসনে, পশ্চিমবাংলায় অন্য রাজনৈতিক দলের বেশিরভাগ কর্মীই নিজের পরিচয় খোলাখুলি জানাতে ভরসা পান না।

যদি কেউ মনে করেন যে,তার রাজনৈতিক অবস্থান তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধী সেটা লিখবেন সেক্ষেত্রে ফর্ম পূরণের মাধ্যমেই তিনি সহজে চিহ্নিত হয়ে যাবেন। এভাবেই পঞ্চায়েত, ব্লক থেকে শুরু করে বিধানসভা অবধি, ধরে ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মীদের নামের তালিকা তৈরি করা সম্ভব হবে।এবার প্রশ্ন, যাঁরা ‘না’ লিখছেন, সেক্ষেত্রে? ‘‘যিনি ‘না’ লিখবেন, তাঁকেও চিহ্নিত করা যাবে। তৃনমূল দলের লোকেরা তাঁর কাছে পৌঁছে যাবে।

এখানেই শেষ নয়, ধাপে ধাপে মোড়ক খোলার খেলা। কোনও কারণে কেউ যদি লেখেন তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য, সেক্ষেত্রে খুলে যাচ্ছে আরও একটি নতুন কলাম। জানতে চাওয়া হচ্ছে,‘পার্টির নাম নির্বাচন করুন।’ অর্থাৎ ফর্ম পূরণকারী কোন পার্টির সদস্য সেটা জানাতে হবে। ১০টি রাজনৈতিক দলের ‘অপশন’ সম্বলিত তালিকায় টিক মারতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলি- তৃণমূল কংগ্রেস, অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক, বিজেপি, সিপিআই, সিপিআই(এম), গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা, কংগ্রেস, আরএসপি, ডব্লিউবিএসপি এবং ‘অন্যান্য।’  দল নির্বাচনের পরেই চলে এল আরও একটা প্রশ্ন। জানতে চাওয়া হচ্ছে ফর্ম পূরণকারী ওই দলের কোন পদে আছেন।

এবার  ত্রয়োদশ প্রশ্ন পুরন করার পালা। সরাসরি জানতে চাওয়া হয়েছে, ‘আপনি কি ‘দিদিকে বলো’র দূত হতে চান?’ যিনি ‘হ্যাঁ’ লিখবেন, অনুমান করতে সমস্যা হবে না, হয় তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা,কর্মী অথবা ঘোর সমর্থক। এদের নিয়ে চিন্তিত নয় তৃণমূল কংগ্রেস। সমস্যা যিনি ‘না’ লিখবেন তাদের নিয়ে। ‘না’ সংখ্যক লোকেরাই বিরোধী রাজনৈতিক দলের বা নানা কারণে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধী হয়ে ওঠা মানুষ।

এরাই ‘টার্গেট’। এই খেলার গোলপোস্ট বলতে পারেন। ফর্ম পূরণের সময় ফোন নম্বর দিয়েই রেখেছেন। আগামীদিনে মমতা ব্যানার্জিকে কেন্দ্র নানান প্রচার সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হবে আপনার ফোনে।সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের বিবরণ পাঠানো হবে হোয়াটস অ্যাপ বা এসএমএস মারফত। কলামে ‘না’ লেখাদের ভবিষ্যৎ কি? তাদের ঠিকানার তালিকা পৌঁছে যাবে পঞ্চায়েত, ব্লক,পৌরসভা ভিত্তিক তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বের কাছে। যা ধরে ধরে নির্বাচনের আগে ষ্টীম রোলার চালাবে রাজ্যের শাসক দল।

‘দিদিকে বলো’র প্রচার সারা রাজ্য জুড়ে আকাশ ঢেকেছে। বিরাট বিরাট ফেস্টুনে, হোর্ডিংয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির মুখ আর ফোন নম্বর। কোণায় তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীক। মমতা ব্যানার্জির জামানা সব গুলিয়ে দিয়েছে। বঙ্গবাসী সংশয়ে ভাবে কোনটি রাজনৈতিক দলের প্রচার, আর কোনটি সরকারের। উদ্বোধনের দিন মমতা ব্যানার্জি যাই বলুক, আসলে পুরো প্রক্রিয়াটিই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রজেক্ট। যার গুপ্ত রসায়ন নিজেদের সমস্যার সমাধান করা। অনেকেই বুকভরা আশা নিয়ে ইতিমধ্যেই ফর্ম পূরণ করেছেন আর যারা ভাবছেন,তারা শুধু স্মরন করে নেবেন দিদিকে সমস্যা জানানোর পর তাদের কপালে কি দুর্ভোগ নেমে এসেছে।সঙ্গে এটাও ভুললে চলবে না, আপনি কিন্তু যাবতীয় তথ্য অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছেন।

এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার নিয়ে কি করতে চায় তৃনমূল কংগ্রেস? করবে ভাড়া করা ভোটগুরু প্রশান্ত কিশোর এবং তাঁর সংস্থার কর্মীরা। যা মূলত কাজে লাগবে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে  নির্বাচনী লড়াইয়ে। ১২ এবং ১৩ নম্বর প্রশ্নের উত্তরেই অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে। এছাড়া পেশা, লিঙ্গ, জেলা, ব্লক, পৌরসভা প্রভৃতিতে পূরণ হওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট অংশের কী কী চাহিদা, কাদের মধ্যে ‘কর্মী’ বেশি, কাদের মধ্যে কম,এই সবের একটি পুর্নাঙ্গ চিত্র তৈরি হয়ে যাবে। অর্থাৎ ‘দিদিকে বলো’ বিধ্বস্ত, আশাহত রাজ্যবাসীর মুশকিল আসান নয়। তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী কৌশলের প্রাথমিক ধাপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *