গোর্খাল্যান্ডঃ “জাতিগত প্রত্যাশা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা”—সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

a_group_of_lepchas_in_darjeeling759দার্জিলিঙ আন্দোলনের একটি ইতিহাস আছে। প্রায় এক শত বছর আগে বাংলা প্রদেশের বাইরে গিয়ে একটি পৃথক প্রশাসনিক ইউনিটের দাবি জানায় হিলমেন্স অ্যাসোসিয়েশন। পরবর্তীকালে কখনও গোর্খা লিগ, কখনও বা জি এন এল এফ বা প্রান্তিয় পরিষদ দাবি তোলে আলাদা রাজ্য গোর্খাল্যান্ডের। এই দাবি রুপান্তরিত হয় হিংস্র ও অশান্ত এবং অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক আন্দোলনে। দুঃখের বিষয় হল আন্দোলনকারীরা কখনও তাদের দাবির যৌক্তিকতা, সম্ভাব্যতা বা আদায়যোগ্যতা প্রমাণ করার চেষ্টা করেনি। আজও করে না। এই আন্দোলন জাতিগত আবেগ সর্বস্ব এবং ভয়ভীতির পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। এই সমস্ত আন্দোলনের মধ্যদিয়ে তাদের মধ্যে একটি প্রত্যাশা বা আকাঙ্ক্ষারও সৃষ্টি করেছে। সেই দিক দিয়ে এই আন্দোলনের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষার দিকও আছে (Aspirational Aspect)। উঠছে পরিচিতি সত্তার প্রশ্নও। উত্তর-পূর্ব ভারত বা দেশের বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক উপজাতি বা উপভাষা লুপ্তপ্রায় হতে চলেছে এবং পরিচিতি সত্তার পক্ষে এক সঙ্কটের সৃষ্টি করছে। নেপালী ভাষা বা জাতির মানুষরা, সংখ্যার দিক দিয়ে লুপ্তপ্রায় নয়, বরং স্বাভাবিক থেকেও বেশি হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে দার্জিলিঙ পার্বত্য অঞ্চলে। নেপালী বা গোর্খাজাতিকে একটি জনজাতি বা জনগোষ্ঠী বলা যেতে পারে না। এটি একটি জাতি। তাই এক্ষেত্রে জনগোষ্ঠীগত পরিচিতি সত্তার প্রশ্ন না এলেও আছে একটি জাতিগত প্রত্যাশা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ৩৪ বছরে বামফ্রন্টে রাজত্বে পাহাড়বাসীর সমস্যার সমাধান হয়নি রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে তা করেননি জ্যোতি-বুদ্ধবাবুরা। আজ তাই আম পাহাড়বাসীর প্রত্যাসা মমতা ব্যণার্জীর কাছে।
হাসপাতাল, রাস্তা, পানীয় জল ইত্যাদির কোনও উন্নতি নেই। তিনধারিয়া রেলওয়ে ওয়ার্কশপ্‌ ঝুলছে। সেখানে রেল লাইন রয়েছে শূন্যে। দার্জিলিঙ ও শিলিগুড়ির সাথে তিনধারিয়া বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে। বহু বামপন্খী বুদ্ধিজীবিদের দেখা যাচ্ছে মিডিয়া জুড়ে তাও্বিক চর্চা করতে কিন্তু খতিয়ানের উওর তাদের নেই। মমতা ব্যাণার্জীর সফলতা বা অসফলতা নিয়ে আলোচনা চলকেই পারে, চলটাই কাম্য, তবে কিনা সব বর্তমানেরই অতীত ভুললে ভুলটা আর সংশোধন হয়না।

দার্জিলিঙের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ অভাব বোধ করছে শান্তি ও গণতন্ত্রের। দার্জিলিঙ পাহাড়ে কোনও গণতন্ত্র নেই, নেই মত প্রকাশের স্বাধীনতাও। কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ও স্বজন পোষণের বিরুদ্ধে কোনও দার্জিলিঙবাসীর মুখ খোলা বারণ! এখানে গণতন্ত্রের শেষ কথা বলেন একজনই তিনি গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুঙ। এসব নিয়ে দার্জিলিঙের মানুষের মনে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
কমিউনিস্টরা এই সমস্ত প্রশ্ন দেখে থাকে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। তাদের মতে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস বা বি জে পি-র মতো দক্ষিণপন্থী বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলি এই সমস্যাগুলিকে, দেখে থাকে একটি সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিতে। তাদের লক্ষ্য এর থেকে ভোটসর্বস্ব রাজনৈতিক ফায়দা লোটা। এই কারণে তারা চায় না এই ধরনের জাতিগত বা অঞ্চলগত সমস্যাগুলির রাজনৈতিক সমাধান হোক। তারা চায় এই সমস্ত সমস্যাগুলিকে জিইয়ে রাখতে। ৩৪  বছর বংলা জুড়ে রাজত্ব করার পরও বামফ্রন্ট সরকার পাহাড়ের সমস্যার সমাধান করেনি। আসলে জ্যোতিবাবু বা বুদ্ধবাবু কেউই বিশেষ কঠোর হাতে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে দমন করনেনি বা করতে চান নি। কারণ ভোট বাক্স ।অথচ এরাই এখন বলছে নির্বাচন এলেই কংগ্রেস বা বি জে পি-র মতো দলগুলি তাদের নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে ছোট ছোট রাজ্য গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। লক্ষ্য একই। এই সমস্ত দক্ষিণপন্থী দলগুলি কোনও রাজ্যের জাতিগত বা পিছিয়েপড়া অঞ্চলগত মানুষের দাবি বা আন্দোলনকে উসকে দেয়, উৎসাহিত করে, মদত দেয়, স্রেফ ভোটে জেতার আশায়।

দার্জিলিঙের নেপালীভাষী মানুষদের ইংরেজ শাসক ও ইংরেজ চা বাগানের মালিকদের বিরুদ্ধে শোষণ ও নানা নির্যাতনকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ ছিল। ইংরেজরা অবহেলা করত তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশের। তারা চাইত না গোর্খাজাতি সত্তার বিকাশ ঘটুক। দেশ স্বাধীনতার পর এবং পরবর্তী বাংলার শাসক ও চা বাগানের ভারতীয় মালিকরা আগের শাসকদের আচরণের কোনও পরিবর্তন ঘটায়নি। চা বাগানের মালিকদের বিরুদ্ধে নানা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত হতে দেখা যায়। কমিউনিস্ট পার্টি এটাকে কাজে লাগায় ও উস্কানিমুলক আচরণে অশান্তির বাতাবরন সৃষ্টি করে। পরে এই আন্দোলনে যোগ দেয় গোর্খা লিগ। এরপর কমিউনিস্ট পার্টি দাবি তোলে নেপালী ভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নেপালি ভাষাকে রাজ্যের দ্বিতীয় সরকারী ভাষা হিসাবে  স্বীকৃতি দেওয়া হোক এবং এই ভাষাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হোক। ১৯৫৫ সালে যখন রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন দার্জিলিঙে আসে তখন গোর্খা লিগ দাবি জানায় দা‍‌‍র্জিলিঙকে আসাম বা উত্তর-পূর্ব সীমান্ত এলাকা (NEFA)-র সাথে যুক্ত করার। কংগ্রেস দল দাবি জানায় দার্জিলিঙকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার। কিন্তু দার্জিলিঙ জেলা কমিউনিস্ট পা‍র্টি প্রস্তাব দেয় দার্জিলিঙের ৩টি পাহাড়ী মহকুমা নিয়ে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেওয়ার পক্ষে। তারা জানিয়েছিলেন দার্জিলিঙের জন্যে এটাই হতে পারে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক সমাধান। যাই হোক ভূরাজনৈতিকভাবে দার্জিলিংয়ের অবস্থান কৌশলগত কারণেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সেই দার্জিলিংকে মাঝে মাঝেই হিংসাত্মক আন্দোলনে উত্তপ্ত করার চেষ্ট চালিয়েছে যে যার সুবিধা মত। আলাদা গোর্খারাজ্যের দাবিও শতাধিক বছরের পুরনো। তবে আশির দশকে গোর্খা জাতিসত্তার আবেগকে উসকে দিয়ে  নতুনভাবে আন্দোলন শুরু করেছিলেন সাবেক সেনা সুবেদার সুভাষ ঘিসিং। পরবর্তী সময়ে ঘিসিং ঘনিষ্ট বিমল গুরুং পাহাড় থেকে ঘিসিংকে বিতাড়িত করে পাহাড়ে একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। কিছুদিন চুপ করে থাকার পর ভাষা বিতর্ককে ইস্যু করে তিনি ফের আলাদা গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছেন। রাজ্য সরকার পশ্চিমবঙ্গের সব স্কুলে বাংলা পড়ানো বাধ্যতামূলক বলে ঘোষনা করেছে। তবে সেই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন যে, পাহাড়ে নেপালিই হবে প্রথম ভাষা। বাংলা পড়তে হবে ঐচ্ছিক হিসেবে।

কিন্ত মোর্চা নেতারা এ কথা মানতে চান নি। পাহাড়ের সমস্যাটা যদি খুঁটিয়ে দেখা যায় তাহলে এটা কিন্তু নিছক উন্নয়নের সমস্যা নয়, গোর্খা জনজাতির ক্ষমতায়নের সমস্যা। দার্জিলিংকে সুইৎজারল্যান্ড বানানোর প্রচেষ্টা সাধুবাদযোগ্য কিন্তু সেই ল্যান্ড-এর শাসক কে হবে, সমস্যা তো তাই নিয়ে। ১৮ এপ্রিল পাহাড়ে ভোটের দিন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা সুপ্রিমো বিমল গুরুঙ্গ জানিয়েছেন যে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় যে প্রতিনিধিরা থাকবেন, তাঁদের মূল কাজ হবে, আইনসভার অভ্যন্তরে গোর্খাল্যান্ড-এর দাবিটি নিয়ে সরব হওয়া। এ কাজে ব্যর্থ হলে তাঁরা পদত্যাগ করবেন। তার পর পরই গোর্খা নেতাদের সঙ্গে রাজ্য সরকারের চুক্তিটি সম্পাদিত হল, যেখানে গোর্খাল্যান্ডের ‘সরব’ দাবিটি কিছুটা ম্রিয়মাণ। কথায় বলে, না আঁচাতে বিশ্বাস নেই, এই অবিশ্বাসের ভিত্তি গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ২০০৭-’১১ পর্বে মোর্চার আন্দোলন অবশ্যই ১৯৮৬-’৮৮ পর্বের জি এন এল এফের আন্দোলনের থেকে আলাদা। ’৮৬-’৮৮ পর্বে প্রায় বারোশো রাজনৈতিক কর্মী পাহাড়ে প্রাণ দিয়েছিলেন কিন্তু ’০৭-’১১ পর্বে মদন তামাং-এর হত্যাকাণ্ড ছাড়া মোর্চার হাতে রক্তের দাগ বিশেষ নেই। আন্দোলনের নেতৃত্বও অনেক বেশি যৌথ ও গণতান্ত্রিক। অতএব, আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের রাস্তা বেরোতেই পারে। কিন্তু রাজ্য সরকার ও মোর্চা নেতৃত্বের সেই আলোচনা হওয়া উচিত পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে। মনে রাখা প্রয়োজন যে, গোর্খা সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল আপন গোষ্ঠীগত নেতৃত্বের লড়াই। গোর্খা পার্বত্য পরিষদের ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ২২ অগস্ট, ১৯৮৮। তার পর একাদিক্রমে ২০০৫ পর্যন্ত পার্বত্য পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন সুবাস ঘিসিং। তাঁর আস্থাভাজন সেনাপতি দার্জিলিঙের কাউন্সিলর বিমল গুরুঙ্গ নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে পাশ থেকে সরে গেছেন কালিম্পঙের বাদশা ছত্রে সুব্বা। ২০০১-এ ঘিসিংকে নাকি আক্রমণ করেন তিনি। ২০০২-এ নেপাল থেকে ধৃত সুব্বা এখনও জেলবন্দি। সুব্বা প্রতিষ্ঠিত গোর্খা লিবারেশন অরগানাইজেশন-এর সমর্থকরা তাঁর নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছে। ২০০২-এই খুন হন ঘিসিং-এর আর এক প্রাক্তন সহযোগী সি কে প্রধান। তাঁর স্ত্রী ও বন্ধুরা প্রতিষ্ঠা করলেন জি এন এল এফ (সি)। সুব্বা ও প্রধান ছিলেন আন্দোলনে ঘিসিং-এর সমকক্ষ নেতৃত্ব,সেই নেতৃত্বকে নিষ্কণ্টক করে ঘিসিং তাঁর ক্ষমতার পরিধি বিস্তার করেন এবং তোলেন ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবি।

gorkhaland-pti-story_647_061717055844_061817105824২০০৫ পার্বত্য পরিষদের নির্বাচন স্থগিত হল কিন্তু ঘিসিং কাজ চালাতে লাগলেন সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক উপায়ে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং রাজ্য সরকারের নীরব সমর্থনের কারণ স্পষ্ট, ২০০৬-এ ভোট-বৈতরণী। পাহাড়ে আগুন জ্বলল ২০০৭-এ। ষষ্ঠ তফসিলের যে সংশোধনীটি কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট প্রস্তাব করেছিল, তার ১১ নং ধারা বলছিল যে, ব্যবস্থাটি দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলের জন্য একটি স্থায়ী কাঠামো প্রদান করবে এবং অন্য কোনও দাবি আর মানা হবে না। এর পরই ইন্ডিয়ান আইডল প্রশান্ত তামাং-এর আবেগে উদ্বেলিত জনজোয়ারের নেতৃত্বে দেখা গেল বিমল গুরুঙ্গকে। পাহাড়ের নতুন নেতা গুরুঙ্গ প্রথমেই নস্যাৎ করেন ষষ্ঠ তফসিলের দাবি। ২০০৭-এর ৭ অক্টোবর গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা স্থাপিত হল। ৬২৪৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা গোর্খাল্যান্ডের জন্য নির্ধারিত করলেন তিনি। পার্বত্য পরিষদের অঞ্চলগুলির সঙ্গে যোগ হল মিরিক, বানারহাট, ভক্তিনগর, বীরপাড়া, চালসা, কালচিনি, কুমারগ্রাম, মাদারিহাট ইত্যাদি। তরাই ও ডুয়ার্সে গোর্খা আধিপত্য বিস্তারই লক্ষ্য গুরুঙ্গের। মোর্চার প্রবল উত্থানে ষষ্ঠ তফসিলের সংশোধনীটি স্থগিত হল। ১০ মার্চ ২০০৮-এ ঘিসিং পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। এখানে দু’টি প্রশ্নের উত্তর জানা নেই এক, যে ষষ্ঠ তফসিল নস্যাৎ করে মোর্চার উত্থান এবং গোর্খাল্যান্ড আবেগের প্রসার, তাকে কি ‘সৌজন্যে’র খাতিরে গিলে ফেলা সম্ভব? দুই, ঘিসিং-এর দাবির বিরোধিতা করেছিলেন অখিল ভারতীয় গোর্খা লিগের শ্রদ্ধেয় নেতা মদন তামাং।একই ইস্যুতে সহমত পোষণে দুজনের  স্বাভাবিক মিত্র হওয়ার কথা  তাহলে কেন ২০১০-এর ২১ মে তাঁকে প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংস ভাবে খুন হতে হল? শোনা যায়, তিনি মোর্চা নেতৃত্বের বিরোধী ছিলেন। তবে কি লক্ষ্য নয়, নেতৃত্বের দ্বন্দ্বই শেষ কথা?
অথচ পাহাড়ে জনজাতির ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ২০১০-এর ১৮ মার্চ মোর্চা সাধারণ সম্পাদক রোশন গিরি কেন্দ্রের কাছে দাবি জানান যে, দার্জিলিঙের পার্বত্য জনসাধারণকে ১৯৩১-এর জনগণনার মর্যাদা দেওয়া হোক। উল্লেখ্য, ১৯৩১-এর জনগণনায় পাহাড়ের ৩,১৯,৬৩৫ জন অধিবাসীকে ‘অল ট্রাইবস’ আখ্যা দেওয়া হয় অথচ ১৯৪১-এর জনগণনায় গোর্খারা ‘নেপালি’ভাষী হিসেবে ‘ট্রাইব’ মর্যাদা হারান। ওই জনগণনায় মাত্র ৩৭.৫৪ শতাংশ পাহাড়বাসী ‘ট্রাইব’ হিসেবে গণ্য। এখন তা কমে ৩০ শতাংশের মতো। ৭০ শতাংশ বাসিন্দা ‘ট্রাইব’ মর্যাদা না পেলে ষষ্ঠ তফসিল প্রযুক্ত হবে কী করে? উল্লেখ্য, তামাং গোষ্ঠী তফসিলি জনজাতির মধ্যে গণ্য করা হয়েছে। এ গোষ্ঠীর সন্তান সুবাস ঘিসিং। বোঝা কঠিন নয় কেন তিনি ষষ্ঠ তফসিলের পক্ষে ছিলেন।
পাহাড়ে ১৯৩১-এর মর্যাদা অধিবাসীরা ফিরে পাবেন কি না, সে প্রশ্ন আলাদা।আশার কথা পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার যখন পাহাড় সমস্যার বিষয়ে এগোচ্ছেন এবং নানাবিধ স্বার্থের কথাও মাথায় রাখছেন।  গোর্খাদের সামগ্রিক ভাবে তফসিলি উপজাতি হিসেবে ঘোষণা না করলে ষষ্ঠ তফসিলের মাধ্যমে তাঁদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশেষ সুবিধা হবে না। আবার, পঞ্চম তফসিল অনুযায়ী আধা-কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ও গোর্খাদের সংযুক্ত করে ‘ট্রাইবস অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল’ গঠনও কার্যত অবাস্তব।
যেটা করা যেতে পারে তা হল, অবিলম্বে পার্বত্য পরিষদ খারিজ করে দিয়ে মোর্চার সঙ্গে নতুন স্বশাসিত পরিষদ গঠনের বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হওয়া। আবেগ যেহেতু ‘ল্যান্ড’ নিয়ে, তাই নতুন পরিষদের নামে ‘গোর্খাল্যান্ড’ শব্দটি যুক্ত করা উচিত। প্রশাসনের কতগুলি ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ নজরদারি থাকুক। যেমন আইনশৃঙ্খলা। ভবিষ্যতে কোনও গণ-আন্দোলনের মোকাবিলা তা হলে কেন্দ্রীয় সরকারেরও দায়িত্ব হবে। কিছু দায়িত্ব নতুন পরিষদের হাতে তুলে দেওয়া হোক। পরিষদে পাহাড় থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়ানো হোক।
মমতা ব্যণার্জীর সামনে একটি অভাবনীয় সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। এই প্রথম পাহাড়ের মুখ্য দলটি সরাসরি রাজ্য সরকারকে সমর্থন জানিয়েছে। ওই সমর্থনকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য তাঁদের সরকারে জড়িয়ে নেওয়া হোক। এতে রাজ্যে যেমন গোর্খারা প্রাসঙ্গিক হবেন, তেমনি স্বশাসিত পরিষদও দায়িত্বশীল হবে। গোর্খাদের মধ্যে কেউ রাজ্য সরকারের মন্ত্রী হলে বাঙালি-গোর্খা বিভাজনও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। তবে সবটাই নিরপেক্ষ হওয়া উচিত মাথায় রাখতে হবে কীরোর ব্যক্তিস্বার্থ পুরণের ফলে যেন সরল পাহাড়বাসীরা বঞ্চিত নাহন। সব থেকে বড় কথা আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। তাই কোন মাস্তান খুনির জন্য জনতার জনজীবনে ক্ষতি তা শক্ত হাতেই দমন করতে হবে তাতে যদি বড়ো কোন মুল্যও দিতে হয় তো হোক।

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *