গান্ধী-গডসে ও শহীদ দিবস- লিখেছেন দেবাশীষ পাইন।

gandhi_godse_30_01_2017১৯৪৮সালে ৩০শে জানুয়ারি বিকেল ৫টায় নাথুরাম গডসে পিস্তলের গুলি ছুঁড়ে মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করে।১৯৪৯সালে ১৫ই নভেম্বর নাথুরামের ফাঁসি হয়।বিচারের সময় নাথুরাম নিজের পক্ষে সাফাই দেয়।বিচারপর্ব শেষে বিচারপতি জি. ডি. খোসলা নাথুরামের ওপর একটি বই লেখেন।নাথুরামের ভাই গোপাল গডসেও আরও একটি বই লেখেন।গোপাল গডসে’র বইটিতে নাথুরামের জীবন এবং কেন মহাত্মা গান্ধীকে খুন করা হয়েছিল সেটার কারন লেখা আছে।বইটির নাম-Gandhi Hatya Ani Mee।

নাথুরাম পুনায় জন্মগ্রহন করে।কলেজ জীবন থেকে হিন্দু মহাসভা ও আরএসএস’র পক্ষে কাজ করত।হিন্দু মহাসভা গান্ধি’র নীতির বিপক্ষে ছিল।১৯৪০ সালে পৃথক মুসলমান রাষ্ট্রের প্রশ্নে হিন্দু মহাসভা কংগ্রেসের ওপর ক্ষেপে যায়।১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের চূড়ান্ত মুহূর্তে ভারত জুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়।সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রুখতে গান্ধীজী অনশন শুরু করেন যাতে সরকার চাপে থাকে।কিন্তু গান্ধীজীর অনশনকে হিন্দু মহাসভা ও আরএসএস মুসলিম তোষণ আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ করতে শুরু করে।নাথুরামেন মতো কট্টর তরুন আরএসএস সদস্যরা অখন্ড ভারতের জিগির তুলে গান্দিজী’র বিরোধিতা করতে শুরু করে।নাথুরাম ও তার সঙ্গী নারায়ন আপতে সাভারকার ও অন্য হিন্দু মহাসভার নেতাদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে দিল্লিতে গান্ধীজীর ধর্মসভায় বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে।কিন্তু গান্ধীজী এই চাপের কাছে নতিস্বীকার না করে ধর্মসভা চালিয়ে যান।এই অশান্তি দেখে সর্দার প্যাটেল প্রতিশ্রুতি মতো ভারতে রয়ে যাওয়া যৌথ সম্পত্তির ৫৫ কোটি টাকা পাকিস্থানকে দিতে টালবাহানা করতে থাকে।এতে গান্ধীজী আরও ক্ষেপে গিয়ে অনশন শুরু করে দেয়।গান্ধীজীর ক্ষোভ প্রশমিত করতে প্যাটেল তড়িঘড়ি টাকা দিয়ে দেয়।

ঘটনা হিন্দু মহাসভা ও কট্টর আরএসএস তরুন কর্মীদের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালল।ক্ষোভ আরও বাড়ল যখন গান্ধীজী মন্দিরে বসে সকলকে কোরানের বানীর মধ্যে কোথায় কোথায় সম্প্রীতির কথা বলা আছে সেগুলি বোঝাতে শুরু করলেন।গান্ধীজী সোহরাওবর্দিকে শহীদ বলে উল্লেখ করার পর ক্ষোভের আগুন আরও জ্বলে উঠল।

বিকেল ৪টে বেজে ৫০মিনিট।গান্ধীজী পার্থনাসভায় যোগদানের জন্য দুজন তরুনীর কাঁধে ভর দিয়ে বেরিয়ে আসছেন।সামনেই উদ্ধত পিস্তল হাতে একজন তরুণকে দেখে গান্ধীজী বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না।নাথুরাম গডসে পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গান্ধিজিকে গুলি করলেন।মুহূর্তে ইতিহাসের এক অধ্যায়ের যবনিকা পড়ল।গুলি করার পর নাথুরাম পালিয়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেনি। হাতে পিস্তল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল পুলিশ আসা পর্যন্ত।ঘটনার একমাস পর আরও সাতজন ধরা পরে যার মধ্যে গোপাল গডসেও ছিল।পরে দিগম্বর বাজদে মামলায় রাজসাক্ষী হয়।

নাথুরাম হত্যার দায় সম্পূর্ণ নিজের কাঁধে তুলে নেন।স্বীকারোক্তিতে নাথুরাম বলেন যে ভারত বিভাজন ও লক্ষ লক্ষ হিন্দুকে ঘরছাড়া ও হত্যা করিয়ে শরণার্থী বানিয়েছেন গান্ধীজী, তাই তাকে হত্যা করেছি।

নাথুরাম জেলে থাকা কালে গান্ধীজীর ছেলে রামদাস গান্ধী তাকে একটি চিঠি লেখেন।রামদাস গীতা উপনিষদ থেকে নানান উদ্ধৃতি তুলে লেখেন-“একজন বৃদ্ধকে হত্যা করে তোমার ধার্মিক হৃদয় কি অনুতপ্ত নয়”? জবাবে নাথুরাম লেখেন-অখণ্ড ভারত ও তার সন্তানদের স্বার্থরক্ষার্থে গান্ধীজীকে হত্যা করেছি তাই আমার হৃদয়ে কোন অনুতাপ নেই।ফাঁসির আগে নাথুরামের একটাই স্লোগান ছিল- অখন্ড ভারত অমর রহে।

যারা জেতে তাদের নিয়েই ইতিহাস লেখা হয়।বর্তমান ভারতে নাথুরামের ভাতৃপ্রতিমরাই সরকারে ক্ষমতাসীন।যারা অক্ষরে অক্ষরে নাথুরামের পদাঙ্ক অনুসরন করছে।ক্ষমতায় এসেই যারা গান্ধী-নেহেরুর মৃত্যুবার্ষিকীর ওপর ছুরি চালায়।দেশকে বোঝাতে আরম্ভ করে তিলক- ত্রিশূল একমাত্র আদর্শের পথ।গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে যাতে ভারত সেকুলারিজমের পথ থেকে বেলাইন হয়ে পড়ে।সাময়িক সংখ্যাগরিষ্ঠের মদমত্তে যারা ভাবছে তাদের ষড়যন্ত্র সফল হবে আসলে তারা মূর্খ।১৯৪৭ আর ২০১৪ থেকে শুরু হওয়া প্রয়াস এক নয়।আজকের ভারতবাসী আর পেছনফিরে তাকাতে চায় না আর সেই কারনেই এরা কোনদিনও সফল হবে না।এদের দেখে আমার খুব দুঃখ হয়।এরা আজ অবধি ভারতের সনাতনি বুননটাই ধরতে পারলো না।হ্যাঁ- কিছু লুম্পেনদের অবশ্যই জন্ম দিতে পেরেছে। এখন দেখার স্বাধীনতার ৭০ বছর পর ভারতবাসী পেছনফিরে তাকায় কি…না।

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *