“গরুর আমি, গরুর তুমি- গরু দিয়ে যায় চেনা”– লিখেছেন, দেবাশীষ পাইন

The-continuity-of-cow-politics_64024_730x419-mসাংবিধানে ভারতবর্ষকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে উল্লেখ করা আছে।সেই  ভারত এখন মৌলবাদী নরেন্দ্র মোদির চক্করে পড়ে ডুবতে বসেছে।গরুকেন্দ্রিক রাজনীতিতে গোমাতার কি লাভ হচ্ছে বলা মুশকিল কিন্তু এটা বলা যায়, দেশজুড়ে অস্থির অবস্থার জেরে সাধারন মানুষ নাজেহাল।গোয়েবলসের নীতি ছিল অনেকে একসঙ্গে বারবার কোন মিথ্যা কথা বললে সেটাই একসময় সত্য হয়ে যায়।একই ক্যায়দায় কোন অন্যায়কে ন্যায়ের জামা পরিয়ে বারবার বললে একদিন সেটাই ন্যায়ের মর্যাদা পায়।এই কাজটি নিরন্তর করে চলেছে বিজেপির কিছু ধামাধরা সংবাদ মাধ্যম ও বিজেপিকে নিয়ন্ত্রনকারি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, বজরং দল ও শিবসেনাদের মতো কিছু সংগঠন। বিজেপি,রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, বজরং দল ও শিবসেনাদের গরুকেন্দ্রিক রাজনীতি ভারতের চিরন্তন অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ ও সহিষ্ণু চেতনাকে গ্রাস করতে চলছে।এখন অবস্থাটা এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে,তুমি যেকোন ধর্ম ও বর্ণের হতে পারো কিন্তু পরিষ্কার জেনে নাও গরু বাঁচলে তুমি বাঁচলে নাহলে তুমিও মরবে!এমন ভারতকে আমরা চিনতাম না।

উত্তরপ্রদেশে দাদরি এলাকায় হিন্দু উগ্রবাদীদের অন্ধ ধর্মান্ধতার শিকার হতে হয়েছে মোহাম্মদ একলাখকে।এই হত্যার ঘটনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে অনেক কিছু দেখিয়ে দিয়েছে।আমরা যারা সহিষ্ণু ভারতের ছবি দেখতে দেখতে বড় হয়েছি তারা আজও বিশ্বাস রাখি ব্যক্তি স্বাধীনতায়।আর উল্টোদিকে একদল ধর্মান্ধ মানুষ যারা উন্মত্ত হয়ে উঠেছে আরও একলাখের মতো ঘটনা ঘটাতে।পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ যেখানে দৈনন্দিন আমিষের চাহিদা মেটাতে গরুর মাংস খান,সেখানে কেবল ধর্মের দোহাই দিয়ে ভারতবর্ষে গরু খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে চলেছে বিজেপির কট্টরপন্থি অনুগামীরা।

গরু প্রেমি সংঘ পরিবারের কাছে এখন মানুষের মূল্য তুচ্ছ; গরুর মূল্য ঈশ্বরের চেয়েও বড়।এই উন্মত্ত মানুষগুলো আজ প্রধানমন্ত্রীর ছত্রছায়াতেই বেড়ে উঠছে!তাই এদের হাত ধরে ভারতজুড়ে চলছে গরুকেন্দ্রিক অপশাসন।এখন সবচাইতে বড় প্রশ্ন,মানুষ ধর্মকে এনেছে না ধর্ম মানুষকে?মানুষের জন্য ধর্ম না ধর্মের জন্য মানুষ?ধর্ম কি মানুষ মারার কল হতে পারে?এমন প্রশ্নগুলি পরিষ্কার না হলে ভারতবর্ষ কিন্তু বাকি পৃথিবীর থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো রয়ে যাবে।আমরা এক ভয়ঙ্কর আত্মহননের পথে চলছি।

স্বামী বিবেকানন্দ তখন বেঁচে।একদিন গোরক্ষা সমিতির এক সদস্য গরুর ছবি হাতে করে স্বামীজির সঙ্গে দেখা করতে এলেন।স্বামীজি সদস্যটিকে আগমনের কারন জিজ্ঞাসা করাতে তিনি বললেন,গোমাতাকে কসাইয়েত হাত থেকে রক্ষা করাই গোরক্ষা সমিতির ব্রত।স্বামীজি শান্ত হয়ে শুনলেন।জিজ্ঞাসা করলেন মধ্য ভারতে দুর্ভিক্ষে নয় লাখ মানুষ মারা গেছে তাদের সাহায্যে আপনার সমিতি কি করছে?লোকটি বললেন,তাঁরা শুধু গরুদের জন্যই কাজ করে থাকেন।তার যুক্তিতে আরও বললেন-দুর্ভিক্ষ হয়েছে মানুষের কর্মফলে,এখানে তাঁরা কী করবেন? বিবেকানন্দ বললেন,তাহলে তো বলতে হয় যে গোমাতারাও নিজের কর্মফলে কসাইয়ের হাতে মরছেন।স্বামীজির কথায় সদস্যটি ব্যোম মেরে গেলেন।আমতা আমতা করে বললেন-আসলে গরু আমাদের মা,তার হত্যায় তো প্রতিবাদ করতেই হবে।স্বামীজি হেসে বললেনঃঠিক বলেছে, নাহলে এমন সব কৃতি সন্তানদের কে আর প্রসব করবেন?

বিজেপির আচরণ দেখে বাঁচব না মরব ভেবে থই পাচ্ছিনা।গোমাংস ভক্ষনের বিরুদ্ধে কট্টরপন্থীদের তাণ্ডব ভারতবর্ষকে আজ অস্থির করে দিয়েছে।যে গোমাংস নিয়ে এতো অশান্তি সেই মাংসের রপ্তানি করে কট্টরপন্থী নরেন্দ্র মোদির বন্ধুরাই কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছে।আবার ওপর দিকে হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, মুসলমানরা ভারতে বসবাস চালিয়ে যেতে পারে, তবে তাঁদের গরুর মাংস খাওয়া ছাড়তে হবে!এই আচরণকে ভণ্ডামি ছাড়া আর কি বলা যায়?
ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে সমস্যাও বিশাল।প্রতিদিন জীবনযুদ্ধের সঙ্গে সংগ্রাম করতে গিয়ে প্রায় পুরো প্রানশক্তি বেরিয়ে যায় সেখানে গো-মাতা নিয়ে মাথা ঘামানোর অবসর কোথায়?১২৫ কোটি জনসংখ্যার ভারতে যখন বেশিরভাগ মানুষই গরু রাজনীতির অনুগামী নয়, সেখানে মানুষের মতামতের পরিমাপটা হবে কিভাবে?এসব প্রশ্ন বিজেপির সামনে রাখা আর মহিষের সামনে বিন বাজানো,একই।

কথায় আছে- আপরুচি খানা আর পররুচি পহেননা। আমি কি খাব আর কি পরবো সেটা ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকারে আমিই ঠিক করব, বিজেপি তুমি ঠিক করে দেওয়ার কে? যে সমস্থ হিন্দুত্ববাদীরা আজ ধর্মের কথা বলে গরুর মাংস নিয়ে রাজনীতি করছেন তানারা কি ভালো করে হিন্দু শাস্ত্রের ইতিহাস পাঠ করেছেন?প্রাচীন ভারতে গোমাংস খাওয়ার রেওয়াজ ছিল।প্রমান আছে প্রাচীন লেখায়।কালক্রমে এই প্রাচীন রেওয়াজ লুপ্ত হয়।কিন্তু আজও ভারতে কিছু অঞ্চল আছে যেখানে গোমাংস খাওয়ার রেওয়াজ চালু আছে।কেরালা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে এখনো গরুর মাংস খাওয়ার অভ্যাস চালু আছে। কেরালায় ৭২টি সম্প্রদায় গরু খায় এবং এদের অনেকেই হিন্দু।আবার অনেক হিন্দু আছেন যারা  গরুর মাংস স্পর্শ করেন না।এই পংতিতে অনেক মুসলিম পরিবারও পড়েন।যারা গোমাংস স্পর্শ করেন না।আর, তাছাড়া কে স্পর্শ করেন আর না করেন সে নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলে।বরং প্রতিবাদের ঝড় উঠুক রাষ্ট্র কেন ব্যক্তি খাদ্য অভিরুচির ওপর হস্তক্ষেপ করবে?আদৌ কি রাষ্ট্র সেটা করতে পারে?আরও একটা বড় প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে-গোমাংস বন্ধ হলে মাংসশিল্পের সঙ্গে জড়িত লোকেদের জীবন জীবিকার ভবিষ্যৎ কি হবে?হিন্দু মৌলবাদীরা ভেবেছেন কি?শুধু ফরমান জারি করবেন, পরিনাম না ভেবে, তা কি করে হয়!কোন বিজেপির নেতা ফিনাইলের বদলে গরুর মূত্র দিয়ে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পরামর্শ দেবেন,কেউ  অ্যালোপাথিক ওষুধ ছেড়ে গো-মূত্র ও গোবরের সমন্বয়ে তৈরি আয়ুর্বেদিক ওষুধকে সব রোগের প্রতিরোধক বলে দাবি করবেন, বলি হচ্ছেটা কি ভারতে?এরা কারা বিধান দেওয়ার?ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দুই নেতা,গান্ধী ও নেহরু সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক ছিলেন।কেউ আঙ্গুল তুলতে পারবে না।কখনও শুনিনি গান্ধী মন্দিরে গিয়ে মূর্তির সামনে মাথা নত করেছেন।গীতার শ্লোক আর নীতিকে সম্বল করে ফকিরের বেশে দিন কাটিয়েছেন।সবরমতীর আশ্রমে কোন পুজো পার্বণ হয় না।এই দুজন নেতা ভারতের শাশ্বত পরম্পরাকে হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন তাই ভারত তথা বিশ্বের দরবারে এনারা আজও পুজিত।ধর্মীয় মৌলবাদ কোনদিনও এদের স্পর্শ করতে পারেনি।মোদী কোথায় লাগে এদের সামনে?বরং বলা ভালো মোদীর চক্করে পড়ে-গরুর চক্রেই ভূত হতে বসেছে ভারতের বর্তমান রাজনীতি!

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *