গঙ্গা তোমায় কে বাঁচাবে? লিখেছেন, দেবাশীষ পাইন

Indian men search for coins and gold in the polluted waters of the Ganga river at Sangam after the Kumbh Mela festival, in Allahabad on April 2, 2013.  The two month long Kumbh Mela, celebrated every 12 years at the conjunction of two sacred rivers on the outskirts of the northern Indian city of Allahabad, drew massive crowds of devotees, ascetics and foreign tourists till its conclusion on March 10.  AFP PHOTO/SANJAY KANOJIA        (Photo credit should read Sanjay Kanojia/AFP/Getty Images)গঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের একমাত্র শহীদ স্বামী নিগমানন্দের আত্মবলিদান বিফলে যেতে চলেছে।যে গঙ্গাকে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু ভারতের প্রান আখ্যা দিয়েছিলেন সেই গঙ্গা আজ দূষণের কবলে পড়ে প্রানসংকটে।গঙ্গা দেশের ১১টি রাজ্যের প্রায় ৬০কোটি মানুষের ব্যবহারে লাগে।তুলনায় বিশ্বের আর একটিও নদী নেই।বিশ্বের প্রাচীনতম দুই নগর পাটনা ও বারানসী  এই গঙ্গার তিরেই অবস্থিত।২৯টি শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা এই নদীর ক্ষেত্রফল প্রায় ৪লক্ষ বর্গমাইল।পালা পার্বণে অন্তত ৯কোটির মতো মানুষ গঙ্গায় স্নান কর আর আজ সেই গঙ্গায় প্রতিদিন প্রায় ২৯০কোটি লিটার বজ্য ফেলা হয়।

গঙ্গার জলবাহিত রোগ ৬৬ শতাংশ।গঙ্গার জলে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা ৫৫০০ যা স্বাভাবিকের থেকে অনেক অনেক বেশি।প্রতিদিন ১২শতাংশ শিল্পবজ্য,৮২শতাংশ মিউনিসিপ্যাল নিকাশি এবং অন্যান্য বজ্য প্রতিদিন পতিতপাবনি গঙ্গাকে কলুষিত করে চলেছে।ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ ২০১২ সালে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে সেই রিপোর্টে বলা হয় গঙ্গা দূষণের জন্য উত্তরপ্রদেশ,বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা দেশের অন্য প্রান্তের চেয়ে বেশি।

গঙ্গাকে কলুষমুক্ত করে বাঁচাতে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী তার স্বপ্নের গঙ্গা অ্যাকসান প্ল্যান তৈরি করেছিলেন।গঙ্গা অ্যাকসান প্ল্যানও বেশ কয়েক দশক অতিক্রান্ত করল কিন্তু গঙ্গা যেখানে ছিল সেখানেই পড়ে আছে।বিহারের দ্বারভাঙ্গা থেকে স্বরুপমকুমার গিরিশ দিল্লি এসেছিলেন আইআইটির ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে।কিন্তু নিজের রাজ্যে দেখা গঙ্গা মাইয়ার করুন দশার কথা মাথার মধ্যে অহরহ ঘোরপাক খেত। তাই ইঞ্জিনিয়ার হওয়া আর হল না,হরিদ্বারে মাতৃসদন আশ্রমের স্বামী শিবানন্দের অনুপ্রেরনায় জুটে গেলেন গঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনে।চারমাস অনশন করার পর দেরাদুনের হিমালয়ান হাসপাতালে নিগমানন্দের গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটে।তিনিই গঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের প্রথম শহীদ।নিগমানন্দের তো গঙ্গাপ্রাপ্তি হল কিন্তু গঙ্গার প্রাপ্তি কি সত্যি কিছু হয়েছে?

Nigamananda_Saraswati_image

বিগত তিন দশক ধরে কেন্দ্রীয় সরকার ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচ করে ফেলেছে এই প্রকল্পে অথচ উন্নতির পরিবর্তে ক্রমাবনতি। ২০১৪ সালে গঙ্গাদূষণ রোধে কেন্দ্রীয় সরকারের সদিচ্ছার বিরুদ্ধে আনা একাধিক মামলার শুনানি একসঙ্গে করে সুপ্রিম কোর্ট।শুনানির পর সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত কড়া ভাষায় সরকারের সদিচ্ছার সমালোচনা করে।কোর্টের বক্তব্য, নির্বাচনের সময় গঙ্গা সংস্কারের বিষয়টি ইস্তাহারে থাকে কিন্তু নির্বাচনের পরে বিষয়টি নিয়ে কারোর কোনও উৎসাহ বা উদ্যম দেখা যায় না।সরকারের কাজের হাল দেখে সন্দেহ হয় আগামী ১০০ বছরেও গঙ্গাকে সংস্কার করে কলুষমুক্ত করা যাবে কিনা!

দু দফায় গঙ্গা অ্যাকসান প্লানের বহু প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে।ফলে দিনকে দিন গঙ্গা আরও দুষিত হচ্ছে।বিগত নির্বাচনে বাকপটু নরেন্দ্র মোদী আগের সরকারের ব্যর্থতার কথা তুলে নির্বাচনী যুদ্ধে গঙ্গা দূষণকে হাতিয়ার করেছিলেন।এমনও বলেছিলেন যে গঙ্গা মাইয়ার ডাকে তিনি ভাদোদরা থেকে ছুটে এসেছেন বারানসিতে।দূষণমুক্তির জন্য মা গঙ্গা সন্তানের অপেক্ষা করছে।এবার মাকে তার প্রতিদান ফিরিয়ে দেওয়ার পালা।কেন্দ্রীয় সরকারে প্রধানমন্ত্রীরুপে মোদীর সাত বছর হতে চলল।এর মধ্যে তিনি ২০১৪ সালে নমামি গঙ্গা নামে একটি নতুন প্রকল্পের নামে ২০৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করে চমক দিয়েছেন কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।উল্টে ২০০৯ সালে আইআইটি বিশেষজ্ঞ কমিটি যে রিপোর্ট দিয়েছিল মোদী সরকার সরাসরি তার উল্টো পথে হাঁটা শুরু করে দিয়েছে।

স্বামী নিগমানন্দ গঙ্গার প্রান বাঁচাতে নিজের প্রান বলি দিয়েছিলেন তাতেও গঙ্গার প্রাণসংকট কাটার লক্ষণ মাত্র নেই বরং আরও অবনতি হচ্ছে।আজ ভারতের বাচ্ছারাও জানে যে গঙ্গা মানেই বিষের ধারা।জাপানের প্রধানমন্ত্রী ভারতে আসলে তাকে গঙ্গার পাড়ে বসিয়ে গঙ্গারতি দেখান যায় কিন্তু তা দিয়ে গঙ্গার গঙ্গাপ্রাপ্তিকে রোধ করা যায় না।দেখে শুনে সবটাই গঙ্গার প্রতি বিদ্রূপ মনে হয়।হাজারিকা কণ্ঠে বলতে ইচ্ছে করে—ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন?

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *