কারন বিপ্লব স্পন্দিত বুকে ওরাই লেনিন, সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল।

farmer-pti-1সবকে সাথ সবকা বিকাশের নাটক শেষ। উন্নয়নের বেলুন ফুটো হয়ে গেছে। তাই ৫০০০০ হাজার কিষাণ পায়ে হেঁটে মিছিল করে প্রমাণ দিলেন মোদীর রাজত্বে নীরব-মালিয়ারা অবাধে টাকা লোপাট করে অন্য রকম ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সূত্রপাত করতে পারে। আর কিষাণরা তাদের দাবী মেটাতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মহারাষ্ট্রের রাজপথে এঁকে দেয় রক্তিম রাঙ্গোলী। তা হলে প্রমাণ হল বাজেটের বুকনিগুলো প্রান্তিক মানুষদের জন্য নয়। তাই চিৎকার করে বলছে কিষান, মোদী সরকার তুমি কার? মোদী হেসে বলে “যখন আমায় যে কাটমানি দেয় তখন আমি তার”।
দুবেলা আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া মানুষগুলো খাদ্যের অভাবে মুখে বিষ তুলে নিচ্ছে। তাদের ঐ নগ্ন ধুলি ধূষরিত রক্তাক্ত পদে প্রণাম জানিয়ে বলি “জয় কিষান।”

ভাবতে অবাক লাগে আজ বিদর্ভকে ভারতে আত্মহত্যার রাজধানী বিদর্ভ বলা হচ্ছে কারণ তিন বছরে শুধু এ অঞ্চলটিতেই আত্মহত্যা করেছেন প্রায় ৩ হাজার ১৪৫ জন কৃষক৷ কেউ কেউ তাই বলছেন, ভারতের রাজধানী দিল্লি, তবে আত্মহত্যার রাজধানী বিদর্ভ৷

সিপিএম বলল এই আন্দোলন নাকি তাদের নেতৃত্বে সফল হয়েছে। কিন্তু  মিছিলে জয় শিবাজী, জয় ভবানী স্লোগান শুনে কি সিপিএম শিখল যে বিপ্লব মানেই রাশিয়া নয়। দেশীয় সংস্কৃতিতে বিশ্বাস রাখা দেহাতি মানুষও বিপ্লব করতে পারে।

গান্ধীজীর দেখানো পথে আন্দোলনে কিষাণদের এগিয়ে আসা কাঁধে লাল পতাকাকে যারা বলছে বামপন্থীদের ফিনিক্স হয়ে বেঁচে ওঠার নমুনা তাদের বলি ৪/৫/১৮৮৬ আমেরিকার শিকাগো শহরের শ্রমিকরা শ্রমের বিনিময়ে নায্য মজুরি, পরিবেশ সম্মানের দাবীতে হেমার্কেট স্কোয়ারে যে আন্দোলন করছিল তাতে তাদের কাঁধে ছিল সাদা রঙের পতাকা শ্রমিকদের রক্তে আর শ্রমজীবী মানুষের নেতা অগাস্ট স্পীজের আত্মবলিদাননে তাদের পতাকা হয়ে ওঠে রক্তিম।

আসলে সিপিএম  নেতারা তো মনে মনে জানেই যে আসলে ওদের মিছিলটা মুম্বাই অব্দি  গাইড করে নিয়ে আসা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলনা।  কারন আমরা যে পায়ের চামড়া কেটে যাওয়া মায়ের ছবি দেখছি বা যে বয়স্ক ভদ্রলোকের ছবি দেখছি তাদের কারুরই আন্দোলনের দাবী দাওয়া নির্ধারনে বা তার সমাধানে কোন ভূমিকা ছিলনা।নেতাদের কাছে তারা বোড়ের বেশী কিছুই ছিলেননা। ফলে গত তিনবছরে তাদের সমস্যার সমাধান হয়না।আসলে ভারতবর্ষের কৃষি এখন এক সঙ্কটের মুখে রয়েছে। কৃষক এখন সঙ্কটের মুখে।

পশ্চিমবাংলায় দীর্ঘ ৩৪ বছর সিপিএম রাজত্ব করেছে। সিপিএমের দাবী তারাই নাকি প্রকৃত কৃষক দরদী দল। প্রতিটি কৃষক নাকি অপারেশান বর্গার পরে নিজের বুকের মধ্যে লেনিন একে নিয়ে চাষ করে উন্নতির চরম শিখরে পৌছে গেছে। কিন্তু তাহলে এরাজ্যে কেন এত কৃষক আত্মহত্যা হতো? কেন হয়েছিল মরিচঝাঁপি?
“মেহেরবানি  নকো। হক হবেত”। দয়া না। অধিকার চাই। শীর্ণ কন্ঠের দীপ্ত স্বরে বয়বৃদ্ধ তরুণরা জানাতে চায় রাষ্ট্র তাদের কি দিয়েছে? জীবন তাদের শিখিয়েছে গলায় ফলিডল ঢালা আর না, ফাঁসিতে ঝুলে যাওয়াও নয় “হক চাই”। লুট হয়েছে তাদের বন, নদী, খনি। লুট হয়েছে  বাঁচার অধিকার। তাদের খাবার জোটে না।

তরুণ সাংবাদিককে লং মার্চের কারণ জানতে চাইলে  বলেছেন আমরা ভূমিহীন আদিবাসী। দাক্ষিণাত্যের কৃষ্ণ মৃত্তিকায় সাদা কার্পাস, পশ্চিমঘাট পর্বতমালার  গোদাবরী নদী, দামন গঙ্গা, গিরনা, মোসাম, তাপ্তি নদী এসব প্রাকৃতিক দান,  লুট হয়ে গেছে নদীর জল,তাঁদের অধিকার। উৎপাদিত ফসলে লুট হয়ে গেছে। তাদের অধিকার নেই। অধিকার বাজারের। দড়িটা যখন গলার চামড়া কেটে বসে যায়, বিষের বুঁদ যখন জ্বালিয়ে দেয় গলা থেকে উদর, মিটিয়ে দেয় ভুখ, তখন খুব ইচ্ছে করে বাঁচি। লড়াই করেই বাঁচি। কুঞ্চিত চামড়ার নীচে করুণ দিল দেখল দেশ। আমাদের বাঁচানোর দায়বদ্ধতায়, নিজেদের নূন্যতম অধিকার বর্জন করা মানুষগুলোর লড়াকু মুখ দেখল দেশ।ফোস্কা  পড়া রক্তাক্ত পা নিয়ে হেঁট চলা মানুষ গুলো দেখিয়ে দিল বৈষ্যমের উদাহরণ।

কৃষকদের দাবি, শোধ করতে না পারা ঋণ মকুব করতে হবে৷ জমির ওপর কৃষকের দাবি পূরণ করতে হবে৷ ফসলের ন্যূনতম দাম ধার্য করতে হবে৷ কৃষকদের জন্য পেনশনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং কৃষকের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে৷ অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে কৃষকদের প্রতিটি দাবিই ন্যায় সংগত৷  চাপের মুখে বিজেপি-র মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফরণবীশও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলার এবং তাঁদের দাবি বিবেচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন৷
বস্তুত, এত বড় কৃষক মিছিল দেখে বহু সমাজবিজ্ঞানীই তেভাগা আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন৷ বলছেন, এভাবেই সেদিনের স্বতঃস্ফূর্ত কৃষক মিছিল ভয়াবহ আন্দোলনের চেহারা নিয়েছিল৷ সরকার গোড়াতেই কৃষকদের মন জিততে না পারলে যে কোনো সময় ঝড় উঠতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা৷

আর আমরা এই তরুণ বিপ্লবীদের উদ্দেশ্যে বলি
“লেট দেম ফাইট”।
কারণ বিপ্লব স্পন্দিত বুকে ওরাই লেনিন।

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *