ঈশ্বরের দুত, চোখের জলে লঘু শাস্তির পার্থনা- আদালতে!!! লিখেছেন, সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

Gurmeet-Ram-Rahim-Singh-new_380_APসনাতন গোস্বামী একদিন মহাপ্রভুকে জিঞ্জাসা করিলেন প্রভু জীবের স্বরুপ কি, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য দেব বলিলেলন”নিত্য কৃষ্ণ সেবা, কৃষ্ণের দাস এই হল জীবের স্বরুপ”।
চৈতন্যদেবের (১৪৮৬-১৫৩৪) গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মই প্রথম বাঙালী হিন্দুত্বের একটা প্রথম আইডেন্টিটি। তিনি জাতিভেদ তুলে দিলেন। শুদ্রদের ডেকে নিলেন। সব হিন্দু আচার বর্জনের ডাক দিলেন। ফলে ইসলামের রথও আটকে গেল। যদি কেউ মাটির ধর্মে সাম্য পায়,সে নিশ্চয়ই আরবের ধর্মে সাম্য খুঁজতে যাবে না ! সেই সময় আসলে অনেকেই ইসলাম নিয়েছিলেন নামে মাত্র। সেই অর্থে আরবের সাথে কোন যোগাযোগ ছিল না । ফলে এক বিপুল সংখ্যক মুসলিম আবার মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের হরি-সংকীর্তনে হিন্দু ধর্মে ফিরে এল। চৈতন্য ভাগবতে এর উল্লেখ আছে।

যবন হরিদাস। এক অন্যতম বৈষ্ণব, ভক্ত, মহাপ্রভু  প্রেমের সহচর। তো, এ হেন হরিদাস ঠাকুর যখন বৈষ্ণব হলেন তখন কাজী তার মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করলেন। হরিদাস ঠাকুর এক মুল্যবান কথা কাজীকে বলেন “প্রকৃত ভক্তের ভগবান এক, আর ধর্মের দ্বারা সে ভগবানকে আলাদা করা যায় না।”
সনাতন ধর্ম বলতে কোন সাম্প্রদায়িক ধর্মপদ্ধতিকে বোঝায় না। এটি হচ্ছে পরম শ্বাশত জীব সকলের নিত্য ধর্ম। গীতার যথাযথ সংস্করণের মুখবন্ধ পড়লেই তা জানা যাবে, সনাতন ধর্ম হচ্ছে জীবের নিত্য ধর্ম। শ্রীপাদ রামানুজাচার্য সনাতন শব্দটির ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “যার কোন শুরু নেই এবং শেষ নেই”। তাই এই ধর্মের আদি নেই এবং অন্ত নেই।

ভাবতে অবাক লাগে এই ভারতমাতৃকা তার গর্ভে ধারণ করেছেন দুই নাঙ্গা ফকিরকে যাদের জন্য তিনি রত্নগর্ভা।শ্রী মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য দেব ও মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী। আজ সেই দেশেই কি করে ভন্ড ধর্মগুরুদের রমরমা ব্যবসা চলে? চলে ধর্মের নামে নারী ধর্ষণ-খুন। আর সেই ভন্ডের সমর্থনে শাসক ও শাসক দলের সমর্থক জনতা আগুন হাতে তুলে নেয়?এই কি সেই ভারত যেখানে স্বামী বিবেকানন্দ বিদেশের মাটিতে সগৌরবে ভারতমাতৃকাকে তুলে ধরেন?
এই কি সেই ভারত যেখানে ৬৪ বছর বয়স্ক একজন বৃদ্ধ শারীরিক অসুস্থতা অগ্রাহ্য করে জাহাজে করে আমেরিকায় যান সনাতন ধর্ম আর প্রেম দেবতার প্রতিষ্ঠা করতে! অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ যে দেশের ধর্মপ্রচারক সে দেশের ধর্মগুরু বাবা রাম রহিম!

নরেন্দ্র দাভোলকার, গোবিন্দ পানসারে, এম এম কালবুর্গি তবে বৃথাই প্রাণ দিলেন।মুর্তিপুজা, তাবিজ,কবচ, মাদুলি কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন বলে ধর্মের দালাল ঠিকাদাররা তাদের প্রকাশ্যে প্রাণ নিল। একের পর এক স্বতন্ত্র স্বাধীন চিন্তার কন্ঠরোধ।

মুক্ত স্বাধীন যুক্তিবাদী মতকে নৃশংস হত্যা। দিনের আলোয় কপালে বুলেট বিদ্ধ করলো। গোঁড়া ধ্যান-ধারণা, অন্ধ বিশ্বাসকে হাতিয়ার করে প্ররোচিত করা হচ্ছে সামাজিক শক্তিকে। রাজনৈতিক আধিপত্যের খোঁজে মুক্ত চিন্তাকে নিকেশ করতে চলছে বেপরোয়া অভিযান। কালবুর্গির পর হত্যার হুমকির দেওয়া হয় মহীশূরের বাসিন্দা, বিশিষ্ট কন্নড় লেখক কে এস ভগবানকে। দু’বছর আগে  আগস্টেই, পুনে শহরে হিন্দুত্ববাদী শক্তির আততায়ীদের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন মহারাষ্ট্রে কুসংস্কার-বিরোধী আন্দোলন তথা জাতপাতের ভেদাভেদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আজীবন যোদ্ধা সুচিকিৎসক নরেন্দ্র দাভোলকার। ফেব্রুয়ারিতে, কোলাপুরে গোবিন্দ পানসারে। দু’টি ঘটনাতেই অপরাধীদের এখনও গ্রেপ্তার করা হয়নি। শেষ ঘটনা, আততায়ীর গুলিতে নিহত হলেন বিশিষ্ট কন্নড় লেখক ও শিক্ষাবিদ মাল্লেশাপ্পা এম কালবুর্গি। গবেষক, কর্ণাটক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য কালবুর্গিকে নিজের বাড়িতেই গুলি করে হত্যা আততায়ীরা। হত্যার কারণ খুঁজতে সিবিআই তদন্তেরও কোনও দরকার নেই। স্থানীয় বজরঙ দলের নেতার ট্যুইট-ই যথেষ্ট। কালবুর্গির হত্যার পর জান্তব উল্লাসে বানতোয়ালে বজরঙ দলের যৌথ আহ্বায়ক ভূবিথ শেট্টির ট্যুইট: ‘তখন ছিল ইউ আর অনন্তমূর্তি, এখন এম এম কালবুর্গি। হিন্দুত্বকে নিয়ে তামাশা এবং একটি কুকুরের মৃত্যু। এবং প্রিয় কে এস ভগবান, এরপর আপনি।’ দুই সীমান্তের ওপারে তালিবান, জামাত। শিকার হুমায়ুন আজাদ, অভিজিৎ রায়, নিলাদ্রিরা। এপারে টার্গেট দাভোলকার, পানসারেরা। দুই মৌলবাদ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
ভারতে যবে থেকে মুক্ত চিন্তার ধারক বাহকদের গলা টিপে মেরে ফেলা শুরু হয়েছে তবে থেকেই বাবা রাম রহিমের মত নর পিশাচদের উৎপওি হচ্ছে। এসব স্বঘোষিত ধর্মগুরুদের হাত থেকে আমাদের মুক্তির একটাই উপায়। অন্ধসংস্কার ঝেড়ে ফেলে যেখানেই এই নারকীয় ঘটনার কথা কানে আসবে আসুন এক যোগে প্রতিবাদ করি।

স্বঘোষিত ধর্মগুরুদের মধ্যে রয়েছেন অনেকেই। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, চন্দ্রস্বামী, ধীরেন ব্রম্মচারী, আসারাম বাপু, গুরমীত রাম রহিম সিং, নিত্যানন্দ স্বামী, স্বামী প্রেমানন্দ, স্বামী সদাচারী, চিত্রকূটের ইচ্ছাধারী সন্ত স্বামী ভীমানন্দ জি মহারাজ, মহাঋষি মহেশ যোগী, ওশো রজনীশ প্রমুখ।

চন্দ্রস্বামী: একাধিক রাজনীতিকদের সঙ্গে ওঠাবসা ছিল তার। খুবই প্রভাবশালী ছিলেন তিনি। রাজীব গান্ধী হত্যায় তাঁর যোগসূত্র ছিল বলে ১৯৯৮ সালে এম সি জৈন রিপোর্টে দাবি করা হয়।  আশ্রমে আয়কর হানাতেও একাধিক অস্ত্র ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ মেলে।

ধীরেন ব্রহ্মচারী: তিনি ইন্দিরা গান্ধীর যোগগুরু ছিলেন। তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের ধরণ নিয়ে সেই সময় বিতর্ক ছড়ায়। ১৯৯৪ সালে মৃত্যুর পর তাঁর একাধিক সম্পত্তি বেআইনি বলে ঘোষণা করে দখল নেয় সরকার।

গুরমীত রাম রহিম সিং:ডেরা সাচ্চা সওদা গোষ্ঠীর প্রধান গুরু। সিরসায় গোষ্ঠীর সদর দফতরে মহিলা ভক্তদের ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। দুই সাংবাদিককে হত্যার চক্রান্তেও নাম জড়িয়েছে।

আসারাম বাপু:আশ্রমের গুরুকুলে দুই বালকের হত্যার অভিযোগে প্রথম খবরে আসেন। মহিলা ভক্তদের ধর্ষণের দায়ে আপাতত জেলবন্দি। ধরা পড়েছেন তাঁর ছেলেও।

নিত্যানন্দ স্বামী:এক দক্ষিণী অভিনেত্রীর সঙ্গে তাঁর যৌনসম্পর্কের ভিডিও ফুটেজ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয় তাঁকে নিয়ে।

স্বামী প্রেমানন্দ:তিরুচিরাপল্লি আশ্রমের এই ধর্মগুরুর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ১৩ জন মহিলাকে ধর্ষণ করার প্রমাণ মেলে। এক শ্রীলংকার নাগরিককে হত্যার অভিযোগও ছিল।

স্বামী সদাচারী: একসময় প্রভাবশালী ছিলেন খুবই, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে প্রভাব হারান। যৌনপল্লী চালানোর দায়ে আপাতত জেলে আছেন।

চিত্রকূটের ইচ্ছাধারী সন্ত স্বামী ভীমানন্দ জি মহারাজ :১৯৯৭ সালে দেহ ব্যবসা চালানোর দায়ে লাজপত নগর থেকে গ্রেফতার হন। জেল থেকে বেরিয়ে নিজেকে সাই বাবার শিষ্য বলে পরিচয় দেন।

মহাঋষি মহেশ যোগী:আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ধর্মগুরু বলে দাবি। দেশের নানা জায়গায় ও বাইরের একাধিক দেশে আশ্রম রয়েছে। মহিলা ভক্তদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াসহ টাকা পয়সা নয়-ছয়ের অভিযোগ ওঠে।

ওশো রজনীশ:  রাজনীতি, ধর্ম, যৌনতা-সহ নানা বিষয়ে ছকভাঙা মতামতের জন্য বরাবরই বিতর্কের কেন্দ্র বিন্দুতে ছিলেন। আশির দশকে আমেরিকায় অভিবাসন সংক্রান্ত নিয়ম এড়ানোর অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন।

সমাজে তখনই গাঢ় তমসাচ্ছন্ন ক্ষণ নেমে আসে যখন ‘হাঁচি’, ‘টিকটিকি’, ‘কালো বেড়াল’ ইত্যীদি মানতে গিয়ে বিচার বুদ্ধি ও সাধারণ বিবেচনার ক্ষমতা লোপ পেতে থাকে। আজ বৈজ্ঞানিক অভিযান, প্রযুক্তির উন্নতির অভাবিত সুবিধার পাশাপাশি শিক্ষিত মধ্যবিত্তরাও নানা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। এই বৈপরীত্যের সহবাসকে কাজে লাগিয়ে রাম রহিমের মতো ধর্ষক খুনি বাবারা আজ সমাজের হোতা। একজন আশ্রমবাসী রমণীর অটল বিহারী বাজপেয়ীকে লেখা চিঠিটির প্রতিটি ছত্রে ঝরে পড়েছে তার রক্তক্ষরণ-যন্ত্রণা। তিনি নিজেই বলেছেন ‘আমাদের স্বাধ্ধী বলা হয়। ডাক্তারী পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হোক সত্যিই আমরা কুমারী কিনা? তদন্ত হোক কেন কে আমাদের কৌমার্য হরণ করল?”। বাঘের গুহায় থেকে এক অসহায় রমণী সাহস দেখাল কিন্তু প্রধান মন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী কেন সাহসী পদক্ষেপে তদন্ত করলেন না? সবথেকে বড় কথা মেয়েটির পরিবার ও গুরু রাম রহিমের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস তাকে অবিশ্বাস করে। আচ্ছা আসুন না আমরা যদি এই অন্ধ কুসংস্কার না ছাড়তে পারি তো আমাদের সংসারে মেয়ে জন্মানোর সাথেই তার গলাটা টিপে মেরে ফেলি আর এই কাজ না হয় মায়েরাই করি!

আমরা নিজেরা যদি এত অন্ধ হয়ে পড়ি তাহলে আমাদের বাঁচাবে কে? আমাদের নিজেদের কি একটু থিতু হয়ে নিজেদের বিচার করবার প্রয়োজন নেই! অবাক লাগে এই বাবা রাম রহিম জেলে গিয়েও  বহাল তবিয়াতে ভিআইপি ট্রিটমেন্ট পাচ্ছে।মিনারেল ওয়াটার থেকে বিশেষ সহায়ক, জেলেও বহাল ‘বাবা’র ট্রেডমার্ক পোশাক। মিলছে রকমারি রান্না। ফাই ফরমাশ খাটার জন্য এক জন সহায়ক। এ ভাবেই নাকি জেলের প্রথম রাতটা কেটেছে ধর্ষণের অপরাধে দোষী গুরমিত রাম রহিম সিংহের। সুনারিয়া জেলে নাকি তাঁকে রাখা হয়েছে ভিআইপি ব্যবস্থায়। এমনই অভিযোগ উঠেছে জেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত এবং গ্রেফতার হওয়ার পরই ডেরা প্রধান রাম রহিমকে হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হয় হরিয়ানার রোহতকে। প্রথমে তাঁকে পুলিশ গেস্ট হাউজে রাখার বন্দোবস্ত করা হয়। পরে রাতের দিকে তাঁকে সুনারিয়া জেলে পাঠানো হয়।

অভিযোগ, জেলেও নাকি ‘বাবা’র অপার মহিমার ঝলক দেখা যাচ্ছে। তার জন্য বিশেষ সেলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী কয়েদিদের সাধারণত জেলের পোশাকই পরতে হয়। কিন্তু জেলে রাম রহিমকে নাকি তাঁর পছন্দসই পোশাক পরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এইবার প্রশ্ন রাষ্ট্রের কাছে। রাষ্টের জন্য আমরা, নাকি আমাদের জন্য রাষ্ট্র? রাষ্ট্র নিজেই যখন ধর্মের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে তখন আমাদের কি করণীয়। ঠিক ভাবছেন। করতে আমরাই পারি হয়তো সময় লাগবে তবে ক্ষমতা কিন্তু জনগণেশের হাতেই আছে। শুরুটা করে দি আসুন সবাই মিলে একসাথে। এই লেখার আদ্যান্ত সম্পুর্ণ আমার ব্যক্তিগত মতামতের ভিওিতে তবে অবশ্যই সত্য নির্ভর। আপনারাও আপনাদের মতামত জানান। হোক না খোলা মনে আলোচনা। মতামতের অপেক্ষায় রইলাম।

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *