আসামে, সব বাঙালিকে এক মঞ্চে দাঁড়াতেই হবে।

FB-Featured-Protest-against-Citizenship-Amendment-Bill-Assam-representative-min-1আসাম রাজ্যে অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ে অনেক দিন ধরেই সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা বিরাজ করছে৷ সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা অভিবাসীদের বিতাড়নের পক্ষে ভয়ঙ্কর প্রচার চালাচ্ছে যার পেছনে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপির শক্ত সমর্থন রয়েছে৷

সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে আসামে ভারতীয় বৈধ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে গত দু বছর ধরে ৷ অসম রাজ্য থেকে তিন কোটির বেশি মানুষ ভারতের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছেন৷ তাদের মধ্যে ৪০ লাখ ৭ হাজার ৭০৭ জনের আবেদন বাতিল করা হয়েছে৷

আসামের বাসিন্দাদের জন্য ভারতীয় নাগরিকত্ব পেতে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে থেকেই রাজ্যটিতে বসবাস করছেন সেইটি প্রমাণ করা বাধ্যতামূলক ছিল। যারা প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের নাগরিকত্বের আবেদন নাকচ করা হয়েছে। ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেন (এনআরসি)র পক্ষ থেকে তালিকা প্রকাশের পর প্রক্রিয়ার নিয়মবিধি নিয়ে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে হিন্দু মুসলিম সংখ্যালঘু বাঙ্গালি সম্প্রদায়ের মধ্যে৷ বাঙালিরা অভিযোগ করেছে, এনআরসি তাদের দরকার মতো নিয়মবিধি পরিবর্তন করেছে৷

তাহলে আসামে বাঙালিদের ভবিষ্যৎ কি? আসামে ঘটমান বর্তমানে এই প্রশ্নটা মনে আসা স্বাভাবিক। কেন এতো বাঙালি বিদ্বেষ? বিদ্বেষের রহস্য সন্ধানে যেতে চাইলে আমাদের একটু অতীতে ঝাঁকি মারতে হবে। আসামে বাঙালি ভবিষ্যতের জমিতে বিদ্বেষের বীজ বপন করে দিয়েছিলেন রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদোলোই। তিনি স্পষ্ট বলতেন, ‘‘এখন আর বাঙালিরা ইচ্ছে করলেও অসমীয়ারদের উপর কোনো দখলদারি কায়েম করতে পারবে না৷ এখন থেকে অসমের সমস্ত দায়ভার অসমীয়াদের উপর বর্তাবে৷” স্বাধীনতার বছরেই তিনি বলেছিলেন, ‘‘বাঙালিরা এখন যদি এ রাজ্যে থাকতে চান, তাহলে থাকতে হবে অসমীয়াদের প্রভুত্ব স্বীকার করেই৷”

সেই ঘোষিত কর্মসূচির প্রতিফলন আজ আমরা দেখছি সমগ্র আসাম জুড়ে। আজকের তারিকে আসামে এলেই অসমীয়া ভাষায় শুনতে পাবেন- বাঙালির বাড়াবাড়ি বরদাস্ত করা হবে না। অখণ্ড গণতান্ত্রিক ভারতে প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্কের প্রসঙ্গ আসে কোথা থেকে এটুকু ভেবেই বিস্ময় লাগছে। বাঙালি, বোড়ো, কার্বি, মিশিং, রাভা, মাড় সবাই মিলে তো আসাম। মানছি আসামে অসমীয়ারা সংখ্যাগুরু আর সেই কারনেই কি সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার করাটা অধিকারের পর্যায়ে পড়ে? এটা এক কথায় আধিপত্যবাদ মানসিকতা ছাড়া অন্য কিছুই নয়। তাই আধিপত্যবাদকে প্রতিষ্ঠা দিতে নাগরিক পঞ্জি থেকে লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালির নাম কেটে বাদ দিতে হবে।মামদো বাজি। কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।

migrants1-680x365

এই আধিপত্যবাদকে ভাঙতে ও অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে রুখতে সমস্থ বাঙালিকে এক মঞ্চে দাঁড়াতে হবে। আজ কোন যুক্তিতে আসামে বসবাসকারী বাঙালিদের বিদেশি তকমা দেওয়া হচ্ছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ভারতের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মানুষ এলে তাদের কোন যুক্তিতে বিদেশি বলা যায়? আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগেও আসামে অনুরুপ পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। বলা হতো, বাঙালিদের কারনে আসামের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-জনবিন্যাস বিপন্ন হচ্ছে। তাই যদি হতো তাহলে ভুপেন হাজারিকা কি করে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছতে পারলো? তাহলে, বাঙালিরা অসমীয়া সংস্কৃতি গ্রাস করে নি।

আসলে, বাঙালিদের সম্পর্কে একটা অহেতুক আতঙ্ক অসমীয়াদের পেয়ে বসেছে আর এর থেকেই আধিপত্যবাদ মাথা চাড়া দিচ্ছে।যে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা বিদ্বেষের আগুনে ঘি দিচ্ছেন তাদের রাজনৈতিক উদ্দ্যেশ্য ভোট রাজনিতি। বিশেষ একটি গোষ্ঠীকে যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া যায়, তাহলে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে সুবিধা হবে। ভাগ বাটোয়ারা জমে ক্ষীর।

এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় বাঙালিদের এগিয়ে আসতে হবে। আসামে চাকরিজীবী বাঙালিদের সংখ্যা প্রছুর।কিন্তু তাঁরা চুপচাপ। ভাবছেন, প্রতিবাদ করা মানে সরকারবিরোধী কাজ।চাকরিতে বিপদ আসতে পারে। একদমই নয়, বরং প্রতিবাদ না করলে বিপদ বাড়তে পারে। বাংলা ভাষায় কথা বললে যে রাজ্যে বাংলাদেশি বিবেচনা করা হয় সেই রাজ্যে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে রুখে দাঁড়ানোই একমাত্র পথ।

আসাম থেকে বাঙালিদের তাড়ানোর জন্য কি সব হাস্যকর যুক্তির অবতারনা করা হচ্ছে।  বর্তমান রাজ্যপাল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে রিপোর্ট দিয়েছেন, প্রতিদিন ৬ হাজার করে বাংলাদেশি আসামে অনুপ্রবেশ করছে।কথার কথা হিসাবেও যদি ধরি তাহলে তো বাংলাদেশ অর্ধেকেরও বেশি খালি হয়ে যাওয়া উছিত।বাস্তবে কি তাই হয়েছে।

সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়িয়ে যারা ভারতের জাতীয় সংহতি বিপন্ন করতে চাইছেন তাদের চিনহিত করে শাস্তি বিধানের দরকার৷ যদি বাঁচতে হয় তাহলে গণতন্ত্রের স্বার্থে সব বাঙালিকে এই লড়াই লড়তে হবে৷ সংবিধানিক স্বীকৃতির পক্ষে জোড়াল আওয়াজ দরকার। অসমে ‘বাঙালি খেদাও’ অভিযানের বিরুদ্ধে সব বাঙালিকে এক মঞ্চে দাঁড়াতেই হবে।

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *