“আর কত রক্ত খাবি মা”…দেবাশীষ পাইন

images (1)NPR এর অর্থ হোল National Population Register এবং NRC: এর অর্থ হোল, National Register of Citizens, এই দুটি বিষয়কে সাধারণ মানুষের মধ্যে গুলিয়ে দিতে আমাদের রাজ্যে বিশেষ একটি রাজনৈতিক দল মাঠে নেমে পড়েছে।যার ফল হয়েছে মর্মান্তিক। বিভিন্ন জেলা থেকে আতঙ্কিত মানুষের আত্মহত্যার খবর আজ সংবাদের শিরোনামে।
এটা কোনো হটাৎ করে ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। বিভ্রান্তি তৈরি করার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার দুরভিসন্ধি। আসামের নাগরিকপঞ্জী প্রকাশিত হওয়ার পর বেশ বড় সংখ্যায় হিন্দু বাঙালির নাম বাদ পড়েছে।বলে রাখা ভালো, নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে মানে এই নয় যে, কালই তাদের ভারতবর্ষ থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হবে। তাঁরা আবার নাগরিকত্ব প্রমাণের সুযোগ পাবেন, বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুযোগ পাবেন। ভারতের সরকার ইতিমধ্যেই তার ব্যবস্থা করে রেখেছে। তাহলে এই বিভ্রান্তি তৈরি করার প্রচেষ্টা কেন? আর কেনই বা সাধারণ মানুষকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেওয়া?

কারণ আছে। ইতিমধ্যে বাংলায় বিগত লোকসভার নির্বাচনে বিজেপি ১৮ টা আসন দখল করার পর সেই বিশেষ রাজনৈতিক দলের কপালে বটের ঝুড়ি নেমেছে। তারা হিসাব কষে দেখেছে যে,হিন্দু ভোটারদের মধ্যে বিজেপি ছাড়া অন্য দলগুলির প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। ৪২ সে ৪২ পাবই এই ধরণের উদ্ধত আচরণের যোগ্য জবাব বঙ্গবাসী দিয়েছে। ফলে, ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে কী ফলাফল হবে; এই চিন্তায় দিদি বিনিদ্র রজনী যাপন করছেন। তাই হিন্দু ভোটারদের ভাগ করার ঘৃণ্য চক্রান্ত শুরু হয়ে গেছে।সেটা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় শুরু হয়েছে। বাংলাভাষী হিন্দু বাঙালির সঙ্গে অন্য প্রদেশ থেকে আগত, দু-তিন পুরুষ বাংলায় বাস করা, হিন্দিভাষী হিন্দুদের লড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে এই বাংলায়। তাতে নিরীহ অজ্ঞ মানুষের প্রান যায় যাক।কিন্তু রানীর জয় হোক।
এবার একটু বিষয়টাকে পরিষ্কার করে দেখা যাক।এখন গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে যা চলছে সেটা NPR (National Population Register) বা ভোটার লিস্টে নিজেদের নাম যাচাইয়ের কাজ।

কিন্তু, বেশিরভাগ মানুষই ভুল করে এই NPR কে গুলিয়ে ফেলছেন NRC এর সাথে। এবং এই গুলিয়ে দেওয়ার কাজে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে তৃণমূল কংগ্রেস। জেলায় জেলায় মিছিল- মিটিং করে মানুষের ভ্রান্ত ধারণাকে কাজে লাগিয়ে বিপথগামী করছে। আর সেই কারণেই তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে আশঙ্কা।তৈরি হচ্ছে আত্মহত্যার প্রবণতা।

এবার NPR ও NRC এর মধ্যে যে পার্থক্য আছে, সেটা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
ভারতবর্ষে NPR ২০১০ সালে তৈরি করা হয় এবং ২০১৫ সালে তা আপডেট করা হয়। এখনও চলছে সেই তথ্য সংগ্রহের কাজ। কেন্দ্রের তরফ থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয়েছে যে,আগামী ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ করা হবে।
আর NRC সর্বপ্রথম তৈরি হয় ১৯৫১ সালে আসামে। ২০১৩ সালে NRC আপডেটের কাজ সুপ্রিমকোর্টের পর্যবেক্ষণে শুরু হয় আসামে। ২০১৭সালে ৩১ শে ডিসেম্বর একটি আংশিক খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয় এবং ২০১৮সালের ৩০ জুলাই NRC-র সম্পূর্ণ ড্রাফট প্রকাশিত হয়।

2019-এর ৩১ আগস্ট চূড়ান্ত NRC তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর জানা যায় যে, আবেদনকারী ৩ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে।তালিকায় যে ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে তাঁরা মূলত,এ এবং বি;দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত নির্দিষ্ট তথ্য দিতে অপারগ থেকেছেন। তাই নাম বাদ গেছে।
এখন তৃনমূল, বাম ও কংগ্রেস এনআরসি রুখতে একজোট হয়েছে। সে হয় হোক, বাংলার মানুষ জানে তেলে আর জলে কখনো মিশ খায় না, সুযোগ পেলেই একে অপরকে কামড়াবে। হোলোও তাই, যেই দিদি মোদীজি- অমিতজির সঙ্গে দেখা করতে দিল্লি গেলেন কালবিলম্ব না করে দিদির বিরুদ্ধে দাঁত নখ বের করে দিল বাম ও কংগ্রেস। তাই এই সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের প্ররোচনামূলক প্রচারের কবলে পড়বেন না। জেনে রাখুন, আসামে যাদের নাম NRC তালিকাতে নেই,কোন অবস্থাতেই; না রাজ্য সরকার না কেন্দ্রীয় সরকার, তাদেরকে এখনই বিদেশি বলে আখ্যা দিতে রাজি হচ্ছে না।মানে, আতঙ্কিত হওয়ার কোন কারণই নেই। যাদের নাম নেই, তাদের আপাতত ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
আর দোহাই আপনাদের, দয়া করে NPR আর NRC-র মধ্যে ফারাকটা বুঝুন এবং অপরকে বোঝান।

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *