### আমরা- বাংলা-ভাগ-হতে-দেব-না ### সুজাত ভৌমিক মণ্ডল

downloadপশ্চিমবঙ্গের  সব স্কুলে বাংলা ভাষা পড়ানোর সিন্ধান্তের প্রতিবাদ থেকে আলাদা গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবিতে আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গোর্খা অধ্যুষিত দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি অঞ্চল।

জুন মাসে  দার্জিলিংয়ে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মধ্যে যে সংঘাত চলছিল তা মোর্চার ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু হওয়ার পর থেকে ক্রমশ চরমে পৌঁছেছে। রাজ্যের সরকারি ভাষা বাংলা ও ইংরেজি। তবে জাতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দির চলও আছে। দার্জিলিং জেলার তিনটি মহকুমায় সরকারি ভাষা হল নেপালি। ২০০১ খ্রিষ্টাব্দের জনগণনা অনুসারে, ভাষাগত জনসংখ্যার বৃহত্তম থেকে ক্ষুদ্রতম ক্রম অনুযায়ী ভাষাগুলি হল বাংলা, হিন্দি, সাঁওতালি, উর্দু, নেপালি ও ওড়িয়া। রাজ্যের কোনো কোনো অংশে রাজবংশী ও হো ভাষাও প্রচলিত।

রাজ্যের সব স্কুলে বাংলাকে বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে মে মাসের ১৫ তারিখ রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এক বিবৃতিতে বিষয়টি ‘স্পষ্টিকরণ করেছিলেন যে দার্জিলিংয়ের স্কুলগুলোতে বাংলা পঠনপাঠন ঐচ্ছিক হবে।

এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে মোর্চাপ্রধান বিমল গুরুং তার লুকানো তাসটি খেলে দিল। পাহাড় জুড়ে প্রচার করতে সমর্থ হল  ভাষার ভিত্তিতে পাহাড়ীদের  অস্তিত্ব মুছে ফেলার চক্রান্ত চলছে। অতএব আলাদা গোর্খাল্যান্ড চাই। কারণ দেশ জুড়ে নেপালি বা গোর্খা হিসাবে তাদের আলাদা পরিচিতি আছে।। অথচ খবরে প্রকাশ মুখ্যমন্ত্রি কখনই বাংলা ভাষা জোর করে তাদের ওপর চাপিয়ে দেননি। টানা এগারো দিন ধরে বিমল গুরুং এর নেতৃত্বে চলছে বনধ্। বহু অসুবিধার সম্মুখিন সাধারণ মানুষ। স্কুল কলেজ বন্ধ খাদ্য ভান্ডারে টান পরেছে আটকে পরেছে পর্যটকরাও।

অশান্তির সুত্রপাত – গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুংয়ের বাড়ি ও সংলগ্ন অফিসে পুলিশের তল্লাশি চালানোর প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে দার্জিলিং। বলা বাহুল্য উদ্ধার হয় ব্যাগ ভর্তি টাকা ও  আধুনিক অস্ত্র। গুরুং আত্মগোপন করে হুমকি দিতে থাকে।

মোর্চা সমর্থকদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে কালিম্পং ও কার্শিয়াংয়েও। মোর্চা সমর্থকেরা আগুন ধরায় পুলিশ ফাঁড়িতে। ঘেরাও করে রাখা হয় পুলিশকর্মীদের। বিভিন্ন জায়গায় চলে রাস্তা অবরোধ। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে।এতে মোর্চার কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা যায়।

যতক্ষণ পর্যন্ত না সরকার আমাদের দাবি মেনে নেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ধর্মঘট চলবে”বলছেন, মোর্চার সাধারণ সম্পাদক রোশন গিরি।পাশপাশি তিনি পর্যটকদের প্রতি রাজ্যের এই অঞ্চলগুলোতে ভ্রমণ পরিকল্পনা না করার আহ্বান জানান।

একশো বছরের বেশি সময় ধরে ভারতে বসবাসকারী গোর্খা জনসংখ্যা ৫০ লাখের কাছাকাছি।

দার্জিলিং ও আশপাশের এলাকার এই নেপালি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক রাজ্যের দাবিতে কয়েক দশক ধরে আন্দোলন করে আসছে। রোশন ব্রাম্ভন  থেকে শুরু করে সুভাষ ঘিসিং এবং এখন গুরুং। কিন্তু দেখা গেছে সব ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত স্বার্থটাই এদের আসল উদ্দেশ্য।

darjeeling-75918

“গোর্খাদের একটি পৃথক রাজ্যই একমাত্র সমাধান। ভারতবর্ষে বসবাসকারী সব গোর্খাদের দাবি এটি। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবার জন্য কেন্দ্রিয় সরকারকেও আমরা লিখিতভাবে জানিয়েছি,” বলেন রোশন গিরি। তিনি বলেন, গোর্খা জনগোষ্ঠী পশ্চিমবঙ্গের লোকজন থেকে জাতিগত, ভাষাগত ও সংস্কৃতিগতভাবে সম্পূর্ণ আলাদা, এই প্রেক্ষাপটেই আমরা পৃথক রাজ্যের দাবি জানাচ্ছি।

এর পরই বিজেপির রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাথে রোশন গিরির গোপন বৈঠক  হয়। কেন্দ্র সরকাল  বাংলা বিভাজন করে গোর্খাল্যান্ডে বানানোর  সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছেন না, যদিও বিজেপির রাজ্য সভাপতি ও দার্জিলিঙয়ের সাংসদ প্রথমে বিষয়টি তোল্লা দিচ্ছিলেন।  বামপন্থীরা বলছে পাহাড়ীরা বঞ্চিত কিন্তু চৌত্রিশ বছর  ধরে কেন বামফন্ট তাদের বঞ্চিত করে রেখেছিল সে উওর তারা দিচ্ছেন না। তবে গোর্খাদের আলাদা রাজ্যের দাবির বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ  সরকারের অবস্থান হচ্ছে ‘প্রশ্নই ওঠে না’ জাতীয়।“আমরা দার্জিলিংয়ের সমস্যা সমাধানের জন্য সম্ভাব্য সব পদক্ষেপই নিচ্ছি। কিন্তু দার্জিলিং পশ্চিমবঙ্গের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, আমরা এর এক ইঞ্চি পরিমাণও ভাগ হতে দেবো না।” বলেন রাজ্য পর্যটন মন্ত্রী গৌতম দেব।

এই আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে,কিন্তু তারপরও গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনকারিদের  বক্তব্য হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্নতা জরুরি।

আচ্ছা, আর একটা প্রশ্ন জাগছে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন নিয়ে। সুভাষ ঘিসিং ও তো স্বতন্ত্র গোর্খাল্যান্ড দাবী নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন। পরে পার্বত্য পরিষদের দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে সে দাবী থেকে সরে এসেছিলেন। তার পর সেই পার্বত্য পরিষদের কান্ডকারখান তো সাবারই জানা। আসলে জনহিত নয় , কিছু মানুষের ব্যক্তিগত উচ্চাকঙ্খা পুরন করাতেই আলাদ রাজ্য গঠনের আন্দোলন গুলির উদ্ভব। পশ্চিমবঙ্গের মূলধারার কোনো রাজনৈতিক দলই চায় না দার্জিলিং  আলাদা হয়ে যাক।

সাধারণ মানুষের বেশির ভাগই গোর্খাল্যান্ডের বিরোধী। জাতীয় কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, বামদল, বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্ব কেউই পশ্চিমবঙ্গকে ভেঙে দার্জিলিংকে আলাদা রাজ্যের মর্যাদা দিতে চায় না। পশ্চিমবঙ্গের একটি ছোট জেলা দার্জিলিং। মাত্র ৪টি মহকুমা নিয়ে এ জেলা গঠিত। তার মধ্যে শিলিগুড়ি মহকমুা প্রায় সমতল। এ মহকুমার বেশির ভাগ মানুষ বাঙালি। শিলিগুড়ির বাঙালিরা গোর্খাল্যান্ডের বিরোধি। তারা বাঙালিদের সংগঠন ‘আমরা বাঙালি ও বাংলা ভাষা বাঁচাও কমিটির’ মাধ্যমে শিলিগুড়িতে গোর্খাল্যান্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছে। পাহাড়িদের পৃথক রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবির মধ্যে অনেকেই তেমন যুক্তি দেখেন না। অপরদিকে রাজ্যের বিপক্ষে যত যুক্তিই থাক গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা অনড়।

২০০৭ সাল থেকে বিমল গুরুং  নতুন করে গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশিচমবঙ্গের ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতায় এসেই তিনি দার্জিলিং সমস্যার সমাধানের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এ লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গ  সরকার গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে এক ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির আলোকে গঠন করা হয় স্বশাসিত জিটিএ বা গোর্খাল্যান্ড টেরিটরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুংকে জিটিএর প্রধান করা হয়। সেই থেকে দার্জিলিংয়ের পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত ছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনের ঘোষণায় দার্জিলিংয়ের পরিস্থিতিকে আবার উত্তপ্ত করে তোলে। পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবিতে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা আবার রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করে।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, রাজ্য সরকার কখনও দার্জিলিংকে পৃথক, রাজ্যের মর্যাদা দেবে না। তিনি আরো বলেন, দার্জিলিং পশ্চিমবঙ্গের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। অপরদিকে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চাও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তারা পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবি থেকে একপাও পিছু হটবে না। তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। ফলে এ ইস্যুতে রাজ্য সরকার ও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার মধ্যে তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। আন্দোলন দমাতে রাজ্য সরকার ইতোমধ্যে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে। কিন্তু দমনপীড়ন কিংবা ধরপাকড় করে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে না বলে বিশ্লেষকদের মধ্যে অনেকেরই অভিমত। তারা মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের উচিত গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সাথে আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা। নইলে হয়তো এক সময় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে যা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বিপন্ন করে তুলতে পারে।

আলাদা রাজ্য হওয়ার বেসিসটা কি? শুধু উন্নয়ন? নাকি ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র? নাকি ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধি।তবে মজার কথা আলাদা গোর্খাল্যান্ডের দাবীর পক্ষে সুইপিং সাপোর্ট পাহাড়ে নেই। বাংলা আমাদের রাজ্য- বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, কোন খুনি নেতার স্বার্থে বাংলা ভাগ হবেনা।

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

সুজাতা ভৌমিক মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *