অখন্ড ভারতের সমর্থক, স্বাধীনতা সংগ্রামী ও মহান আত্মা- মৌলানা আবুল কালাম আজাদের আজ জন্মদিন। লিখেছেন, দেবাশীষ পাইন

maulana-abul-kalam-azad-5মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ছিলেন একাধারে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, কবি, দার্শনিক ও শিক্ষা-সংস্কারক। ১৯২৩ সালে মাত্র ৩৫ বছরে তিনি নিখিল ভারত কংগ্রেসের কনিষ্ঠতম সভাপতি নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্রান্তিকালীন সময়ে ১৯৩৯-৪৬ সাল পর্যন্ত নিখিল ভারত কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।  চিরন্তন অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী মৌলানা আজাদ আমৃত্যু হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। মোহাম্মদ আলী জিন্না প্রস্তাবিত দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ভারত-ভাগকে তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। তিনি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছেন ভারত-ভাগ ঠেকানোর। কারন, তিনি বিশ্বাস করতেন এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানরাই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাঁরা উপমহাদেশের বিভিন্ন অংশে বিভাজিত হয়ে আরো সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে, সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র দুইটিতে বজায় থাকবে চিরকালীন অশান্তি, উভয় দেশেই বার্ষিক বাজেটের উন্নয়ন বরাদ্দ কমে গিয়ে সামরিক বরাদ্দ বাড়বে যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ জনগণ। ভারত-ভাগের এত বছর পরে, তাঁর আশঙ্কাই অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে। এতটাই দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ ছিলেন তিনি।

মৌলানা আজাদ ১৮৮৮ সালে মক্কায় এক সম্ভ্রান্ত রক্ষনশীল মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন।পিতা মৌলানা মৌলানা খয়রুদ্দিন সেকালে আরব, পারস্য ও ভারতবর্ষে প্রভাবশালী ধর্মগুরু ছিলেন। রক্ষণশীল পরিবারের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও মৌলানা আজাদের মন মুক্তির আশায় ছটফট করত।পারিবারিক কক্ষপথ ছেড়ে সত্যের সন্ধানে নিজস্ব পথে বেরিয়ে পড়েন মৌলানা আজাদ। মুসলমানদের নানা গোষ্ঠীর মধ্যকার প্রভেদ তাকে ফাঁপরে ফেলে দিত। আজাদ বলতেন-‘সকলেরই উৎসস্থল এক; তাহলে কেন তারা একে অন্যের পরিপন্থী? সেটা আমার ঢুকতো না। যেভাবে চোখ বুঝে কোনোরকমে ভাবনা চিন্তা করে এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে ভ্রান্ত আর অবিশ্বাসী বলে দাগিয়ে দিত, তার সঙ্গে আমি নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না। গোঁড়া ধর্মবিশ্বাসীদের এই ভেদবুদ্ধি ক্রমশ ধর্ম জিনিসটার ওপরই আমার মনে সন্দেহ ধরাতে থাকে। ধর্ম যদি বিশ্বজনীন প্রকাশ হয়, তাহলে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এত কেন চুলোচুলি আর ঠোকাঠুকি? প্রত্যেকটি ধর্মই বা কেন নিজেকে সত্যের একমাত্র আধার বলে দাবি করবে এবং কেনই বা অন্য সব ধর্মকে নস্যাৎ করবে?…… এই সময় নাগাদ আমি ‘আজাদ’ বা ‘মুক্ত’ এই ছদ্মনাম গ্রহনের সিদ্ধান্ত নিই। এই নামের সাহায্যে আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম যে আমি আর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বিশ্বাসের বন্ধনে আবদ্ধ নই।”

১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বৃটিশরাজের শাসন সুবিধার্থে বঙ্গভঙ্গ করলে বাংলায় চরম বিক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। এ সময় মৌলানা আজাদ বিপ্লবী শ্রী অরবিন্দ ঘোষ ও শ্রী শ্যামসুন্দর চক্রবর্তীর সংস্পর্শে আসেন এবং বিপ্লবীদের দলে নাম লেখান। বিপ্লবীদলগুলোকে মৌলানা আজাদ একক প্রচেষ্টায় বাংলা তথা সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দেন। দেশব্যাপী জনমত গড়ে তোলার উদ্দ্যেশে তিনি ১৯১২ সালের জুনে ‘আল-হিলাল’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। “উর্দু সাংবাদিকতার ইতিহাসে ‘আল-হিলাল’ প্রকাশ এক যুগান্তকারী ঘটনা। অল্প সময়ের মধ্যে এই কাগজ অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা লাভ করল।

১৯২০ সালে মৌলানা আজাদ তুরস্কের খেলাফত ও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে ভারতীয় মুসলমানদের উদ্বেগকে সামনে রেখে তাদেরকে সংগঠিত করেন, গড়ে তোলেন খেলাফত আন্দোলন। গান্ধীজী, লোকমান্য তিলকসহ কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতারা খেলাফত প্রশ্নে ভারতীয় মুসলমানদের মনোভাব সমর্থন করেন। ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বরে কলকাতায় কংগ্রেসের অধিবেশনে গান্ধীজী স্বরাজলাভ এবং খেলাফত সমস্যার সন্তোষজনক মীমাংসার জন্য অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচী গ্রহন করেন। এই সময় গান্ধীজী এবং মৌলানা আজাদ সারা ভারতবর্ষে ব্যপকভাবে সফর করে অসহযোগ আন্দোলনের জন্য জনসমর্থন আদায় করেন। ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় নাগপুরে এবং এই অধিবেশনেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চূড়ান্তভাবে কংগ্রেস ত্যাগ করেন।

১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে, ভারতীয় রাজনীতি নতুন দিকে মোড় নেয়। ভারতের অবস্থান কি হবে গান্ধীজী গভীরভাবে এ বিষয়ে ভেবে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির কাছে প্রস্তাব করেন যে,…..আসন্ন যুদ্ধে ভারত কোনোক্রমেই যোগ দেবে না, এমনকি তা যদি ভারত স্বাধীনতা লাভ করে, তাহলেও নয়-এই ছিল গান্ধীর মত”। জওহরলাল নেহুরু ও মৌলানা আজাদ ভিন্নমত প্রকাশ করেন। ইউরোপ ও আমেরিকার গণতান্ত্রীক রাষ্ট্রগুলো আক্রান্ত হওয়ায় মৌলানা আজাদ ভারতের স্বাধীনতাপ্রাপ্তী সাপেক্ষে নাৎসীবাদ ও ফ্যাসীবাদ শক্তির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রীক শক্তির পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহনের প্রস্তাব করেন।

মৌলানা আজাদ ভারত-ভাগ ঠেকানোর জন্য প্রানপন লড়াই করেছিলেন এবং শেষ চেষ্টা হিসেবে গান্ধীজীর শরনাপন্ন হয়ে বলেন, “আমি আগে এবং এখনও দেশভাগের বিরুদ্ধে। বরং দেশভাগের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান আগের চেয়েও কড়া।…এখন আপনিই আমার একমাত্র ভরসা। আপনি যদি দেশভাগের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, এখনও আমাদের শেষ রক্ষার আশা আছে। তবে আপনি যদি চুপ করে থাকেন তো আমার ভয়, ভারতের ভরাডুবি হবে”। গান্ধীজী প্রতিউত্তরে বলেন, দেশভাগ হলে আমার মৃতদেহের উপর দিয়ে হবে। কিন্তু প্যাটেল ও নেহুরু বুঝিয়ে সুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষে নিয়ে আসেন। মৌলানা আজাদ গভীর দুঃখ নিয়ে বলেন, “প্যাটেলকে আজ জিন্নার চেয়েও দ্বিজাতিতত্ত্বের বড় সমর্থক হতে দেখে আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম। দেশ ভাগের পতাকা জিন্না তুলে থাকলেও তার প্রকৃত পতাকাবাহক এখন প্যাটেল”।

১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট ভারতবর্ষ ভাগ যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারতের জন্ম হয়। মৌলানা আজাদ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলেও, তাঁর দেশপ্রেম ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁকে বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট মতামত, তাঁর সততা ও সাহসকে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ হৃদয়ের মনিকোঠায় সযত্নে লালন করছে।

দেবাশীষ পাইন

দেবাশীষ পাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *