সাগরমাথাঃতব চরণে নত মাথা(অন্তিম পর্ব), পার্থ ঘোষ

IMG_20180517_121358কালাপাত্থার এর উপর দাঁড়িয়ে মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখছি পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টকে  আমাদের পরমপ্রিয় ‘সাগরমাথা’কে। বস্তুত কাটেংগা আর আমডাবালাম হল শেরপাদের কাছে সবচেয়ে শ্রদ্ধার পাহাড়।আর লোৎসে – এভারেস্ট -নোৎসে হল অনেকটা হিন্দু পুরাণের ব্রহ্মা -বিষ্ণু – মহেশ্বরের প্রতিরূপ বিশেষ।এভারেস্টকে সবচেয়ে ভালো দেখা যায় এই কালাপাত্থার থেকেই।
বাইরের তাপমাত্রা শূন্যের দশ ডিগ্রী নীচে। তীরের ফলার মত বাতাস ফালাফালা করে দিতে চাইছে সব পেশীতন্তু আর সন্ধি-গ্রন্থিগুলোকে। তারই মাঝে স্পষ্ট দেখা দিতে রাজি গিরিরাজ এভারেস্ট(পিক ফিফটিন,যাকে আমরা অবশ্যই ‘রাধাচূড়া’বলবো।রাধানাথ শিকদারের উত্তরপুরুষ হিসেবে,বাঙালী হিসেবে, এটুকু অধিকার বোধ থাকবে না?)আচমকা দেখা পেয়ে স্বগতোক্তির মত উচ্চারিত হবেই ‘still mountain holds the master card’. চলন্তিকা মেঘের ভেলার ফাঁক দিয়ে টুকি করেই “প্রাণের প’রে চলে গেল  সে”। সোনালী রঙের ছটায় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে।সবচেয়ে আশ্চর্য লাগছে এই ভেবে যে কেউ এখানে ব্যক্তিগত ভাবে চেনেনা।তাই অহেতুক অযাচিত কৌতুহলে জানতে চাইবে না কুশল সংবাদ।অশ্লীল বিদ্রুপের শ্লেষ ছুঁড়ে বলবে না,আমি বা আমরা গর্বিত, তোমার কালাপাত্থার দেখে আসার জন্য।কখনো কখনো মেকি সম্বর্ধনাও যে কি কদর্য কুৎসিত লাগে,সেটা যদি তথাকথিত শুভাকাঙ্ক্ষীরা বুঝত?যারা প্রকৃত পাহাড় ভালোবাসে, পাহাড়ে চড়তে ভালোবাসে তারা আর যাই হোক প্রকৃত বন্ধুর সাফল্যে ‘গর্বিত’ হয় না।কখনো কখনো মনে হয় এডমন্ট হিলারি সেদিন ঠিকই বলেছিলেন “আসলে পাহাড় নয়,আমরা নিজেদের জয় করতে পাহাড়ে আসি বার বার।” শৃঙ্গ জয়ের আগে ও পরে আত্মজয়টা খুব জরুরী। সেদিন হিমালয়ই দেখিয়ে দিল সেটা। যেখানে আবির গুলালে রাঙা পর্বতশীর্ষের রূপ দেখে শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলার কথাও মনে পড়ে যায়, আবার রাগী রোদ্দুরে তেতে পুড়ে এসে মায়ের আঁচলে মুখের ঘাম মোছার স্মৃতিও মনে পড়ে যায়।শরীরে জ্বালা থাকলে,জ্বলে যাওয়া প্রত্যঙ্গে ছ্যাঁকা লাগার দগদগে যন্ত্রণা নিয়ে ধন্বন্তরি পাহাড় চূড়ার কাছে গেলে, ফোস্কা পড়া বুকে তীব্র দহন আর জ্বলন নিয়ে গেলেও একাধারে মাতা ও পরম পিতা সাগরমাথার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতেই যেন গোটা শরীরে মনে হিমশীতল চন্দনের প্রলেপ লাগে। এ শৈত্য বায়ুমণ্ডলীয় নয়।অবশ্যই স্বর্গীয়।অপার্থিব।কখনো বা মনে হয় প্রবল জ্বরের ঘোরে কপালে দিদিমার হাত বুলিয়ে দেওয়া ঠাণ্ডা জলপটির আরাম – এত শান্তি,পাহাড়ে অবগাহনে থাকে, তা আগে কেন জানতাম না ! তাই সেই দেবভূমিতে বেশি সংখ্যক দ্বিপদী জীবের দেখা না পেয়ে, উচ্চকিত বাহবা না পেয়ে, মন খুশিতে ভরে উঠলো।

নেপাল হিমালয়ের এ অংশে পথে প্রান্তরে, উপত্যকা থেকে উপত্যকায় সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে মুক্তির আনন্দ।তপস্বী হিমালয়ের সৌন্দর্যধ্যানই একমাত্র বোধ এবং বোধিকে জাগ্রত করে রাখে।মগ্ন হিল ময়নার ডাক, রডোডেনড্রনের উল্লসিত অভ্যর্থনা, শান্ত বিচ্ছিন্ন গ্রাম,মন্দির,গুম্ফা, প্রেয়ার ফ্ল্যাগ এমনি এমনিই দুলিয়ে দিয়ে চলে যায়।দম দিয়ে যায় পায়ের পাতায়,পাঁজরার ফাঁকে থাকা হৃদযন্ত্রে।সামনেই “সাগরমাথা”র চরণতল…..সামালকে ভাই। ১৮,০২৩ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছে যাওয়া ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। এ যেন এক বিশাল জনপদ।শ’য়ে শ’য়ে তাঁবু,ও স্যাটেলাইট স্টেশন।তবে সবচেয়ে মজার কথা হল বেস ক্যাম্প থেকে কিন্তু এভারেস্টকে দেখা যায় না।পথে পড়েছিল নাপৎসে আইস ফল হিমপ্রপাত।অসংখ্য আইস কনিকল্ মাটি থেকে গাছের মত মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এদিকে ওদিকে।হঠাৎ বেস ক্যাম্পে পৌঁছে মনে হয়,এও যেন এক প্রতিপদ যোগ,যেন সকলে কুম্ভমেলায় এসেছে,স্নান করতে।এ যেন এক মানুষ-পাহাড় আর প্রকৃতির প্রয়াগ। ভাবছিলাম,এক শেরপাকে সঙ্গী করে নিউজিল্যান্ডের এক মৌমাছি প্রতিপালক পাহাড়িয়া মানুষ এডমন্ট হিলারি যে শৃঙ্গটিকে জয় করতে জীবনপণ করেন।সেই শৃঙ্গ আমাদের মুঠোর মধ্যে,এটা ভাবলেই দেহহীন একটা অনুভূতি হয়।কান্না-উল্লাস-আক্ষেপ-বিষাদ-হর্ষ-ভয়ের একটা গোল্লা গোল্লা অনুভূতি বুক আর গলার ঠিক মাঝখানটায় ধাক্কা মারে।গুপ করে গিলে ফেলতে না ফেলতেই আবার ধাক্কা।এবার চৈতন্যে।”এ কি দেখিলাম!জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না।”যেহেতু এভারেস্ট বেস ক্যাম্প থেকে এভারেস্ট চূড়াকে দেখা যায় না,তাও পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু সৃষ্টির চরণতলে বসে নিজের বামনত্বকেও সার্থক বলে মনে হয়।চিরদিন তোমার কাছে এমন ছোটোই  যেন থাকতে পারি রাজাধিরাজ  এভারেস্ট। বিধ্বস্ত ধমনীতে খালি স্বর্গীয় আকাশরেণুর লাফালাফি।ঝিকিমিকি  আলোর বিদ্যুৎ লীলা।লজ্জা পেলে বোধহয় এমনই হয়।সর্বগ্রাসী দেখার খিদে নিয়ে,ভালোলাগার উত্তেজনা নিয়ে, এমন মুহুর্ত অন্তত আমাদের জীবনে বারবার আসেনা,একথা হলফ করে বলা যায়। সমস্ত মানস স্মৃতিকোষ মন্থন করেও উপযুক্ত অনুভুতি ভাষায় ফুটিয়ে তোলা যাবেনা।এ চিত্রকথা ও নিসর্গের বহুমাত্রিক সৌন্দর্য আক্ষরিক অর্থেই বর্ণনাতীত।এ সৌন্দর্যের মধ্যে একটা মহান গম্ভীর ভাব আছে,তা শুধুই প্রাণ দিয়েই অনুভব করা যায়।হিমালয়ের অসমান দীঘল শৃঙ্গ টি আকাশ ছোঁয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। জটাধারী নগাধিরাজের বিরাট মূর্তি মনের ভিতর এক অপার্থিব ভাব আনে।জীবন মৃত্যু তুচ্ছ মনে হয়।সে বহুর মধ্যে ব্যাপ্ত,সমগ্রতার গৌরব। তার মাহাত্ম্য ও মহিমা উপলব্ধি করা যায় কেবল বোধে,প্রেমে,ধ্যানে ও দর্শনে। নক্ষত্রের মত নিত্যদীপ বিভাসিত অনির্বচনীয়।এ যে আমার ভারতমাতার নির্মাতা।সৃষ্টি কর্তা তোমায় প্রণাম।

১৮৪৯-৫০ খ্রিস্টাব্দের কথা।নিকলসন বলে এক ইংরেজ জরিপকারী দলের অফিসার হিমালয়ের উঁচু শৃঙ্গ দেখে নাম দেন পিক ফিফটিন।তখন অবশ্য তাঁরা জানতেন না,এটিই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।১৮৫২ তে দেরাদুনের সার্ভে অফিস ঘোষনা করে পিক ফিফিটিনই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার সার্ভেয়ার জেনারেল স্যার জর্জ এভারেস্টের নামানুসারে এটির নাম রাখা হয় মাউন্ট এভারেস্ট।এটা ১৮৫৬ র ঘটনা।একশো বছর পরে উচ্চতা মাপতে গিয়ে ধরা পরে এভারেস্টের প্রকৃত উচ্চতা ২৯,০২৮ ফুট।তিব্বতি রা এটাকে ‘চোমোলুংমা'(জগজ্জননী) বলে পুজো করতো।

IMG-20180517-WA0077নেমে এলাম গোরখশেপে(১৮,৫০০ ফুট)।ছোট জনপদ।সেখান থেকে ফেরার পথ ধরা।নামার পথেও হিমালয় আমাদের পথের দু পাশে।নির্মল ও নীল আকাশ যেন সুবর্ণবৎ হিমশৃঙ্গগুলিকে গাঢ় আলিঙ্গনের জন্য মেঘাবরণ থেকে বিশাল বক্ষঃস্থল উন্মুক্ত করে পর্বতাঙ্গে ঢলে ঢলে পড়েছে।নামতে নামতেই চোখে পড়ছে সবুজ মখমল বিছোনো খেত।ছোট ছোট চাষীদের ঘরকন্না আর দেবস্থান।রিক্ত আভরণহীন দিগম্বরের সর্বত্রগামিতার মত বিস্ময়কর অপরিমিত সৌন্দর্য দু বাহু বাড়িয়ে দিয়েছে।বলছে এই প্রসারিত বাহুর মধ্যে উন্মুক্ত বক্ষের ভেতরেও একটা বুক আছে।যদি অন্তর দিয়ে তার অবস্থান চিনে উঠতে পারো,আবার এসো,যতটা আলিঙ্গন ধরে সব তোমাকে দিলাম।শ্রুতি স্মৃতি দিয়েই নয় পাহাড়কে বুঝতে পাহাড়-চাপা বুক লাগে।এসো কোনোদিন,শোনাবো সেই গল্প,দেখাবো সেই অতুল ঐশ্বর্য।

শতদল পদ্মের দিকে যেমন মধুকর অমোঘটানে ছুটে যায়,তেমন করে যুগে যুগে মানুষ এর টানে ছুটে গেছে।সব হারিয়ে হাহাকার করেছে অথবা সব পেয়েও হাহাকার করেছে।বৈশাখের মেঘের মতই নিরুদ্দেশ যাত্রা ছিল জবলপুর মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন এর।

এ যাত্রায় আর বলা হলনা ২০১৫ র ভূমিকম্পে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ফেরেচি গ্রামের কথা।সেখানকার মানুষদের আতিথেয়তার কথা,প্রবাদ প্রতিম পর্বতারোহী হিলারি প্রতিষ্ঠিত কুঞ্জুম গ্রামের কথা।কুঞ্জুমের অবিশ্বাস্য উন্নতির কথা।সেখানকার মানুষদের সামাজিক জীবনের কথা।এছাড়া আসা যাওয়ার পথে দেখা হওয়া অসংখ্য পথচলতি শিশু,কিশোর-কিশোরী,যুবক- যুবতী,বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের টুকরো হাসি ছুঁড়ে দিয়ে কুশল বিনিময়ের কথা।সেসব না হয়  এবারের গল্পে নাই বা বললাম!ভাগ্যিস তারা বাংলায় বলতে শেখেনি আপনার আগমনে আমরা গর্বিত!গর্ব করার মত যদি কিছু থেকে থাকে সেটা না হয় আমাদের মস্তিষ্কের ডার্করুমে থাকুক।ইচ্ছে মত তাকে ডেভলপ করবো,এনলার্জ করবো,প্রিন্ট করাবো,প্রদর্শিত হবে আমাদের দেখার সীমাবদ্ধতা,চোখের পক্ষপাতিত্ব,প্রকাশের অক্ষমতা।সে গল্প শুনবে সেকালের লোকেরা,একালের লোকেদের মুখ থেকে।

PARTHO GHOSH

PARTHO GHOSH

 

 

 

 

 

অনুলিখনঃ অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *