সাগরমাথাঃতব চরণে নত মাথা (দ্বিতীয় পর্ব), পার্থ ঘোষ

IMG-20180513-WA0074বিখ্যাত শেরপা গ্রাম নামচে বাজার থেকে রওয়ানা হলাম তিয়াংগুচের  উদ্দেশ্যে।খানিক এগোতেই এসে পড়লাম প্রকৃতির এক সুন্দর আঙিনায়।পথের ধারে ধারে ঢালু পাহাড়ি বাঁকের মাঝে মাঝে অজস্র ফুল ফুটে রয়েছে।তাদের মধ্যে একমাত্র রোডোডেনড্রন ফুলটাই চেনা।বাকি কোনো ফুলেরই নাম জানিনা।আমি বড়জোর আশপাশের শিস্ট,ফিলাইট শিলাগুলোকে চিনি।কিন্তু একসঙ্গে এত অচেনা ফুল! এই রকম পথের ধারে ফুটে আছে?অদ্ভুত একটা আনন্দ হল।অচেনার আনন্দ। অচেনার আনন্দ এত বেশি হয়,সেটা জানা ছিল না। না আছে চেনা ডাক,না আছে মেকি করমর্দন,না আছে সৌজন্যসুলভ পিঠচাপড়ানি।এমনকি একবুক কষ্ট চেপে আমি গর্বিত,আমরা গর্বিত বলার মত কেউ নেই। এই বয়সে পৌছে ভাবি,সত্যিই কি আমার সাফল্যে গর্বিত হওয়ার মত কাউকে চিনি?চেনা – অচেনার ধন্দ আমার সেদিনও ছিল,আজও রয়েই গেল। দুধকোশী নদীর উপর ঝুলন্ত ব্রিজ পার হয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে পায়ে চলা রাস্তা চলে গেছে  তিয়াংগুচে(Tianguche,১২,৭৬১ ফুট)র দিকে।পথে প্রচুর ‘চোরটেন'(তিব্বতী ভাষায় দেবতা বা প্রিয়জনকে উদ্দেশ্য করে লেখা পাথরের ছোট স্তূপের উপরে পতাকা লাগানো সৌধ বিশেষ)চোখে পড়লো।শেরপারা সর্বদা চোরটেনকে ডানদিকে রেখে বাঁদিক দিয়ে পথ চলে।এভাবে একবার যাতায়াত করলে তাদের একবার ‘চোরটেন’পরিক্রমা হয়ে যায়।দূর থেকে একটা ছবির মত ছোট্ট গ্রাম চোখে পড়লো।নামটাও খুব সুন্দর, ‘ফুংকি’।চারিদিকে রোডোডেনড্রনের ছড়াছড়ি।নামচেবাজার ছাড়ার একটু পর থেকেই দিগন্তে দেখা দিয়েছে ‘আমা ডাবালাম’ শৃঙ্গ। তিয়াংগুচে,যেন সবুজ গালিচা পাতা এক প্রান্তর।সামনে পরপর পর্বতশৃঙ্গ দেখা যাচ্ছে।দেখতে পাচ্ছি

IMG-20180517-WA0090

তাবোচে(২১,৪৬৩ফুট),নাপুৎসে(২৫,৮৫০ফুট),লোৎসে(২৭,৮৯১ফুট),আমদাবালাম্(২২,৪৯৪ফুট),কাটেংগা(২২,৩৪০ফুট),থামসেরকু(২১,৭৩০ফুট),খুম্বিলা(১৯,৩৩০ফুট)শৃঙ্গ গুলোকে।তিয়াংগুচে কে বেষ্টন করে আছে দুধকোশী ও ইসজাখোলা নদী।এর পরেই এসে পৌঁছলাম ফাংগুচে(Phanguche,১৩,০৭৫ফুট)তে।এখানের মনাস্ট্রিতে ৪০০বছরের পুরোনো ইয়েতির হাতের পাঞ্জা ও মাথার খুলি সংরক্ষিত আছে। আকাশ থেকে চিনির দানার মত বরফের কুচির ঝরে পড়া দেখতে দেখতে, অপার্থিব রহস্যময় আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে অনুপম স্নিগ্ধ সৌন্দর্য অবলোকন করাতেও যে পুন্য সঞ্চয় হয়,সেটা এখানে না এলে বোঝা যায় না। লালমোহন বাবু অর্থাৎ জটায়ুর ভাষায় “স্তব্ধবাক-রুদ্ধশ্বাস-বিমূঢ়-বিস্ময়”।সামনে দাঁড়িয়ে দেখলে অতীতের সব অসাফল্য ভুলে যেতে হয়। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত আমদাবালাম এ পা রাখা।পা নয়,প্রণতি জানানো। সমুদ্রসমতল থেকে ১৫,০১৩ ফুট উচ্চতায় অসীম আকাশতলে এ কোন রাজাধিরাজ দরবার বসিয়েছে ! সভাকক্ষ ঘিরে একের পর এক উঁচু উঁচু পর্বতশীর্ষ। সাদার এত বৈচিত্র হয় ? কি তীব্র মুখর স্তব্ধতা ! কানে শোনা যায় না,কিন্তু মন বলে কোথাও যেন মহাকালের ঘন্টা,শঙ্খ, কাঁসর সব একসঙ্গে বেজে চলেছে।হিমালয় পথে প্রান্তরে এমন অপার্থিব রূপ উন্মোচন করে রেখে দিয়েছে,কেবল আমাদের জন্য?

প্রযুক্তির উন্নতি ঘটেছে,অভিযানেও অনেক নতুন সাজ সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে।তবুও পাহাড়কে বাগ মানানো কি এতই সহজ ? এত নতুনত্বের মাঝেও হিমালয় এত বিশাল যে, কিছু পুরাতনী সৌন্দর্য স্রোত আজ ও বয়ে চলেছে তার বহিরঙ্গ দিয়ে। সে স্রোতে অবগাহন করতে হলে অন্তরঙ্গ হতে হয়। কখনো তীব্র নীল,কখনো ঘষা কাচের মত ঘোলাটে আকাশ, কখনো বা মুক্তোস্বচ্ছ সাদা মেঘের আনাগোনা দেখতে দেখতে এগোনো।এবারের গন্তব্য কালাপাত্থার। পথে দিংগুচে,লোবুচে (১৬,১৭৫ফুট)পড়ে।সেগুলোকে বুড়ি ছোঁয়া ছুঁয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় সমুদ্রসমতল থেকে ১৮,৩০৭ ফুট উচ্চতায় কালাপাত্থারে।নাপুৎসে বা নপুৎসে পর্বতের পাদদেশে গোরকশেপ(১৭,৩০০ফুট)।এর সামনেই কালাপাত্থার।১৮,০০০ ফুটের বেশি উঁচু একটা পর্বতের মাথায় বরফ পড়ে না।অথচ তার চতুর্দিকে বরফে ঢাকা একাধিক পর্বত শৃঙ্গ।এর চূড়ার রঙ ও তাই গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা পর্বত শৃঙ্গগুলোর মত সাদা নয়।কালচে।তাই এর নাম কালাপাত্থার।বিশাল প্রান্তর।প্রান্তরের মাঝে আর একটা চূড়া।প্রায় ৫০০ফুট উঁচু।নিচে গোরখশেপ,সামনে আরও উঁচু উঁচু পর্বত শ্রেণী, শৈলশিরা।ভালো করে এভারেস্টকে দেখার জন্য উঁচুতে উঠলাম।  (দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত)

PARTHO GHOSH

PARTHO GHOSH

 

 

 

 

 

অনুলিখনঃ অনির্বাণ ভট্টাচার্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *